সিসি ডেস্ক: চোখের জলে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে প্রেমের সমাধি গড়ে গেলেন পম্পা রাণী। প্রেমের টানে দেশ ছেড়ে কাঁটাতারের বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশিকে যুবককে বিয়ে করেছিলেন ভারতীয় নাগরিক পম্পা রাণী (২০)। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে এক মাস সংসারও করেছেন। কিন্তু কাঁটাতারের সীমানা তাদের প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পম্পার ভাই অনুপমের হস্তক্ষেপে পাসপোর্ট আইনে ছয় মাস পর কারাভোগ শেষে আবারো ভারতে ফেরত যেতে হলো পম্পা রাণীকে
সোমবার দুপুর দেড়টায় চুয়াডাঙ্গার দর্শনা চেকপোস্ট সীমান্ত দিয়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পম্পা রাণীকে বিএসএফ’র কাছে হস্তান্তর করে বিজিবি। এ সময় শুধুই কাঁদছিলেন পম্পা।
পম্পার হাতের মেহেদীর রং এখনো শুকায়নি। দেখা গেল, তার ডানহাতের পাতাজুড়ে রয়েছে মেহেদীর রংয়ের বাহারি সাজ।
দুপুর দেড়টায় দর্শনা সীমান্তে পম্পাকে নিয়ে হাজির হলেন কুষ্টিয়া থানার এস আই তাহের গাজী ও কুষ্টিয়া কারাগারের মহিলা কারারক্ষী মনোয়ারা বেগম। সঙ্গে দু’মহিলা পুলিশ কনস্টেবল।
এ সময় আগে থেকেই নো-ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন ভারতের বিএসএফ, পুলিশ ও ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে ছিলেন পম্পার বাবা অসীত মন্ডল, মা অনুরাধা মন্ডল ও ভাই অনুপম মন্ডল। বাবা-মা-ভাইকে দেখে পম্পার খুশি হওয়ার কথা ছিল কিন্তু পম্পার মনের আকাশে তখন কালো মেঘের ঘনঘটা। বিজিবির দেয়া প্লাস্টিক চেয়ারে বসে পম্পা রাণীর দু’চোখ বেয়ে বেদনার বৃষ্টি অঝর ধারায় ঝরছে তখন। মা অনুরাধা মেয়ের মাথায় মমতার হাত বুলাচ্ছেন।
পম্পা রানীর কানের কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কি বিয়ে হয়েছিল? কোন কথা বললেন না পম্পা রাণী।তার দু’চোখ বেয়ে শুধুই অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
মা অনুরাধা মন্ডল বললেন, মেয়ে তাদের উপর রাগ করে বাংলাদেশে চলে এসেছিল।
বাবা অসীত মন্ডলকে প্রশ্ন করলাম, কাকা ঘটনাটি একটু বলবেন? অসীত মন্ডল শুরু করলেন, ওই আমজাদ….এরপর তাকে ডাকলেন এক বিএসএফ জওয়ান। আর জানা হলো না।
তারপর দর্শনা সীমান্তের নো- ম্যান্স লান্ডে ভারতের তৈরি রেলওয়ে সেতুর উপর বসে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে ভেঙে দেয়া হলো আমজাদ ও পম্পা রাণীর ভালোবাসার সেতুবন্ধন।
সকল আনুষ্ঠানিতা শেষ করলেন বিজিবি-বিএসএফ ও দু’দেশের পুলিশ-ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা। তারপর চলে গেল পম্পা রাণী। দু’চোখের জল দিয়ে দর্শনা সীমান্তে গড়ে গেলেন তার প্রেমের সমাধি।
জানা যায়, গত ৭ জুন কুষ্টিয়া দৌলতপুর উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের সীমান্ত সংলগ্ন ধর্মদহ গ্রামের খেজু মালিথার ছেলে আমজাদ আলীর সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার করিমপুর থানার
শিকারপুর কুঠিপাড়ার অসিত কুমার মন্ডলের মেয়ে পম্পা রাণী মন্ডলের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এর কিছুদিন পর ভারতের করিমপুর পান্না দেবী কলেজের বিএ ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী পম্পা নদীতে গোসল করতে নেমে ভারত ভূখণ্ড থেকে চলে আসেন এপারে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে।
আমজাদ আলীকে বিয়ে করে এক মাস সংসার করার পর পম্পার ভাই অনুপম মন্ডল ভারতের কেষ্টটষ্ণগঞ্জ থানায় অপহরণের মামলা করেন। ওই মামলার বিষয়টি কুষ্টিয়া দৌলতপুর থানায় জানানো হলে গত ৭ জুন পুলিশ অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এবং পাসপোর্ট আইনে পম্পাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে।পরে তাকে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়। কুষ্টিয়ার আদালত তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ডাদেশ দেয়। সেই থেকে পম্পা কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে ছিলেন।
নানা প্রশাসনিক জটিলতায় পম্পা ভারতে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পম্পার ভাই অনুপম দ্বারস্থ হন কলকাতার সংলাপ মানবাধিকার সংস্থার। সংলাপ দু’দেশের হাই-কমিশনের মাধ্যমে যোগায়োগ শুরু করে।
গত ২৬ ও ২৭ নভেম্বর ভারতের কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত যৌথ সীমান্ত সম্মেলনে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠককালে পম্পার দেশে ফেরার বিষয়ে সেখানকার ডিএমকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানান।
এরপর রোববার পম্পার ভারতে ফেরত যাওয়ার বিষয় চূড়ান্ত করে নদীয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের কাছে একটি ফ্যাক্সবার্তা পাঠালে তার দেশে ফেরার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।
কুষ্টিয়া কারাগার থেকে বের হয়ে পম্পা রানী সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, “আমজাদকে ভালো গেলেছিল। তাই এদেশে এসে তাকে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের লিখনে আমাকে ফিরে যেতে হচ্ছে।”
সোমবার দুপুর দেড়টায় চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পম্পাকে বিএসএফ’র কাছে হস্তান্তর করে করে বিজিবি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিজিবির দর্শনা কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার শফিকুল আলম, দর্শনা ইমিগ্রেশনের ইনচার্জ এস আই মাহবুব ও কুষ্টিয়া থানার এস আই তাহের গাজী, বিএসএফর গেঁদের ক্যাম্পের ইনচার্জ আর কে বরাহ, গেঁদে ইমিগ্রেশন অফিসার বীরবল সিং ও কৃষ্ণগঞ্জ থানার এস আই পঙ্কজ বৈরাগী।
এর আগে সোমবার সকাল ৮টায় আনুষ্ঠানিকভাবে কুষ্টিয়া পুলিশের একটি বিশেষ টিম কারাগারের গেট থেকে তাকে নিয়ে আসে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে।
নতুন বার্তা