সিসি ডেস্ক: তৃণমূল নেতারা বলছেন, ‘ঘুনে ধরা’ কমিটি দিয়ে আন্দোলন জমবে না। চাই নতুন নেতৃত্ব, সেই সঙ্গে কোন্দল নিরসন। সরকার পতন আন্দোলনকে সামনে রেখে কমিটি পুনর্গঠন না করায় হতাশ হয়ে পড়েছে তারা। আবার উপজেলা নেতারা বলছেন, মহানগর ও জেলা নেতারা মাঝে মধ্যে খোঁজ খবর নিলেও আন্দোলন সংগ্রামের বিষয়ে কিছু বলছেন না। তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে মহানগরের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, পাড়ায় পাড়ায় গণসংযোগ শুরু হয়েছে। শিগগিরই প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিটি ঘোষণা করা হবে। ইতোমধ্যে তিনশতাধিক উঠান বৈঠক হয়েছে। নেত্রীর আন্দোলনের ডাকে যে কোনো সময় মাঠে নামার জন্য সবাই প্রস্তুত। তবে তারা বলছেন, অনেক ব্যাপার আছে আগে খোলাশা করা যায় না। প্রশাসন, মিডিয়া, জনগণ সব বুঝেই আমরা গোপনে গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
গোপন মিশনে রংপুরের বিএনপি নেতারা নেতা আছে, নেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। তৃণমূলে জোড়াতালি দিয়ে চলা নেতৃত্বেও আসেনি কোনো পরিবর্তন। নবগঠিত কমিটি নিয়ে দেখা দিয়েছে বিভক্তি আর সমন্বয়হীনতা। দিন দিন জেলা ও মহানগর নেতাদের প্রতি তৃণমূলে ক্ষোভ আর হতাশা বাড়ছে। এ কারণে নড়বড়ে অবস্থানে থাকা রংপুর বিএনপি সময় পার করছে মুখের জোরে। এমনটাই মনে করছেন কর্মী-সমর্থকরা।
সরকার পতনের আন্দোলন চাঙ্গা করতে মাঠ পর্যায়ে নেই তেমন প্রস্তুতি। এ অবস্থায় মহানগরীর ওয়ার্ড থেকে শুরু করে উপজেলা ও থানা পর্যায়ে গুটি কয়েক নেতার কব্জিতে বন্দি হয়ে পড়া বিএনপির দশা এখন করুণ।
তৃণমূলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্র অনুমোদিত জেলা ও মহানগর কমিটি গঠনের ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো উপজেলা পর্যায়ে নতুন কমিটি দাঁড় করাতে পারেনি নতুন নেতৃত্ব। কাঙ্ক্ষিত পদবঞ্চিত নেতাদের পাল্লা ভারী হওয়ায় তৃণমূলে দল গোছাতে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। থমকে আছে সমন্বয় সভা। দলীয় কোন্দল নিরসন করে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার সফল প্রচেষ্টা এখন চোখে পড়েনি। মাঝে মধ্যে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিতে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে অংশ নেয়া ছাড়া আর কোনো কর্মকাণ্ডে দেখা মিলছে না নবগঠিত কমিটির সিনিয়র নেতাদের।
সূত্রমতে, মহানগর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যেও রয়েছে ওয়ার্ড কমিটি নিয়ে মতবিরোধ আর দ্বন্দ্ব। নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া আর কোনো কমিটি হয়নি। জেলার ৮ উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে ‘ঘুনে ধরা’ কমিটি দিয়েই দলীয় কার্যক্রম। নতুন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের কারণেই পাল্টাপাল্টি কমিটি হয়েছে পীরগঞ্জে। আর এ নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে জীবনও দিতে হয়েছে পিন্টু (পাগলা পিন্টু) নামে এক কর্মীকে। একই চিত্র গঙ্গাচড়া, হারাগাছ, মিঠাপুকুরে।
সদর উপজেলার সদ্যপুষ্করণী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান রন্টু বাংলামেইলকে বলেন, ‘দলীয় কর্মসূচি সফল করতে মাঝে মধ্যে মিটিং মিছিল করি। জেলা নেতারা আগের মতো যোগাযোগ না করায় এখন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে স্থানীয় বিএনপির কার্যক্রম। কোনো সমন্বয় সভা বা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েও কোনো পরিকল্পনা নেই।’
রন্টু আরো বলেন, ‘সরকার পতনের আন্দোলনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আমাদের জোরালো সমর্থন আছে। কিন্তু আন্দোলনের মাঠে মূল নেতারা না থাকলে কর্মীরা তো বেশিক্ষণ ঠিকে থাকতে পারে না।’
মিঠাপুকুর থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লর্ড (টিটুল) বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছে আছে সবাইকে নিয়ে আন্দোলনের মাঠে থাকবো। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে।’ এজন্য তিনি কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের নেতাদের সমন্বয়হীনতাকেই দায়ী করলেন।
তামপাট ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান মহানগরীর ৩২নং ওয়ার্ড বিএনপির নেতা শহিদুল ইসলাম সাকু বলেন, ‘নতুন মহানগর কমিটির ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও ওয়ার্ডগুলোতে কমিটি গঠন না করায় তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। কর্মী-সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে দ্রুত কমিটি করা প্রয়োজন।’ দলে অনেক নেতা আছে কিন্তু কার্যক্রম নেই দাবি করে সাকু বলেন, ‘কমিটি না থাকায় ও নেতাদের সমন্বয়হীনতার কারণে আমরা হতাশার মধ্যে দিনাদিপাত করছি।’
সাতগড়া ইউনিয়নের সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমান ১৩নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা সাবিরুল ইসলাম লিটন জানান, ‘শুনেছি কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।’
বদরগঞ্জ উপজেলার ১২নং গোপালপুল ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মশিউর রহমান বলেন, ‘আমরা আন্দোলনের জন্য সব সময়ই প্রস্তুত। কিন্তু মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে এখানে দ্বন্দ্ব রয়েছে। স্থানীয় জনতাও কেন্দ্র থেকে ঘোষিত আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে চায়, কিন্তু আমাদের নেতাদের সমন্বয়হীরতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।’ মশিউর বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে এক টেবিলে বসে দলীয় কোন্দল নিরসনে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি করাও জরুরি প্রয়োজন।’
পীরগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান ও থানা বিএনপির সভাপতি আফছার আলী বলেন, ‘জেলা কমিটির সভাপতি মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলেন। খোঁজ খবর নেন। কিন্তু আন্দোলন সংগ্রামের ব্যাপারে এখনো প্রকাশ্যে কোনো আলাপ আলোচনা হয়নি।’ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে শক্তিশালী বিএনপি গড়তে পারলে আন্দোলন সফল হবে দাবি করে প্রবীণ এ বিএনপি নেতা বলেন, ‘বসে থাকলে হবে না। নেতাদের ছুটতে হবে। অভিমানীদের রাগ ভাঙাতে হবে। একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা সৃষ্টি না হলে কোন্দল নিয়ে বেশি এগুনো যাবে না।’
তবে তৃণমূলের এসব অভিযোগ একবারেই নাকচ করে দিয়েছেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সামসুজ্জামান সামু। তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠনের লক্ষ্যে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডের পাড়ায় পাড়ায় গণসংযোগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি ওয়ার্ডের কমিটি ঘোষণা করা হবে। মূলত এ খবর মিডিয়ায় প্রকাশ না হওয়ায় হয়তো অনেকেই জানেন না।’
এরই মধ্যে প্রায় তিনশতাধিক উঠান বৈঠক করেছেন দাবি করে সামু বলেন, ‘বিগত সময় কোনো নগরীর ওয়ার্ডেই কমিটি ছিলো না। আমরাই নতুন করে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছি। তাছাড়া নেত্রীর আন্দোলনের ডাকে যে কোনো সময় মাঠে নামার জন্য তৃণমূলেও প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে’।
এসময় মহানগর সম্পাদক আরো বলেন, ‘অনেক ব্যাপার আছে আগে খোলাশা করা যায় না। প্রশাসন, মিডিয়া, জনগণ সব বুঝেই আমরা গোপনে গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক এলে কেউ আর বিরোধ-কোন্দলের জের ধরে হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকবে না। যারা প্রকৃত অর্থে বিএনপির রাজনীতি করে তারা বাইরে আসবেই।’
মহানগর কমিটির সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রের নির্দেশনা মেনে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ও বিরোধ নিরসনে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এতে কেউ কেউ সাড়াও দিয়েছেন।’
মহানগর সভাপতি আরো বলেন, ‘গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে রংপুরে সরকার বিরোধী আন্দোলনে কারা নেতৃত্ব দিয়েছেন রংপুরের সাধারণ মানুষের থেকে শুরু করে দলের সব নেতাকর্মী তা ভালো করে জানে। আমরা আন্দোলন নিয়ে ভাবছি না। দল গোছাতে চাই। সৃশৃঙ্খল নেতাকর্মী নিয়ে আগামীতে আবারো মাঠে প্রমাণ করবো বিএনপি ঝিমিয়ে পড়েছে কিনা।’
অন্যদিকে, নবগঠিত মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও কাঙ্ক্ষিত পদ বঞ্চিত আন্দোলনকারী নেতা রইচ আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা সরকার পতনের আন্দোলনের জন্য সব সময়ই প্রস্তুত আছি। কিন্তু অযোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে নয়। নতুন কমিটির কারো প্রতি নয়, আমাদের বিরোধ নেতৃত্বের প্রতি। তাই আমরা চাই যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে অতীতের আন্দোলনে যারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে তাদের মূল্যায়ন করা হোক।’
জেলা বিএনপির সভাপতি এমদাদুল হক ভরসা বলেন, ‘যে সব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলোর পুনর্গঠনের চেষ্টা চলেছে। এখন আর আগের মতো দলে কোনো পক্ষ-বিপক্ষ নেই। আমরা সবাই আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখন শুধু নেত্রীর চূড়ান্ত ডাকের অপেক্ষায়।’
এসময় তিনি তৃণমূলে কমিটি নিয়ে বিরোধ ও সমন্বয়হীনতা সম্পর্কে বলেন, ‘যেহেতু বিএনপি একটা বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এখানে একটু আধটু বিরোধ কোন্দাল থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এগুলো বেশিদিন থাকবে না।’
এ ব্যাপারে রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু জানান, ‘জেলা ও মহানগর কমিটিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সকল মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের জন্য। চলতি মাসের মধ্যেই মহানগরের সকল ওয়ার্ড কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শেষ হবে।’
সরকার পতন আন্দোলনের ব্যাপারে অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব বলেন, ‘বিগত দিনের আন্দোলনে যদি দেশের সাতটি বিভাগের মধ্যে প্রথম বা দ্বিতীয় কোনো বিভাগের নাম উল্লেখ করা হয় সেটি অবশ্যই রংপুর বিভাগ হতে হবে। কারণ আমরা আন্দোলনে পিছু পা হতে শিখিনি।’
আগামীতে বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে রংপুর অঞ্চলে বিএনপিসহ সাধারণ মানুষ রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে আরো বেশি সক্রিয় হবে বলে দাবি করেন রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এ নেতা।