সিসি ডেস্ক: এগোচ্ছে বাংলাদেশ। বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে আজ নিজের পায়েই হাঁটছে দেশটি। ৯ মাসব্যাপী রক্তস্নাত যুদ্ধের ফসল এই দেশটির অর্থনীতিও আজ সমৃদ্ধির পথে। এর পেছনে বিশাল ভূমিকা রেখেছে দেশটির অদম্য জনশক্তি। যুব সমাজের পাশাপাশি দেশের প্রবীণরাও জড়িত আছেন আয়বর্ধক পেশায়। বিদেশি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রবীণই কর্মক্ষম। ৮০ থেকে ৯০ বছর বয়সী অনেক মানুষ বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত। তারা পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে বসবাস করেন। বিষয়টি রীতিমতো বিস্ময়কর। দেশের প্রবীণরা এখন আগের মতো আধমরা নন। কর্মস্থলে তাদের বিচরণ চোখে পড়ার মতো। শহর-গ্রাম-গঞ্জ সর্বত্রই যেন জেগে উঠেছেন তারা। বাংলাদেশের প্রবীণদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে সম্যক ধারণা পেতে নভেম্বরে গবেষণা শুরু করে ব্রিটেনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্যার উইলিয়াম বিভারিজ ফাউন্ডেশন ও অ্যাজিং সাপোর্ট ফোরাম। জানুয়ারি পর্যন্ত তারা গবেষণা কাজ পরিচালনা করবেন। ফেব্রুয়ারি মাসে এই গবেষণার ফল সংবাদ মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।
গবেষক দল ও বিভারিজ ফাউন্ডেশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) জীবন কানাই দাস এবং অ্যাজিং সাপোর্ট ফোরামের মহাসচিব মাসুদ ইবনে রহমান আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ বলা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উন্নত দেশগুলোতে প্রবীণরা আক্ষরিক অর্থেই অবসর যাপন করেন। উল্টো চিত্র বাংলাদেশে। এখানকার বেশিরভাগ প্রবীণ কর্মক্ষম। শহরে এ সংখ্যা কিছুটা কম; তবে গ্রামের বেশিরভাগ প্রবীণ নানা পেশা ও কাজে সম্পৃক্ত। এমনকি, ৮০ থেকে ৯০ বছর বয়সী প্রবীণও নিজ পেশা-কাজে সম্পৃক্ত। তারা নিজ পরিবার বা স্বজনদের সঙ্গে বসবাস করছেন। জরাবিজ্ঞান ও বার্ধক্য বিশেষজ্ঞরা জানান, চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে সারা পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। এ কারণে বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা। জাতিসংঘের হিসাব মতে, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে বিশ্বে প্রবীণের সংখ্যা ৩৬ কোটি থেকে বেড়ে ৬০ কোটি হয়েছে। পৃথিবীতে প্রবীণ বৃদ্ধির গড় হার ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার প্রায় দ্বিগুণ- ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। ১৯৯১ সালে এদেশে প্রবীণ ছিলেন ৬০ লাখ। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৩ লাখে। প্রবীণ বিশেষজ্ঞ ও জরাবিজ্ঞানীরা বলছেন, উন্নত বিশ্বে অ্যাকটিভ অ্যাজিংয়ের বা বার্ধক্যকালীন কর্মময় থাকার প্রবণতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা একসময় স্বজনহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কিন্তু বাংলাদেশে চিত্রটা বেশ ভিন্ন। স্যার উইলিয়াম বিভারিজ ও অ্যাজিং সাপোর্ট ফোরামের গবেষকরা ২৮ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সাভার ও মানিকগঞ্জের ১৫টি গ্রামের ৯৭০ প্রবীণের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। গ্রামগুলোর বেশিরভাগ প্রবীণ কর্মের মধ্য দিয়েই জীবন পার করছেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নবীন ও প্রবীণদের যৌথ প্রয়াসেই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। একদা তলাবিহীন ঝুড়ি খ্যাত বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের দ্বারপ্রান্তে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রথম শর্ত মাথাপিছু গড় আয় ১ হাজার ১৯০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল ৬৩০ ডলার। ছয় বছরে জাতীয় আয় বেড়েছে ৫৬০ ডলার। ব্যাপক উন্নতি হয়েছে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ন্ত্রণসহ বেশকিছু সূচকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৪৪ বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই অর্জন খেটে খাওয়া মানুষের হাত ধরেই এসেছে। কর্মক্ষম বিপুল জনগোষ্ঠীর অবদানে দেশের অর্থনীতি অনেক এগিয়েছে। তবে একথাও ঠিক, আমাদের সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। মূলত উন্নয়ন খাতে সরকারের পরিকল্পিত হারে ব্যয় বাড়ায় অর্থনৈতিক ও মানবিক সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
স্যার উইলিয়াম বিভারিজ ফাউন্ডেশন ও অ্যাজিং সাপোর্ট ফোরামের গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গ্রামে এখনও চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক দুর্বল। ফলে প্রবীণরা সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধপত্র পাচ্ছেন না। সঠিক চিকিৎসা পেলে তারা আরও বেশি কর্মময় হতে পারতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের জরাবিজ্ঞান অনুষদের চেয়ারম্যান ড. এএসএম আতীকুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, মনে রাখতে হবে- বার্ধক্য কোনো রোগ নয়। এটি মানুষের শেষ পরিণতি। নবীন-প্রবীণের মেলবন্ধন বার্ধক্যকে স্বস্তিময় ও আনন্দময় করে তুলতে পারে। এটি সম্ভব হলে প্রবীণরা আরও বেশি সময় ধরে কর্মক্ষম থাকবেন। তারা কখনও দেশের বোঝা হবেন না। তিনি আরও বলেন, এদেশের প্রবীণদের সবচেয়ে বড় সমস্যা- তারা সবসময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তাদের মন থেকে স্বজনদের অবহেলা-অনাদরের ভয় দূর করা গেলে শেষ বয়স অবধি তারা কাজ করতে পারবেন। তারা আসলে নানামুখী কাজের সুযোগ চান। নবীনদের এ সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।