সিসি ডেস্ক: ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসাবে জায়গা করে নেয় জাতীয় পার্টি। কিন্তু বিএনপিবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে জাপা। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের নেতা নির্বাচিত হন রওশন এরশাদ। এছাড়াও বিরোধী দল হয়েও মন্ত্রিসভা থাকায় সমালোচনায় মুখে পড়ে দলটি।নানাসময় নানা কথা বলে আলোচনায় ছিলেন জাপার চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কথা বলে হঠাৎ গতবছরের ৩ নভেম্বর নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দিয়েছিলে এরশাদ। ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৪০ মিনিটে তাকে বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্ক বাসভবন থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। আটকের পরেই সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাখা হয় এরশাদকে।হাসপাতালে থেকেই রংপুর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১১ জানুয়ারি হাসপাতালে থেকেই অত্যন্ত গোপনে সংসদে গিয়ে স্পিকারের কক্ষে শপথ নিয়ে ফের হাসপাতালে ফিরে যান এরশাদ।পরে গত ১২ জানুয়ারি বাসায় ফিরেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ওই দিন বিকালে বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে যোগগান শেষে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ফিরে গেলেও সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে তিনি বারিধারায় তার বাসভবন প্রেসিডেন্ট পার্কে ফেরেন।
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসাবে নির্বাচিত হন সাবেক ফার্স্ট লেডি ও এরশাদপত্নী রওশন এরশাদ।চেয়ারম্যান থাকতে তিনি কেন বিরোধীদলীয় নেতা হচ্ছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে রওশন এরশাদ বলেন,‘‘উনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তাই বিরোধীদলীয় নেতা হচ্ছেন না৷”তবে প্রদানমন্ত্রীর বিশেষ দূত নিযুক্ত হন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।দশম জাতীয় সংসদ নির্বচনের পর মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির তিন নেতা জায়গা পেয়ে যান। এবং এরা হচ্ছেন পানি সম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা ।
বছরজুড়ে দেশের রাজনৈতিক মাঠে আলোচিত হয়েছিল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ ও তার পত্নী রওশন এরশাদ দ্বন্দ্ব। দলের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে এই দুইজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল চরমে।গত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর থেকেই এরশাদ এবং রওশনের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।এরশাদ নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে থাকলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হন রওশন। রওশন এরশাদ শেষ পর্যন্ত দলকে নির্বাচনে নিতে সক্ষম হন। এমনকি এরশাদও সংসদ সদস্য হয়ে এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। আর রওশন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা।নির্বাচনের পর থেকেই এরশাদ দলে কোণঠাসা।এমনকি জাতীয় পার্টির ৩৪ জন সংসদ সদস্যের অধিকাংশই এখন রওশনপন্থী। আর সরকারের নীতি নির্ধারকরা রওশনকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে এরশাদকে হটিয়ে সরাসরি দলের প্রধানের দায়িত্ব নিচ্ছেন রওশন।আর এ কারণে এর আগে দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে দেন এরশাদ। তার জায়গায় মহাসচিব করা হয় জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে।সর্বশেষ সংকট ঘনীভূত হয় সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা নিয়ে। এরশাদ চাইছিলেন তাঁর অনুগত জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে উপনেতা করতে। আর রওশন চাইছিলেন কাজী ফিরোজ রশীদকে। এনিয়ে দুজনই সরকারের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বিরোধীদলীয় উপনেতার ব্যাপারে রওশন এরশাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।আর এতেই ক্ষিপ্ত হন এরশাদ।এই ক্ষোভের অংশ হিসেবে বুধবার রওশনের আস্থাভাজন জাপার দুই নেতা তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মশিউর রহমান রাঙ্গাকে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ থেকে সরিয়ে দেন এরশাদ। তা ছাড়া এ দুই নেতার জেলা রংপুর ও কুড়িগ্রামে জেলা কমিটিও বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেন তিনি।জানা গেছে এই ঘটনার পর তাজুল ও রাঙ্গা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এরশাদের বিরুদ্ধে নালিশ করেন। এরশাদ এর আগে দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি পদ থেকে কাজী ফিরোজ রশিদকে সরিয়ে দেন।দ্বন্দ্বের শুরুটা অব্যাহত থাকে সংরক্ষিত মহিলা সংসদ নির্বাচনে।জাপার একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২০ ও ২১ জানুয়ারি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেন পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর ২৩ জানুয়ারি এরশাদ ৬ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন। তালিকায় থাকা ৬ জন ছিলেন এরশাদের ছোট বোন মেরিনা রহমান (স্বামী- মৃত ড. আসাদুর রহমান), এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদের, সুনীল শুভরায়ের স্ত্রী কনিকা রায়, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও চেম্বার অব কমার্সের নেতা ইব্রাহিম মোর্শেদের স্ত্রী মাহজাবিন মোর্শেদ, ব্রিগেডিয়ার (অব.) গিয়াউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী মাহমুদা চৌধুরী ও নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. শাহজাহানের স্ত্রী শাহজাদী নাহিনা ইদ্রিস নূর।কিন্তু এরশাদের এই এই চাওয়ায় বাগড়া দেন এরশাদ পত্নী রওশন।পরে দুইজনের সমাঝোতার ভিত্তিতে সংরক্ষিত মহিলা সংসদ নির্বাচন করা হয়। এদের মধ্যে এরশাদের পছন্দের তিনজন হলেন- মেরিনা রহমান, শাহানারা বেগম (রংপুর), মাহজাবিন মোরশেদ (চট্টগ্রাম)। এরমধ্যে মেরিনা রহমান এরশাদের ছোট বোন। আর রওশনের পছন্দের তিনজন হলেন- পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নুর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা রওশনারা মান্নান, কক্সবাজারের খোরশেদারা হক।এই ছয়জনই দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
চলতি বছরের ১০ এপ্রিল রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে রওশন এরশাদ ঘনিষ্ট জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিব করা হয়।বিএনপিবিহীন দশম সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ নিয়ে মতদ্বন্দ্বের মধ্যে ভোটের পর থেকে হাওলাদারকে সরানোর গুঞ্জন চলছিল।৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন বাবলু।ভোটের আগে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদের নানামুখী অবস্থানের মধ্যেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট ধরে রাখতে তৎপর দেখা গিয়েছিল তাকে।রওশনের নেতৃত্বে বাবলুর সঙ্গে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মুজিবুল হক চুন্নু নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে অবস্থান জানান।
২৫মে একটি জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাতকারে জিএম কাদের বলেছিলেন, একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলে থাকা অসাংবিধানিক। আর জাতীয় পার্টি এই কাজটি করছে। এখনই জাপার মন্ত্রীদের পদত্যাগ করা উচিত। এছাড়া জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিব করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জিএম কাদের। বাবলু জুনিয়র- এটাই ছিল কাদেরের অনুযোগ।ছোট ভাইয়ের এসব বক্তব্যের বিষয়ে এরশাদ বলেন, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু জুনিয়র কথাটা ঠিক নয়। এ ধরনের কথা বলে তিনি (কাদের) মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। বাবলু পার্টিকে ক্ষমতায় আনার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এর আগে কেউ তা পারেনি। এই প্রথম একজন পরিশ্রমী মহাসচিব পেয়েছি। তিনি জিএম কাদেরকে উদ্দেশ করে বলেন, না জেনে না শুনে কথা বলা ঠিক নয়।এরই পরিপ্রেক্ষতি ২৭ মে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী বক্তব্যের দায়ে ছোট ভাই ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
‘আপনি আমার অধীনস্থ একজন কর্মচারি ছিলেন’, জিএম কাদেরকে উদ্দেশ করে এ কথা বললেন জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু।পাল্টা জবাব জিএম কাদেরের- ‘হোয়াট নন্সেস, তুমি বেশি বেড়ে গেছো।’২৫জুন জাতীয় মৎস্যজীবি পার্টির প্রতিনিধি সম্মেলন শেষে এভাবে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করেন জিএম কাদের ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিরোধী দল হিসাবে জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুললে জিএম কাদেরের বক্তব্য মাঝখানেই ক্ষুব্ধ হয়ে মঞ্চ ত্যাগ করেন বাবলু। এখানেই শেষ নয়। অডিটরিয়াম ছেড়ে পাশের রুমে বসেন ক্ষুব্ধ বাবলু। এদিকে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে জিএম কাদেরকে নিয়ে ওই রুমে প্রবেশ করেন এরশাদ।এবারও এরশাদের সামনে প্রকাশ্যে বাক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন কাদের-বাবলু।জিএম কাদেরকে উদ্দেশ্য করে বাবলু বলেন, আপনার এভাবে কথা বলা উচিত হয়নি।জিএম কাদের বলেন, যা বলেছি ভুল কিছু বলিনি। সবই সঠিক বলেছি।বাবলু বলেন, সেটা নিজেদের মধ্যে বললেই হতো। প্রকাশ্যে বলা উচিত হয়নি।জিএম কাদের বলেন, কোথায় কি বলবো সেটা কি তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে?বাবলু বলেন, আপনি বেশি কথা বলছেন। আপনি আমার অধীনস্থ একজন কর্মচারি ছিলেন।জিএম কাদের এবার আরো উত্তেজিত হয়ে যান। তিনি বলেন, হোয়াট নন্সেস, বাবলু তুমি বেশি বেড়ে গেছো।এরশাদ তাদেরকে বারবার থামাতে চেয়েও পারেননি। এক পর্যায়ে তিনি কক্ষ ছেড়ে চলে যান। এর পরপরই ওই রুম থেকে বেরিয়ে যান কাদের এবং বাবলুও।
বছর জুড়ে জাতীয় পার্টিতে ছিল বহিষ্কার ও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার নাটক।এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল জাতীয় পার্টির তিন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যকে বহিষ্কার। আবার এদের মধ্যে একজনকে দলে ফিরিয়েও আনা হয়।গত ২৮ জুলাই চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সোলায়মান আলম শেঠকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে।জানা গেছে, গত ২৬ জুলাই চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় পার্টির ‘সভাপতি’ পদ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এমপিকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেন সোলায়মান আলম শেঠ। নগরীর অভিজাত হোটেল পেনিনসুলায় এক ইফতার মাহফিলে তিনি এ ঘোষণা দেন। ইফতার পার্টি শেষে সোলায়মান শেঠের অনুসারীরা হোটেলের সামনে জিয়াউদ্দিন বাবলুর কুশপুতুল পোড়ায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ জুলাই বহিষ্কার করা হয় সোলেয়মান শেঠকে।গত ৮সেপ্টেম্বর দলটির সংসদীয় সভায় দলীয় চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সমালোচনা করায় ১০ সেপ্টেম্বর সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।অব্যাহতি দেওয়ার দুই মাসের মাথায় ১৮নভেম্বর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাকে দলের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য পদে পুনর্বহাল করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।