কবির আহমেদ : গত কয়েকদিনের অনলাইনবাসীর ঘুম হারাম করে দেওয়া রুবেল-হ্যাপির প্রেম কাহিনী নিয়ে চামে চামে ভালই ব্যবসা করে নিলো একাত্তর টেলিভিশন। তারা টেলিকথনের আংশিক এডিটেড ভার্সন প্রচার করে নিয়ে হিট বাড়িয়ে নিলো আর সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল একাত্তর টিভির দিকে। ফলে হিট সংক্রান্ত মওকা পেয়ে বিজ্ঞাপনের বাজারে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেলো প্রতিদ্বন্দ্বি অন্যান্য চ্যানেলগুলোর চাইতে।
রুবেল-হ্যাপির অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পরেও তারা কেউ অস্বীকার করেনি প্রেমের বিষয়টি। নয়মাসব্যাপি প্রেমের পর হ্যাপি মনে করছেন তিনি ধর্ষিতা হয়েছেন। প্রেমপর্যায়ে এই বোধ তার মধ্যে কাজ করেনি। ফলে অবধারিতভাবে বলা যায় প্রেম কিংবা ভালোবাসার সম্পর্ক স্রেফ যৌনতার বিষয় তার কাছে। যখন কাছে থাকা তখন ভালোবাসা তখন সেটা প্রেম আর দূরে গেলে প্রতারণা কিংবা ধর্ষণ।
রুবেল হোসেন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে হয়ত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন অথবা হ্যাপি যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে হয়ত সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন- এর কোনটা সত্য আমরা কেউ জানি না। কিন্তু যা জানি তা হলো এই পর্যায়ে দুই পক্ষই ক্ষতির মুখোমুখি অথচ প্রেমপর্যায়ে তারা দুইজনই ছিলেন শারিরীক ও মানসিকভাবে সুখি সেটা অনুধাবণ করা যায় সম্পর্কের ব্যাপ্তির কথা বিবেচনা করলে।
একাত্তরের টেলিভিশনের আংশিক টেলিকথন প্রচারের পর মনে হয়েছে টেলিয়ালাপে তারা দুইজনই ছিলেন ভয়ঙ্কর রকমের নিরীহ আবেগিযুগল। এটাই স্বাভাবিক। কারণ প্রেমকালীন সময়ের সংলাপে কেউ কোন দিন ব্যাকরণ বই সামনে নিয়ে কথা বলে না। তাই মানুষের ভীতু, নিরীহ, করুণাপ্রবণ মানসিকতা সেখানে স্পষ্ট হতে থাকে যেহেতু তারা দুইজনই ভাবছেন কথাগুলো একান্তই তাদের নিজস্ব এবং হাইলি কনফিডেনসিয়াল সেহেতু তারা পরস্পরের মন জয় করতে সব ধরণের আবেগ ঢেলে দিতে পারেন কন্ঠের মাধ্যমে।
প্রেমিক-প্রেমিকা যখন টেলিফোনে কিংবা অন্য যে কোন উপায়ে একান্তে কথা বলে সেটা তৃতীয়পক্ষের কাছে মনে হতে পারে চুড়ান্তভাবে অশ্লীল। অথচ এই তৃতীয়পক্ষ প্রেমপর্যায়ে থাকলে সেটাকে নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা মনে করে আর অন্যান্যদের ক্ষেত্রে মনে করে অশ্লীলতার সমতূল্য- এটাই হচ্ছে মানুষের মানসিকতা। এখানে রুবেল কিংবা হ্যাপিকে কাউকেই দোষারূপ করা ঠিক হবে না।
জগতের সব প্রেম যে সংসার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে সেটা কেউই দাবি করতে পারেনা, আবার সব সংসার যে শেষ পর্যন্ত সংসারের মধ্যে থেকেই জীবন শেষ করতে পারবে সে বিষয়েও কেউ নিঃসন্দেহ না। সংসার ভাঙতে পারে মিনিটের মধ্যে আবার একইভাবে সেটা ভাঙতে পারে কয়েক যুগের পরেও। এক্ষেত্রে প্রেম সংসার পর্যন্ত নিয়ে যেতে না পারাটা অপরাধ নয়, বরং বলা যায় স্বাভাবিক এক ধারাবাহিকতা।
রুবেল-হ্যাপির প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি বলে এটাকে ধর্ষণ বলে মেনে নেওয়াটা অন্যায় হতে পারে। একইভাবে এই ধরণের অভিযোগ করাটাও নেহায়েত স্থুলচিন্তা বলে মনে করছি। হ্যাপির এই অভিযোগ যদি সত্য বলে প্রমাণ হয় তাহলে দেশের প্রেমিক-প্রেমিকা সমাজের জন্যে নেমে আসতে পারে ভয়াবহ দূর্দিন। প্রেম ভেঙেছে বলে তখন প্রেমিকা প্রেমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে ঈভটিজিংয়ের আবার প্রেমিক প্রেমিকার বিরুদ্ধেও করতে পারে এডাম টিজিংয়ের অভিযোগ, এমনকি জোরপূর্বক ধর্ষণ অথবা ধর্ষণ প্রচেষ্টার অভিযোগ। তখন আমরা আসলে যাব কোথায়?
একাত্তর টেলিভিশনে প্রচারিত টেলিকথনের মাধ্যমে তারা প্রকৃত কী প্রমাণ করতে চাইল সেটা বুঝতে পারিনি। কথাগুলোর সময়কাল যেহেতু প্রেমপর্যায়ের সেহেতু তারা কথাবার্তায় ভালোবাসার সর্বোচ্চ কিংবা সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্তও নামতে পারেন কারণ ওখানে বাঁধ ছিল না, থাকে না। ওখানে কী জোর করে কিছু আদায়ের চেষ্টা ছিল, সেটাই মূখ্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা শোনা তাতে মনে হচ্ছে সেটা ছিল না সুতরাং টেলিফোন সংলাপ শুনে কাউকে দোষি আর কাউকে সাধু ভাবার কোন কারণ নেই।
আমি জানি না এই কাহিনী কতদিন চলবে, কিন্তু যা জানি তা হলো এর মাধ্যমে একাত্তর টেলিভিশন এবং কিছু ভুঁইফোড় মিডিয়ার ব্যবসা জমজমাট হবে। মাঝপথে এসে তরি ডুবে যাবে রুবেল এবং হ্যাপি দুই জনেরই। তাদের ক্ষতির জায়গাটা ব্যক্তিগত এবং পেশাগত উভয় জায়গাতেই!
উৎস: বিডিটুডে