• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৪ অপরাহ্ন |

এবারের বিজয় দিবসে আমার প্রার্থনা

82_phtএমাজউদ্দিন আহমেদ: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতি যেমন স্বতন্ত্র, এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রকৃতিও তেমনি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন নিজেদের যুদ্ধ নিজেরা করতে। শক্ত হাতে নিজেদের বিজয় ছিনিয়ে আনার দৃঢ় সংকল্প নিয়েই। এই জন্যই তো বিজয় দিবসের আবেদন এত হৃদয়স্পর্শী। এ জন্যই রক্তসিক্ত ষোলো ডিসেম্বর এই জাতির ইতিহাসে এত গৌরবদীপ্ত। এক দিকে তা জাতীয় স্বার্থে রক্তদানের আকুতির প্রতীক, অন্য দিকে আত্মশক্তির মহান প্রতিশ্রুতি। গৌরবময় বিজয়ের এক রেড লেটার দিবস।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের জন্যই এই জনপদের জনগণ সচেতনভাবে উদ্যোগী হন। এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন পূর্ব বাংলার জনগণই- ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-মজুর, অখ্যাত পল্লীর দূরন্ত তরুণ, নগর-মহানগরীর যুবশক্তি, মিল-ফ্যাক্টরির কর্মী, বিভিন্ন পেশার প্রশিক্ষিত নাগরিকেরা, বাংলাদেশের সৈনিক এবং পুলিশের কর্মীবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অকুতোভয় তরুণেরা। জাতীয় জনসমাজ বলতে যা বোঝায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তারাই অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষায়তন ছেড়ে, কৃষকদের অনেকে চাষাবাদ ছেড়ে, অনেক শ্রমিক মিল-ফ্যাক্টরি ছেড়ে, পেশাজীবীদের বেশির ভাগ নিজ নিজ পদ ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। অনেকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকেও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহারিক ও নৈতিক সমর্থন দিয়ে জাতীয় কর্মকাণ্ডে গর্বিত অংশীদার হন। শিল্পী-সাহিত্যিকদের শিল্পকর্ম ও রচনাসম্ভার একই লক্ষ্যে উৎসর্গীকৃত হয়। দীর্ঘ দিন পর জাতীয় পর্যায়ে জনগণের যে সার্বিক উদ্যোগ এবং আত্মত্যাগের মহোৎসব, তাই মূর্ত হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধে। বিজয় দিবস মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত ফসল। সত্যি বটে, দেশের কিছু বিপথগামী এবং পাকিস্তানপন্থী মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। তবে শক্তি বলতে যা বোঝায়, একাত্তরে তাদের তা ছিল না। তা ছাড়া, বৃহত্তর জনসমষ্টির তীব্র ঘৃণার ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধের গতিধারায় বিন্দুমাত্র প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়নি। জনগণ অগ্রসর হয়েছেন অকুতোভয় সৈনিকের মতো অনেকটা নিজেদের প্রণোদনায়। জাতি হিসেবে সগর্বে মাথা উঁচু করার অদম্য স্পর্ধায়। শ’ শ’ বছরের পরাধীনতাকে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে। স্বাধীনতার আকাশচুম্বী স্পৃহা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে।

একাত্তরের যুদ্ধ করতে হয়েছিল এক নির্মম শত্রুর বিরুদ্ধে। তারা চেয়েছিল সচেতন নাগরিকদের নিশ্চিহ্ন করে শুধু পূর্ব বাংলার মাটিকে। চেয়েছিল এই জনপদের জনগণকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রেখে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের এক কলোনিরূপে ব্যবহার করতে। একাত্তরের নয় মাসে পূর্ব বাংলায় যেসব নৃশংস হত্যাকাণ্ড, নারকীয় ধর্ষণ, লাখ লাখ মানুষকে ঘরছাড়া করার ঘটনা ঘটে, তার উদ্দেশ্য ছিল একটাই এবং তা ছিল এখানকার মানুষ যেন ভবিষ্যতে আর প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠ না হতে পারে। পাকিস্তানের রক্তপিপাসু জেনারেল টিক্কা খানের ঔদ্ধত্যপূর্ণ দাবি ছিল, আমাকে ৭২ ঘণ্টা সময় দেয়া হোক, আমি সন্ত্রাসীদের (মুক্তযোদ্ধাদের) নির্মূল করে পূর্ব পাকিস্তান ফিরিয়ে দেবো। (Give me seventy two hours time and I will give back East Pakistan free from all shades of miscreant)। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নিজ হাতে লেখা নির্দেশনামার দিকে দৃষ্টি দিন- পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ চত্বরকে লাল রঙে রঞ্জিত করে দিতে হবে। (The green of East Pakistan will have to be painted red)। অনুধাবনে এতটুকু অসুবিধা হবে না পাকিস্তানের শাসকেরা তখন কী ভাবতেন এবং কোন পরিস্থিতিতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তদানের মহোৎসবে যোগ দিতে হয়েছিল।

নাৎসি বাহিনীর আক্রমণ মোকাবেলায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টোন চার্চিল ১৯৪০ সালের ৪ জুন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক অগ্নিবর্ষী বক্তৃতার মাধ্যমে ব্রিটিশ জাতিকে উদ্বুদ্ধ করে বলেছিলেন : ‘আমরা লড়ব সমুদ্র তীরে। আমরা লড়ব (বিদেশী শত্রুর) অবতরণ ক্ষেত্রে, যুদ্ধ করব আমরা মাঠে আর রাজপথে। আমরা যুদ্ধ করব পাহাড়ে। কখনো আমরা আত্মসমর্পণ করব না।’ (We shall fight in the beaches; we will fight on the landing ground; we shall fight in the field and in the streets; we shall fight in the hill; we will never surrender.’)। তার ক’দিন পরে, ১৮ জুন আরো জোরেশোরে প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকটি গ্রামকে রক্ষা করব। আমরা রক্ষা করব প্রত্যেকটি শহরকে, নগরকে। বৃহত্তর পরিসরে লন্ডন নগরী, যেখানে রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ হচ্ছে, অতি সহজে সমগ্র আক্রমণকারী বাহিনীকে গিলে খেতে পারে। আমরা কাপুরুষোচিত পন্থায় দাসত্ব গ্রহণ করার পরিবর্তে লন্ডন নগরীকে বরং (যুদ্ধকালে) বিধ্বস্ত এবং ভস্মীভূত এক জনপদরূপে দেখতে চাই।’ (We will defend every village, every town and every city. The vast mass of London itself, fought street by street, could easily devour an entire hostile army; and we would rather see London laid in ruins and ashes than that it should be tamely and abjectly enslaved’.)।

প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সেই উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে ব্রিটেনের নাগরিকেরা সীমাহীন সাহসিকতার সাথে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তার সামনে নাৎসি বাহিনীর দুর্দমনীয় গতি স্তব্ধ হতে বাধ্য হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বীর যোদ্ধাদের সামনে এমন সাহসী উচ্চারণে কেউ কোনো বক্তব্য দেননি। কোনো মহল থেকে আসেনি কোনো আশার বাণী। আসেনি আশ্বাসের মন্ত্র। নিজের সাহসে ভর করে তারা এগিয়ে গেছেন আর পৌঁছে গেছেন ঐতিহাসিক গন্তব্যে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সদর দরজায়। এই বিজয় যে কত মহান, কত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তা পরিস্থিতির নিরিখেই অনুধাবনযোগ্য। অকাতরে প্রাণ দিয়ে, নির্বিচারে হাজারো বাঁকে রক্ত ঝরিয়ে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা অসম্ভবকে সম্ভব করে ইতিহাস গড়লেন। এই অর্জন কোনো দলের অর্জন নয়। এই অর্জন জাতীয় অর্জন। জনগণের অর্জন। জনগণই এর রচয়িতা। জনগণই এর সংগঠক। জনগণের সীমাহীন ত্যাগই এর মূলধন। দেখা যায়, বাংলাদেশে এমন কোনো পরিবার ছিল না পরোক্ষ বা প্রত্যেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে যাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। বেশির ভাগ পরিবারেই যেমন বিজয়ের পরিতৃপ্তি, অন্য দিকে তেমনি সব হারানোর বুকভরা ব্যথা। কেউ হারিয়েছেন সন্তানকে, কেউবা বাবাকে। কোনো কোনো মায়ের কোল খালি হয়েছে। কোনো পিতার হৃদয় ভেঙেছে। কেউ কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে ধর্ষিত বোনের যন্ত্রণায় কাতর হয়েছেন। কোনো পিতা পুরো পরিবারকে হারিয়ে দিশেহারা হয়েছেন। ১৮৬৪ সালের ২১ নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন পাঁচ সন্তান হারা মিসেস বিকসবির (Mrs. Bishy) কাছে লিখিত চিঠিতে বলেছিলেন : ‘আমি প্রার্থনা করছি, করুণাময় সৃষ্টিকর্তা আপনার (সন্তান হারানোর) যন্ত্রণা কিছুটা হলেও প্রশমন করবেন যেন আপনার প্রিয়জনকে ভালোবাসা ও হারানোর বেদনা আপনার স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে থাকে এবং স্বাধীনতার বেদিতে এই দুর্লভ আত্মত্যাগের গৌরববোধ আপনার একান্ত সম্পদরূপে চিরস্থায়ী হয়।’ (I pray that Heavenly Father may assuage the anguish of your bereavement and leave you only the cherished memory of the loved and lost and the solemn pride that must be yours to have laid so costly a sacrifice upon the altar of freedom.’)। মুক্তযুদ্ধের পরে স্বাধীন বাংলাদেশে সেই স্বজন হারানোর আর্তনাদে কাতর মানুষদের কাছে ব্যক্তিগত পর্যায়ের হোক আর সামষ্টিক পর্যায়ের হোক, এমন কোনো বক্তব্য নিয়ে কেউ তাদের কাছে উপস্থিতও হননি।

মুক্তিযুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক অর্জনে গর্বিত জাতি কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো দিন ভোলেনি। জাতি তার গর্বিত সন্তানদের জাতির শ্রেষ্ঠতম সন্তানরূপে চিহ্নিত করেছে। এই জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়রূপে চিহ্নিত হয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।

সত্যি বটে, সঙ্কটকালে এই দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন সব বিভেদ ভুলে। দল-মতের ভিন্নতার ঊর্ধ্বে উঠে, জাতীয় স্বার্থকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরে, এক কাতারে সম্মিলিত হয়েছেন। পঞ্চাশের দশকে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে একইভাবে এই দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, তারা স্বতন্ত্র। তারা অন্যদের থেকে ভিন্ন। তাদের লক্ষ্য আলাদা। গন্তব্যও তাদের স্বতন্ত্র। একাত্তরের সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে যখন সব কিছু অনিশ্চয়তার অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটায়। আজকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পড়েছে আরেক সঙ্কটের আবর্তে। এরই মধ্যে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার উপক্রম।

দেশ থেকে হারিয়ে গেছে গণতন্ত্র। দেশে নেই আইনের শাসন। সঠিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। একদলীয় শাসনের নিগড়ে সারা দেশ। অনিশ্চয়তায় চার দিক অন্ধকার। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হয়েছে বিপন্ন। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব পর্যন্ত বিধ্বস্ত হওয়ার উপক্রম। মুক্ত মনের অধিকারী জনসমষ্টির বাংলাদেশ আজ মৌলবাদী অভিধা লাভ করতে যাচ্ছে। শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ধূলিধূসরিত হয়ে পড়েছে। শুধু রজানীতি কেন, দেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রাও স্তব্ধ হয়ে পড়বে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। যে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং সমৃদ্ধি সম্পর্কে আমরা শ’ শ’ বছর ধরে গর্ব অনুভব করেছি, তার মূল পর্যন্ত শিথিল হতে চলেছে। এই সমস্যা সরকারের সমস্যা নয়, নয় কোনো দলের সমস্যা। এটি আজ জাতীয় সমস্যয় রূপান্তরিত হয়ে জাতীয় জীবনকে ক্লিষ্ট করে তুলেছে। এটি আজ একটি অভিশাপরূপে দেখা দিয়েছে। এবারের বিজয় দিবস এই অভিশাপের কালো ছায়ায় মলিন হয়ে গেছে। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য তাই চাই জনগণের ঐক্য। চাই জাতীয় ঐক্য। সেই একাত্তরের সঙ্কটকালে যা সৃষ্টি হয়েছিল তেমনি ঐক্য। চাই মুক্তবুদ্ধিভিত্তিক আলোকোজ্জ্বল পরিবেশের জন্য জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য। চাই সাম্য, সহিষ্ণুতা এবং সৌহার্দ্যের ভিত্তিতে সব মত ও পথের সমন্বয়সূচক মানবতাবাদী এক সামাজিক আবহের জন্য ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ। তাই হলো বাংলাদেশ্ ে চিরায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখার জন্য অপরিহার্য হলো যেকোনো চরম পন্থার প্রতি নিন্দা ও ঘৃণার জাতীয় মানস। এর কোনো বিকল্প নেই। এবারের বিজয় দিবসে তেমনি ঐক্যবোধের জন্য আমার প্রার্থনা।
( নয়া দিগন্ত )


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ