• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫১ অপরাহ্ন |

আজ পার্বতীপুর হানাদার মুক্ত দিবস

gonokobor-parbotipurপার্বতীপুর প্রতিনিধি: আজ ১৫ ডিসেম্বর। দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলা হানাদার মুক্ত দিবস। একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এই দিনে মুক্ত হয় পার্বতীপুর।

৭১-এর ২৩ মার্চ পার্বতীপুর শহরে বসবাসরত অবাঙালিদের বৈষম্যমূলক আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ শহর ঘেরাও করে এবং সিদ্দিক মহল্লায় অগ্নি সংযোগ করে। এ সময় অবাঙালিরা নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ব্যাপক গুলি বর্ষণ করলে অনেক বাঙালি প্রাণ হারায়। সে সময়ে অবাঙালিদের গুলিতে প্রাণ হারানো কালাইঘাটির রইচ উদ্দিন, আটরাই গ্রামের দুখু মিয়া, বেলাইচন্ডির মোজ্জামেল হকের নাম উল্লেখযোগ্য।

২৪ ও ২৬ মার্চ সেই সময়ের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারী ইমাম হোসেন মোল্লাসহ ১১ জন, এস আহম্মেদের ৪জন কর্মচারী, অমর টকিজ সিনেমা হলের মুসলিম ম্যানেজারের সমস্ত পরিবারের সদস্য, অহিত কোম্পানির ২জন কর্মচারী, কাশিয়া তেলীর পরিবারের ৪ জন, পার্বতীপুর থানার এএসআই গোলাম পরিবারের সকল সদস্য, ক্যাপ্টেন ডাক্তারের পুত্র ডাক্তার শামসাদকে কয়লার ইঞ্জিনের বয়লারে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এ গণহত্যার পর বাঙালিরা ক্রোধে ফেটে পড়ে। এর পর প্রায় আড়াই’শ তৎকালীন বেঙ্গল রেজিমেন্ট, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এসে তাবু ফেলে খোলাহাটির নুরুল হুদার আটরাই গ্রামে। তারা স্থানীয় তরুণদের নিয়ে সংগ্রামী দল গঠন করতে থাকে। তাদের হাতে ধরা পড়ে একজন অবাঙালি এসপি এবং দু’জন ট্রাক চালক।

২৮ মার্চ পাক বাহিনীর একজন পাঞ্জাবি মেজরের অধিনে কয়েক জন বাঙালি সৈন্য হুগলীপাড়ার সিও’অফিস চত্তরে (বর্তমানে উপজেলা পরিষদ চত্বর) পাহারা দিচ্ছিল। দ্বিতলী ভবনে কামান পেতে মেজর বাঙালিদের তৎপরতা লক্ষ্য করে ওয়ারর্লেসে খবর দেয়ার চেষ্টা করলে এক বাঙালি সৈন্যের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডের একপর্যয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনা জেনে ফেলায় হুগলীপাড়া গ্রামের  ছাত্র আব্দুল লতিফকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং জ্বলন্ত কয়লার ইঞ্জিনের বয়লারে পোড়ানো হয়।

১ এপ্রিল সংগ্রামী যুবকদল বৃত্তিপাড়ার নিকট মর্টার বসিয়ে সন্ধ্যার পর একযোগে ৪র্থ মুখে আক্রমণ চালায় পার্বতীপুর শহরে। শেষ রাতে হঠাৎ কামান গর্জে ওঠে। ভোরে তুমুল গোলাগুলি শুরু হয়। প্রচণ্ড শব্দে সেল নিক্ষিপ্ত হয় শহরের সোয়েব বিল্ডিং এর উপর। ভেঙ্গে যায় ৪ তালা ভবনের চিলে কোঠা। ২ এপ্রিল পাকসেনা ও অবাঙালিরা হিংস্রতায় উন্মুক্ত হয়ে পার্বতীপুরের ৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে গ্রাম-গঞ্জে অগ্নি সংযোগ, হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালায় বাঙালিদের উপর। এ দিনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় অনেক বাঙালিকে। এর মধ্যে চন্ডিপুর ইউনিয়নের জাহানাবাদ কালেখাপাড়া গ্রামের রহমতুল্লাহ’র পুত্র সৈয়দকে নির্মমভাবে আগুনে পুড়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে পার্শ্ববতী পুকুরপাড়া গ্রামের লালমিয়ার স্ত্রী অহেদা বেগম ও যুবতী মেয়ে এবং তাজর উদ্দিনকে একসংগে গুলি করে হত্যা করে। বাজারপাড়া গ্রামের মোস্তো হাজী ও মামুন পাড়ার চাঁন মামুন ওরফে গ্যাড়পা হাজী, মশেতুল্লাহকে জীবিত অবস্থায় চোখ তুলে নিয়ে বহু নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করে। শহর সংলগ্ন নয়াপাড়া গ্রামের ইব্রাহীম ওরফে সুরাইন, দক্ষিন পাড়ার রফিকউদ্দিন ওরফে রিয়াজকে রাস্তায় ফেলে জবাই করে হত্যা করে। আর এ কারণে শহরের দুটি মহল্লার নামকরণ করা হয় রিয়াজ নগর ও ইব্রাহীম নগর। বাশুপাড়া গ্রামের জমির উদ্দিনের পুত্র আবু বকর সিদ্দিক, মেনহাজুল হক, আলাউদ্দিন, আজগর আলী, মেহেরাজ আলী (কবিরাজ), আজিজার ও শামসুল হককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

রামপুরার একানউদ্দিন, ভেদলু ও সোবাহানকে নির্মমভাবে হত্যা করাসহ যুবতীমেয়েদের উপর চরমভাবে নির্যাতন চালায়। ৮ এপ্রিল বিকেলে সবচেয়ে বৃহৎ গণহত্যার ঘটনা ঘটায় পাক সেনারা। রংপুর থেকে পাক সেনারা ট্রেনযোগে এসে পার্বতীপুর শহরের অবাঙালি নেতা তৎকালীন এমপি কামরুজ্জামান ও শহরের নামকরা অবাঙালি গুন্ডা বাচ্চু খান, নঈম খানের নেতৃত্বে নৃশংসভাবে প্রায় ৩/৪‘শ বাঙালিকে গণহত্যা করে এবং ধর্ষিতা হয় অনেক মা-বোন।

এ সময় ভারতে মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং শেষে পার্বতীপুরের কৃর্তী সন্তান আলাউদ্দিন ই কোম্পানির কমান্ডার হিসাবে ৪০ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল নিয়ে দেশে প্রবেশ করে। জুলাইয়ের প্রথমদিকে তারা প্রথমে ফুলবাড়ীর ভেড়ম নামকস্থানে বেস ক্যাম্প স্থাপন করে। ভেড়মের ৪ কিলোমিমিটার পূর্বে এবং ৩ কিলোমিটার উত্তরে পাকসেনাদের শক্ত ঘাটি ছিল। ক্যাম্প স্থাপনের ৫ দিনের মাথায় পাকসেনাদের সঙ্গে চরম যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে ১৭ জন পাক সেনাকে হত্যা করে।

বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর এলো ডিসেম্বর মাস। ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ প্রহরায় ট্রেনযোগে পার্বতীপুর থেকে প্রায় ৩৫ হাজার আবাঙালি সৈয়দপুরে চলে যায়। ১২ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর বোমা হামলায় পার্বতীপুরের তেলের ট্যাঙ্কারে আগুন ধরে যায়। ১৪ ডিসেম্বর পার্বতীপুরের পাকসেনা ও রাজাকারদের ক্যাম্পগুলো আক্রন্ত হয়। এ অবস্থায় তারা পিছু হটে এবং ১৫ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় পার্বতীপুর। মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেক বিজয়োল্লসিত মানুষ পার্বতীপুর শহরে প্রবেশ করে। শহরের মূল ভবনগুলোতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়।

পার্বতীপুর হানাদার মুক্ত দিবস উপলক্ষে আজ সোমবার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন পালন করছে বিস্তারিত কর্মসূচি। সকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সৌধে পুস্পস্তক অর্পণ, শহীদদের স্মরণে মিলাদ-মাহফিল, দোয়া-খায়ের আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ