লালমনিরহাট প্রতিনিধি: ২০১৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় এক শিক্ষার্থীর নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার উত্তরপত্র (ওএমআর) গায়েব করে উদ্দেশ্যমুলকভাবে ওই শিক্ষার্থীর ফল বিপর্যয় ঘটানোর বিষয়টি শিক্ষাবোর্ডের তদন্তে ধরা পড়লেও দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ড প্রভাবিত হয়ে ন্যায় বিচার করেননি। এ ধরণের গুরুতর অপরাধ করার পরও ওএমআর জালিয়াত দুর্বৃত্ত শিক্ষকদের নামমাত্র শাস্তি দেয়া হয়েছে। হাতীবান্ধায় সোমবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করা হয়েছে শিক্ষার্থী ও তার পরিবার।
দৈনিক সংবাদের হাতীবান্ধা উপজেলা প্রতিনিধি ও আলিমুদ্দিন ডিগ্রী কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া এ ব্যাপারে তিনি তার বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্য বলেন, শিক্ষাবোর্ড প্রভাবিত হয়ে গুরুদন্ডের সবক’টি সুপারিশ এড়িয়ে দুর্বৃত্তদের লঘুদন্ড দিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে দেশের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে বলে দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর বাবা লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার এক কলেজ শিক্ষক আলী আখতার গোলাম কিবরিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তার মেয়ে সিথি কিবরিয়া ২০১৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। সে হাতীবান্ধা সি-৭০৭ হাতীবান্ধা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়। সিথি একজন মেধাবি শিক্ষার্থী। হাতীবান্ধা শাহ্ গরীবুল্যাহ্ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণীতে সে প্রথম স্থান অধিকারী একজন কৃতি শিক্ষার্থী। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষায় সিথি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল এবং গণিত অলি¤িপয়াডে সে লালমনিরহাট জেলা চ্যা¤িপয়ন হয়েছিল। এসএসসি ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, নিজ বিদ্যালয়ে সিথির পেছনের ৪৯ জন শিক্ষার্থী এ প্লাস পেলেও সিথি পেয়েছে এ গ্রেড। পরবর্তীতে পুনঃনিরীক্ষায় ফল অপরিবর্তিত থাকায় সিথি কিবরিয়া উচ্চতর নিরীক্ষণের জন্য শিক্ষাবোর্ডে আবেদন করে। তদানীন্তন চেয়ারম্যান প্রফেসর মো: আলাউদ্দিন মিয়া সিথির আবেদন মঞ্জুর করেন। গঠন করা হয় একটি তদন্ত কমিটি। টানা চার মাসের তদন্ত শেষে গত ১৪ অক্টোবর সিথির সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হয় এবং সে গোল্ডেন এ প্লাস পায়।
তদন্ত কমিটি নিশ্চিত হয়, সিথির চারটি বিষয়ের ওএমআর হাতীবান্ধা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র কর্তৃক গায়েব করা হয়েছে। প্রতিস্থাপন করা হয়েছে উদ্দেশ্যমুলকভাবে পূরণ করা নতুন চারটি ওএমআর। এর ফলে সিথির ফল বিপর্যয় ঘটে। এজন্য কেন্দ্রের সহকারী কেন্দ্র সচিব মাহাতাবউদ্দিন সহ পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সাত জন শিক্ষককে পরীক্ষা কাজে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয় এবং দুর্নীতিগ্রস্থ হাতীবান্ধা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রটি দুই বছরের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, হাতীবান্ধা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্রটির সহকারী সচিব মাহাতাবউদ্দিনের সঙ্গে গোলাম কিবরিয়ার পরিবারের দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ রয়েছে। গোলাম কিবরিয়ার স্থির বিশ্বাস, পারিবারিক দ্বন্দের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশে মাহাতাবউদ্দিন সিথির সর্বনাশ করেছেন।
আরও জানানো হয়, তদন্ত প্রতিবেদনে কঠিন শাস্তির সুপারিশ ছিল। কিন্তু দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রভাবিত হয়ে সেসব শাস্তি কার্যকর করেননি। সুপারিশে ওএমআর পরিবর্তনের বিষয়টি আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত মামলা হিসেবে পরিচালনার জন্য দুর্নীতি দমন সমূহ অপরাধ আইন ১৯৮০ এর ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশিষ্ট দুর্বৃত্ত শিক্ষকদের বরুদ্ধে দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের পক্ষ থেকে মামলা করারও কথা বলা ছিল। দায়িত্বে অবহেলার কারণে কেন্দ্র সচিব ও হাতীবান্ধার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার তৈয়ব আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে সুপারিশের কথা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। হাতীবান্ধা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়কে কালো তালিকাভুক্ত করে এমপিও স্থগিত করা সহ ওই বিদ্যালয়ে আর কখনও জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন না করার জন্য তদন্ত কমিটি জোর সুপারিশ করেছিল। এর কোনটাই বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর আহমেদ হোসেন কার্যকর করেননি।
আলী আখতার গোলাম কিবরিয়া বলেন, দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ড প্রভাবিত হয়েছে বলেই ন্যায় বিচার উপেক্ষিত হয়েছে এবং দুর্বৃত্তরা পার পেয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। শিক্ষার্থী সহ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এভাবে অনিরাপত্তার দিকে ঠেলে দেয়ায় দেশ ও জাতি বিপদাপন্ন হয়েছে বলে দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের বিরুদ্ধে গোলাম কিবরিয়ার অভিযোগ। সম্মেলনে জানানো হয়, প্রতিকার পেতে তিনি ইতোমধ্যে দুদক চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাসচিব ও মাউশি মহাপরিচালক, লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক সহ উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। তিনি ন্যায় বিচার চান।