মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর: পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) হাত ধরে এখন মরুদ্যানে পরিণত হতে চলেছে।
গত প্রায় দেড়মাস ধরে খনি থেকে প্রতিদিন ৪ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন হওয়ায় এ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কাঙ্খিত মাত্রায় পাথর উত্তোলন হওয়ায় একদিকে যেমন পাথর বিক্রি করে খনি কোম্পানি লোকসান কাটিয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে, দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পাথর উত্তোলনের কাজ চলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এলাকার প্রায় দেড় হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হওয়ায় এসব পরিবারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। উপকৃত হচ্ছে আরও পাঁচ হাজার পরিবার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অব্যাহত লোকসানের মুখে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিগত মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৪শ’ কোটি টাকায় ৬ বছরের জন্য খনির উত্তোলন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় বেলারুশের জেএসসি ট্র্রেস্ট সকটোস্ট্রয় ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া করপোরেশন লিমিটেড নিয়ে গঠিত জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামকে (জিটিসি)। জিটিসি মধ্যপাড়া খনির আগের দক্ষ শ্রমিকসহ এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের অগ্রাধিকার দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ করে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
২০ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে খনি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে জিটিসি ও বেলারুশ একদল দক্ষ খনি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ২৪ ফেব্রুয়ারি এক শিফটে পাথর উত্তোলন শুরু করে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ১৭ মে দ্বিতীয় শিফট চালু করে প্রতিদিন দুই হাজার ৬শ’ টন এবং ১০ অক্টোবর থেকে তৃতীয় শিফট চালুর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার টন পাথর উত্তোলন করে আসছে। প্রায় ৭ বছর ধরে পেট্রোবাংলা খনিটি পরিচালনা করে যেখানে প্রতিদিন এক শিফটে গড়ে মাত্র ১ হাজার টন পাথর উত্তোলন করতো সেখানে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি খনি পরিচালনার দায়িত্ব প্রহণের ৮ মাসের মধ্যে পাথর উত্তোলন ৪ গুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। তাছাড়া পেট্রোবাংলা ৩ শিফট চালু করতে না পারায় পাথর উত্তোলন বাড়াতে পারেনি। ফলে বছরের পর বছর ধরে লোকসান দিয়ে ঋৃণের পাল্লা ভারি হয়েছে মধ্যপাড়া পাথর খনি কোম্পানির। দেশে খনি সেক্টরে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে দেশীয় কোম্পানির যৌথভাবে বিনিয়োগ এটিই প্রথম। এতে বিদেশি বিনিয়োগে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বেকার সমস্যা সমাধানে অবদান রাখছে বলে সূত্র জানায়।
সূত্রমতে, প্রতিদিন ৩ শিফট চালু হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসির অধীনে খনিতে কর্মরত রয়েছে প্রায় ১ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে খনি শ্রমিক প্রায় ৬শ’, কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ২শ’ এবং খনির নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে আনসারসহ সিকিউরিটি গার্ড প্রায় ১শ’ জন। এদের অধিকাংশই খনি পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা। ফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ১ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হওয়ায় এদের পরিবারের ৪ হাজার সদস্যের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। জিটিসির অধীনে এলাকার একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির কর্মসংস্থান হয়েছে।
খনিতে কর্মরত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাকিরুল ইসলাম জানান, তারা তিন ভাই জিটিসির অধীনে খনিতে চাকরি করে প্রতি মাসে বেতন বাবদ প্রায় ৪৭ হাজার টাকা পাচ্ছেন। এতে তাদের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। তাছাড়া খনিতে প্রতিদিন পাথর নিতে আসা শতাধিক ট্রাকের চালক ও হেলপার, ট্রাক বন্দোবস্তকারী, লোডিং শ্রমিক, পাথর ব্যবসায়ী, ঠিকাদারসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক লোকের পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে। সবসময় বিভিন্ন জেলার লোকজনের আগমন হওয়ায় খনি গেটের সামনে গড়ে উঠা প্রায় অর্ধশতাধিক দোকানপাটে বেচা-বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় দোকান মালিকরাও খুশি।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোজাহেদুল ইসলাম সোহাগ জানান, মধ্যপাড়া খনি এতোদিন ধূ ধূ মরুভূমির মত পড়েছিল। জিটিসির হাতে তা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এ যেন মরুভূমির বুকে মরুদ্যানের মত। মধ্যপাড়া খনিতে পুরোদমে পাথর উত্তোলন শুরু হওয়ায় তার হরিরামপুর ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসির জেনারেল ম্যানেজার জাবেদ সিদ্দিকী বলেন, খনিতে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের দেয়া হচ্ছে ইউরোপিয়ান তথা আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা। তাছাড়া কাজের মানের উপর ভিত্তি করে প্রতিমাসে তাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। ফলে শ্রমিকরাও সন্তুষ্ট চিত্তে কাজ করে যাচ্ছে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএএফএম নাজমুল আহসান হায়দার বলেন, দেড় মাস ধরে প্রতিদিন সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন হচ্ছে। এতে খনি কোম্পানি ধীরে ধীরে লোকসান কাটিয়ে উঠছে।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ২৫ মে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলায় অবস্থিত মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যায়।