সিসি ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছেই। এ পর্যন্ত শিক্ষকদের হাতে ছাত্রী নিপীড়নের ২০টির মতো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে; কিন্তু একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছেই। এ পর্যন্ত শিক্ষকদের হাতে ছাত্রী নিপীড়নের ২০টির মতো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে; কিন্তু একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাধ্যতামূলক ছুটি কিংবা সাময়িক বহিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে শাস্তি। এর মধ্যে কোনো কোনো শিক্ষককে আবার পদোন্নতি দিয়ে বা চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে ‘পুরস্কৃত’ করেছে প্রশাসন। অধিকাংশ ঘটনায় ‘তদন্ত চলছে’ বলে অভিযোগগুলো ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে বছরের পর বছর। আবার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।ছুটিতেই শেষ যৌন হয়রানির শাস্তি!
২০১০ সাল থেকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রভাষক মাহমুদুর রহমান বাহালুল বিভাগের দুই ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ২০১৩ সালে অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে গেলে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। এতে ভুক্তভোগী ছাত্রীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।তদন্ত শেষে কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষকের অনৈতিক আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে চিঠি দেয় কমিটি; আইনি ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করে। ২০১৩ সালের মে মাস থেকে এক বছরের জন্য বিভাগের সব কর্মকাণ্ড থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এক বছর অতিবাহিত হলেও প্রশাসন থেকে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি তিনি বিভাগে যোগদানের জন্য আবেদন করেছেন।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর নাট্যকলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রীকে বাসায় ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানির চেষ্টা করেন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী ছাত্রীর সহপাঠীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ওই শিক্ষকের স্থায়ী চাকরিচ্যুতির দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নামেন।
আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সহিদ আকতার হুসাইনকে প্রধান করে ঘটনার ১৫ দিন পর গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, দায়মুক্তি দিতেই এ তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদন কখনও আলোর মুখ দেখবে কি-না সন্দেহ।বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা-১০ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে তার যৌনকামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কোনো নারী বা শিশুর শ্লীলতাহানি করে, তবে তাকে যৌন নিপীড়ন বলা হবে এবং এর জন্য ওই ব্যক্তিকে অপরাধ প্রমাণ হলে সর্বনিম্ন তিন বছর ও সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। সঙ্গে তাকে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হবে।অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অপরাধ প্রমাণ হওয়ার পরও সাময়িক বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক ছুটিতেই শাস্তি শেষ। ছুটিতে থাকাকালীন শিক্ষকরা ক্লাস নেওয়া বা অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ না নিলেও চাকরির সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বসবাসের সুবিধাসহ বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে আড্ডা দেওয়া, বেতন-ভাতা, বোনাস, পেনশন সব সুবিধাই ভোগ করেন। অভিযোগ আছে, এসব শিক্ষক ক্ষেত্রবিশেষে রাজনৈতিক ও পেশাগত প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগ দায়েরকারী শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রমেও বাধার সৃষ্টি করেন। ব্যবস্থা না নেওয়ায় কয়েকজন ছাত্রীর বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
হয়রানির শিকার হওয়ার পরও লোকলজ্জার ভয়ে অনেক শিক্ষার্থীই চুপ থেকে যান এবং অভিযোগ করেন না। যেসব ঘটনা নিয়ে হয়রানির শিকার নারী শিক্ষার্থীরা মুখ খোলেন, শুধু সেগুলোই লোক-জানাজানি হয়, প্রতিবাদ হয় এবং সেসব ক্ষেত্রেই ‘নামেমাত্র’ ব্যবস্থা নেওয়া হয় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কথা হচ্ছিল নীলিমার (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তার অভিযোগ, বিভাগের এক শিক্ষক তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছেও পেঁৗছেছে। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে স্যার যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা আমি মানতে পারিনি; চলে এসেছি। আসার সময় তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, পরীক্ষার খাতার কী হবে? আমি বলেছি, স্যার, আপনার যা ইচ্ছা তাই দিয়েন।’
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের ঘটনা তদন্তে ২০০৯ সালে যৌন নিপীড়নবিরোধী তদন্ত কমিটি গঠন করার নির্দেশনা দেন আদালত। সে অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সদস্য অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করে; কিন্তু এ কমিটি আছে নামেই। আজ পর্যন্ত ওই কমিটির একটি বৈঠকও হয়নি।কমিটির সদস্য অধ্যাপক তাজমেরী এস এ ইসলাম সমকালকে বলেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করতে পারলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শিক্ষকের অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে ভয় পাবে। সে সুযোগে শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয় বেড়েই চলবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি না পারে, তাহলে অভিযুক্তকে প্রচলিত আইনে সোপর্দ করতে পারে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু ছাত্রীর সঙ্গে অশোভন আচরণ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে স্ত্রী নির্যাতনেরও অভিযোগ রয়েছে। টিউটোরিয়াল, ইনকোর্স ও অ্যাসাইনমেন্টের নম্বরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ছাত্রীদের হয়রানির চেষ্টা করেন কোনো কোনো শিক্ষক। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েও ছাত্রীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে পরে অস্বীকার করার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। এমন একটি ঘটনায় কুয়েত মৈত্রী হলের এক ছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ই কলঙ্কিত হয় না, ‘শিক্ষক’ শব্দটিই কলঙ্কিত হয়। অভিযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গেই ওই সব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন যেভাবে আসে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।২০০৭ সালে একাডেমিক কাজের কথা বলে ছাত্রীকে রুমে ডেকে এনে দরজা বন্ধ করে জোরপূর্বক ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেন মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. কামাল উদ্দীন। তার বিরুদ্ধে উপাচার্যের কাছে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন ভিকটিম। সে সময় অভিযুক্ত শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হলেও ২০১২ সালে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।২০০৯ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গিয়াস উদ্দীন মোল্লার বিরুদ্ধে এক ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। এক বছর একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার পর তাকে আবার বহাল করা হয়। ২০১০ সালে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের মুখে তাকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে অপসারণ করে ছুটিতে পাঠানো হয়।
উর্দু বিভাগের শিক্ষক গোলাম মওলা, পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক এহসান উদ্দীন ও ড. জাফর আহমেদ খান এবং মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. মাহমুদ হাসানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের করা যৌন হয়রানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।২০১১ সালে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক আবু মুসা আরিফ বিল্লাহ কলাভবনে প্রকাশ্যে জড়িয়ে ধরে চুমু খান এক ছাত্রীকে। লোকলজ্জার ভয়ে ছাত্রীটি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছেন আর এই শিক্ষক রয়েছেন বাধ্যতামূলক ছুটিতে। বিভাগের আরেক শিক্ষক মুহিত আল রশিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে বিচার দাবি করেন এক ছাত্রী। একই বছর উর্দু বিভাগের শিক্ষক ড. ইসরাফিলের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন এক শিক্ষার্থী।
আরবি বিভাগের অধ্যাপক এ টি এম ফখরুদ্দীন বিয়ে করেছেন চারটি। তার ছাত্রীও আছেন তাদের মধ্যে। চতুর্থ স্ত্রী ও একসময়ের ছাত্রীর অভিযোগের কারণে এখন তিনি আছেন বাধ্যতামূলক ছুটিতে। চার বিয়ে এবং চতুর্থ স্ত্রীর মাথা ফাটানোর অভিযোগে ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ফখরুদ্দীনকে ছুটিতে পাঠানো হয়। ছুটিতে গেলেও সময়মতো বেতন-ভাতা এবং শিক্ষকতার অন্য সুযোগ-সুবিধা সবই পাচ্ছেন ফখরুদ্দীন। দেড় বছরের বেশি সময়েও তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ এম আমজাদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ বডি সিন্ডিকেট কমিটিও একজন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করতে পারে না। চাকরিচ্যুত করতে হলে অনেকগুলো স্তর পার হয়ে আসতে হয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে অমি মনে করি, এ ধরনের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক অনৈতিক আচরণ করে পার পেতে পারেন না।বিশ্ববিদ্যালয় আইনে কোনো শিক্ষকের নৈতিক স্খলন হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাকরিচ্যুতি। সিন্ডিকেটের সভায় প্রাথমিকভাবে শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাময়িক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া গেলেও অভিযুক্ত শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিএইচডির থিসিস জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় এ বছরই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করে বিশ্ববিদ্যালয়। এর আগে রসায়ন বিভাগের আরেক শিক্ষককে প্রতারণার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়। শুধু যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে দেখা যায়, তা সাময়িক বহিষ্কার আর বাধ্যতামূলক ছুটিতে এসে আটকে যাচ্ছে। ছাত্রীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় অভিযুক্ত কোনো শিক্ষককে এখন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি করে চাকরিচ্যুত করা হয়নি।