সিসি নিউজ: চলমান সহিংসতা বন্ধে সব কৌশল ব্যর্থ হলে সরকার শেষ সম্বল হিসেবে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে। তবে এ ব্যাপারে এখনও আগ্রহী নন প্রধানমন্ত্রী। তিনি শেষ পর্যন্ত বিএনপির বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে চান। তার ধারণা, এতে সফলও হবেন তিনি। আর এজন্য তিনি কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহল নানা দিক থেকে তার ও সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে যাচ্ছে, কিন্তু এসব চাপ তিনি গুরুত্বহীন মনে করছেন। সেই সঙ্গে তিনি এটাও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ভুলেও কোনো পক্ষের সঙ্গে সংলাপে বসবে না সরকার। তার অবস্থান স্পষ্ট- বিএনপিকে নির্বাচনের জন্য ২০১৯ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। চাইলে এরপরের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে। এর আগে কোনো সংলাপ হবে না। আন্তর্জাতিক মহলকেও তিনি এটাও জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তারা যে উদ্যোগ নিচ্ছেন সংলাপের, সেটা হচ্ছে না। উল্টো তার দলের নেতা ও তার মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য বিদেশিদেরকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তাদের মতো সরকারও সহিংসতা বন্ধ করতে চায়। তারা বিদেশিদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যে, এজন্য সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার এটাও প্রমাণ করতে চাইছে যে, সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা বিএনপি-জামায়াত জোট করছে। সরকারের কেউ এর সঙ্গে জড়িত নয়। বিএনপি এই দায় সরকারের ওপর চাপালেও সরকার তা মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে সরকার বিদেশিদের সিদ্ধান্ত না মানলেও সম্পর্কের স্বাভাবিক অবস্থা রাখতে চাইছে। এইজন্য আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে বৈঠকেও বসছে। সেখানে সরকারের মন্ত্রীরা বিদেশিদের এটাই বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তারা যেহেতু বিএনপির পক্ষে কাজ করছেন, এজন্য তারা আগে সকল সহিংসতা বন্ধের উদ্যোগ নিক। সেটা সফল হলে সরকার বিএনপির অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করবে। বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচি থাকলে বিদেশিরা যতই চাপ দিক, বিবৃতি দিক, সরকার তাতে গুরুত্ব দেবে না। এই তথ্য মিলেছে সরকারের মন্ত্রিসভার সিনিয়র এক সদস্যের সূত্রে।
ওই সূত্র জানায়, সরকার মনে করছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি অবস্থা জারি হবে শেষ সম্বল। কিন্তু সেটা এখনই জারি করবে না সরকার। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থা জারি করে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলে সবাই বলবে, সরকার পারেনি বলেই সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়েছে, জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এটা সরকারের জন্য একটা ব্যর্থতারও উদাহরণ সৃষ্টি করবে। এ কারণেই শেখ হাসিনা কোনো ধরনের ব্যর্থতার দাগ লাগাতে চান না। জরুরি অবস্থা আপাতত জারি না করেই অন্য সব কঠোর কৌশল অবলম্বন করে আন্দোলন দমন করতে চান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি। আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি সেনাবাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্যদেরকে সতর্ক থাকতে বলেছেন।
সরকারের ওই মন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত বলা যায়, জরুরি অবস্থা জারির জন্য এখনও উপযুক্ত সময় আসেনি। পরিস্থিতির চরম অবনতি হলে এবং নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লেই কেবল সেটা জারির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, জরুরি অবস্থা জারি করা হলে তা করতে হবে ১২০ দিনের জন্য। কিন্তু এরপর তা শেষ করা না হলেও আপনাআপনি শেষ হয়ে যাবে। এই অবস্থায় সরকার যদি জরুরি অবস্থা জারি করে তাহলে আগামী চার মাসের মধ্যে সরকারকে সব ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেই সঙ্গে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও মাঠে নামাতে হবে। কিন্তু আপাতত সেনা সদস্যদের মাঠে নামানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না সরকার। আদৌ সেনা সদস্যদের মাঠে নামানোর মতো কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন কিনা সেটাও বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীরা এই বিষয়টি আপাতত এড়িয়ে যেতে চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও চাইছেন না জরুরি অবস্থা জারি করতে। যখন জরুরি অবস্থা জারি নিয়ে নানা দিকে কথা হচ্ছে, কোনো কোনো মিডিয়াতেও খবর আসতে থাকে, তখন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়েও তার বক্তৃতায় জানিয়ে দেন, জরুরি অবস্থা জারির পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চলমান সহিংসতা বন্ধে জরুরি অবস্থা জারির পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বুধবার সংসদে তাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, অনেককেই বলতে দেখছি। হয়ে গেল, এসে গেল ইমার্জেন্সি। ইমার্জেন্সি লাগবে কেন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা তো আছে। কিভাবে সন্ত্রাস দমানো যায় সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া আছে। তিনি বলেন, জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই আমরা এ অবস্থার মোকাবিলা করতে পারব ইনশাআল্লাহ।
জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে যাতে করে কেউ কোনো ধরনের অপপ্রচার কিংবা প্রচারণা চালাতে না পারেন, সেজন্য তিনি এই বিষয়টি পরিষ্কার করে দেন। কেমন করে জরুরি অবস্থা জারির নিয়ন্ত্রকও যে তিনি, সেটাও স্পষ্ট করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেন, ইয়াজউদ্দিন জরুরি অবস্থা জারি করতে পেরেছিলেন, কারণ তিনি একই সাথে সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। নির্বাহী ক্ষমতায় জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন। এখন জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে প্রধানমন্ত্রীকে লিখে দিতে হবে তারপর রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবেন। দেশের কিছু লোক আছেন, দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকলে তাদের ভালো লাগে না। অসাংবিধানিক পন্থায় কাউকে আনা যায় কি না, সেজন্য ব্যস্ত থাকেন। তিনি কেউ যাতে সংবিধান লঙ্ঘন না করেন, সে ব্যাপারেও ইঙ্গিত করে শাস্তির বিধানও বলেছেন। সেদিন তিনি বলেন, সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদের ‘খ’ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে যে, কেউ যদি সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল করে তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। আবার এখানে ক্যাপিট্যাল পানিশমেন্টের (সর্বোচ্চ শাস্তি) ব্যবস্থা আছে। জাতির পিতা হত্যার পর দেশে বারবার ‘ক্যু’ হয়েছে। বহু মানুষ মারা গেছেন। আমরা চাই না, দেশে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটুক। আমার রক্ত থাকতে তা হতে দেওয়া হবে না। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারব।
এদিকে সংবিধানের নবম-ক ভাগে জরুরি অবস্থা নিয়ে জরুরি বিধানাবলীতে তিনটি ধারায় বলা হয়েছে,
১৪১ক। জরুরি-অবস্থা ঘোষণা
১৪১খ। জরুরি-অবস্থার সময় সংবিধানের কতিপয় অনুচ্ছেদের বিধান স্থগিতকরণ
১৪১গ। জরুরি-অবস্থার সময় মৌলিক অধিকারসমূহ স্থগিতকরণ
সেখানে জরুরি-অবস্থা ঘোষণার ব্যাপারে ১৪১ক। (১) তে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এমন জরুরি-অবস্থা বিদ্যমান রহিয়াছে, যাহাতে যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের দ্বারা বাংলাদেশ বা উহার যে কোনো অংশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপদের সম্মুখীন, তাহা হইলে তিনি অনধিক একশত কুড়ি দিনের জন্য জরুরি-অবস্থা ঘোষণা করিতে পারিবে।
তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ ঘোষণার বৈধতার জন্য ঘোষণার পূর্বেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি-স্বাক্ষর প্রয়োজন হইবে।
(২) জরুরি-অবস্থার ঘোষণার ব্যাপারে বলা হয়েছে, (ক) পরবর্তী কোনো ঘোষণার দ্বারা প্রত্যাহার করা যাইবে; (খ) সংসদে উপস্থাপিত হইবে; (গ) একশত কুড়ি দিন সময়ের অবসানে কার্যকর থাকিবে না। সংবিধানে ১২০ দিনের কথা উল্লেখ থাকায় সরকার বিষয়টি নিয়েও ভাবছে। সরকারের সমানে সময় আছে আরো চার বছর। এই সময়ের মধ্যে সরকার কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইছে না। একটি গণতান্ত্রিক সরকার জরুরি অবস্থা জারি করলে জনগণের কাছে সরকারের শক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সেই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য সরকার সেনাবাহিনীর সদস্যদের মাঠে নামালে পরে এ নিয়ে সমলোচনার মুখোমুখি হতে পারে। জনগণ ধরে নেবে যে, সরকার পিরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ব্যর্থ হয়েছে। সেনাবাহিনীর সহায়তা নিলে এটা শেখ হাসিনার জন্যও একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই কারণে সরকার জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টিকে আপাতত গুরুত্ব দিচ্ছে না।
সংবিধানে আরো বলা হয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে, যদি সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অনুরূপ কোনো ঘোষণা জারি করা হয় কিংবা এই দফার (গ) উপ-দফায় বর্ণিত এক শত কুড়ি দিনের মধ্যে সংসদ ভাঙ্গিয়া যায়, তাহা হইলে তাহা পুনর্গঠিত হইবার পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে ত্রিশ দিন অতিবাহিত হইবার পূর্বে ঘোষণাটি অনুমোদন করিয়া সংসদে প্রস্তাব গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত উক্ত ত্রিশ দিনের অবসানে অথবা একশত কুড়ি দিন সময়ের অবসানে, যাহা আগে ঘটে, অনুরূপ ঘোষণা কার্যকর থাকিবে না।
(৩) যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের বিপদ আসন্ন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে প্রকৃত যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগ সংঘটিত হইবার পূর্বে তিনি অনুরূপ যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের জন্য বাংলাদেশ বা উহার যে কোনো অংশের নিরাপত্তা বিপন্ন বলিয়া জরুরি-অবস্থা ঘোষণা করিতে পারিবেন।
এদিকে জরুরি-অবস্থার সময় সংবিধানের কতিপয় অনুচ্ছেদের বিধান স্থগিতকরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১৪১খ। এই সংবিধানের তৃতীয় ভাগের অন্তর্গত বিধানাবলীর কারণে রাষ্ট্র যে আইন প্রণয়ন করিতে ও নির্বাহী ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে সক্ষম নহেন, জরুরি-অবস্থা ঘোষণার কার্যকরতা-কালে এই সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪২ অনুচ্ছেদসমূহের কোনো কিছুই সেইরূপ আইন-প্রণয়ন ও নির্বাহী ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কিত রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করিবে না; তবে অনুরূপভাবে প্রণীত কোনো আইনের কর্তৃত্বে যাহা করা হইয়াছে বা করা হয় নাই, তাহা ব্যতীত অনুরূপ আইন যে পরিমাণে কর্তৃত্বহীন, জরুরি-অবস্থার ঘোষণা অকার্যকর হইবার অব্যবহিত পরে তাহা সেই পরিমাণে অকার্যকর হইবে।
জরুরি-অবস্থার সময় মৌলিক অধিকারসমূহ স্থগিতকরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১৪১গ। (১) জরুরি-অবস্থা ঘোষণার কার্যকরকালে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা ঘোষণা করিতে পারিবেন যে, আদেশে উল্লেখিত এবং সংবিধানের তৃতীয় ভাগের অন্তর্গত মৌলিক অধিকারসমূহ বলবৎকরণের জন্য আদালতে মামলা রুজু করিবার অধিকার এবং আদেশে অনুরূপভাবে উল্লেখিত কোনো অধিকার বলবৎকরণের জন্য কোনো আদালতে বিবেচনাধীন সকল মামলা জরুরি-অবস্থা ঘোষণার কার্যকরকালে কিংবা উক্ত আদেশের দ্বারা নির্ধারিত স্বল্পতরকালের জন্য স্থগিত থাকিবে। (২) সমগ্র বাংলাদেশ বা উহার যে কোনো অংশে এই অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত আদেশ প্রযোজ্য হইতে পারিবে। (৩) এই অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত প্রত্যেক আদেশ যথাসম্ভব শীঘ্র সংসদে উপস্থাপিত হইবে।
এদিকে আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিস্ট সূত্র জানায়, জরুরি অবস্থা জারির ব্যাপারে সরকার এখনও কোনো আলোচনা করেনি। তবে অভ্যন্তরীণভাবে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে দেখা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন ঘরে বসেই দেশের পরিস্থিতি খারাপ করতে চাইছেন। তিনি অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ডেকেছেন। রোববার থেকে আবার ৭২ ঘণ্টার হরতাল দিয়েছেন। তবে তা দিলেও এই হরতাল ও অবরোধের মধ্যে যেটা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে তা হলো, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্ষতি বেশি হচ্ছে। সেই সঙ্গে সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। তবে বিএনপির বিভিন্ন জেলায় নেতাকর্মীরা ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা সক্রিয় থাকলেও ঢাকার তাদের কোনো নেতা মাঠে নেই। তারা ঘরে বসে আছেন। সরকার তাদেরকে গ্রেপ্তার করবে, রিমান্ডে নেবে, এই আতঙ্কেই এখন মাঠছাড়া। ঢাকার নেতারা নামার সঙ্গে সঙ্গেই আটক করবে সরকার। এই অবস্থায় সরকার তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা কোনো কঠিন বিষয় মনে করছে না। এছাড়াও সরকার ঢাকার বাইরের নেতাদেরও দমন করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকার বাইরে যে সব জেলায় বিভিন্ন নেতারা সফল ছিলেন, তাদেরকে অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদেরও গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। ওই সূত্র জানায়, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিএনপি, জামায়াত ও তাদের জোটের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকলে এবং পরিস্থিতি খারাপ করলেই তাদেরকে আটক করবে। আর আপাতত এছাড়াও আরো দুটি পন্থায় সরকার এগুচ্ছে। এতে করে বিএনপির নেতারা অনেকটা চুপসে গেছেন। বিএনপির নেতারা মাঠে না থাকলেও আন্দোলন চলছে। সরকারও পুরোপুরি আন্দোলন দমন করতে পারছে না। নানা কৌশল নিলেও কোনো উদ্যোগই সাফল্য এনে দিচ্ছে না। এই কারণে বারবার কৌশলে পরিবর্তন করা হচ্ছে।
এই ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ও তাদের জোটের নেতাকর্মীরা যেভাবে মানুষ মারছে এটা সহ্য করা যায় না। আমরা এখন কোনো ছাড় দেব না। যে নেতাকর্মীরা পরিস্থিতি অবনতির জন্য চেষ্টা করবেন, তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হবে। এখন র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, আনসার মাঠে রয়েছে। তারা কাজ করছে। এই অবস্থায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজন হবে না। আমরা মনে করি, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলব।
এদিকে অনেকই মনে করেন, পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে তাতে সরকার সেনাবাহিনীর সদস্যদের মাঠে নামিয়ে সহায়তা নিতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আবার তাদেরকে ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু এই বিষয়টি আপাতত গুরত্ব দিচ্ছে না সরকার। আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থা জারি করার বিষয়ে অনেক কথাই অনেকেই বলছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আপাতত তা জারি করা হবে না। সেই রকম কোনো প্রয়োজনও অনুধাবন করা হচ্ছে না। জরুরি অবস্থা জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে, এটাও মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ, এখন যে সব ঘটনা ঘটছে, তা তো বেশিরভাগই চোরাগুপ্তা হামলা। আমরা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি। প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ও কৌশলে পরিবর্তন করা হচ্ছে। আরো কঠোর সব কৌশলও আমরা অবলম্বন করব। তবে এই জন্য বিএনপিকে একটু সময়ও দেওয়া হচ্ছে। সরকার যখন আরো কঠোর হবে তখন তারা দিশা পাবে না।
আপাতত না হলে পরে হতে পারে, এমন কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত হচ্ছে না, এটা বলতে পারি। আগামী দিনের কথা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে আমি মনে করি, জরুরি অবস্থা জারি করার দরকার হবে না। সরকার সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যারা নাশকতা, মানুষ হত্যা, সহিংসতার ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাদেরকে যে কোনো মূল্যে ধরে বিচারের মুখোমুখি করে কঠিন শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সরকার এমন কোনো আইন করুক, যাতে প্রমাণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু সরকার ব্যবস্থা নেওয়ার চাইতেও এই সব দায় বিএনপির ওপর চাপাচ্ছে। আর বিএনপি দায় অস্বীকার করছে। তারাও সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে বলছে, এগুলো সরকার করছে। একদিকে সরকারের দায় চাপানো আর বিএনপির দায় অস্বীকার করে সরকারের ওপর এই সব ঘটনার দায় চাপানোর মধ্যে সংকট রয়েই যাচ্ছে। আড়ালে থেকে যাচ্ছে এই সব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছেন ও ইন্ধন দিচ্ছেন তারা। আর এ কারণেই এই ধরনের ঘটনা পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার মাঠে থেকেও প্রতিহত করতে পারছে না। এক লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করার পরও সাফল্য আসছে না। তারা ছাড়াও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের সদস্যরা সবোর্চ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তারা মাঠে থেকে এই ব্যাপারে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ফলে দিনে দিনে পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। হাসাপাতালে দ্বগ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আর অন্যদিতে পুড়ে মরার ঘটনায় লাশের সংখ্যাও বাড়ছে। আবার বিএনপি চেয়ারপারসন বিবৃতি দিয়ে সব ঘটনার দায় সরকারের ওপর দিয়েছেন।
বিএনপি ৫ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ পালন করে চলেছে। এরমধ্যে হরতাল দিচ্ছে। এই অবস্থায় সরকার অবরোধ প্রতিহত করা ও হরতাল বন্ধ করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। দিনের পর দিন এই অবস্থা চলছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতির অবনতির হচ্ছে। আর এই অবস্থায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, এই পরিস্থিতি আর কয়েকদিন থাকতে পারে। এরমধ্যে আমরা সব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলব। সব বন্ধ হয়ে যাবে। একটু অপেক্ষা করতে হবে।
বিএনপি অবরোধ করছে, হরতাল করছে, প্রানহানির ঘটনা ছাড়াও দেশের সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু এটা আর কতদিন এভাবে চলবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা যে কোনো মূল্যে তা বন্ধ করতে চাই। এজন্য সব ধরনের চেষ্টা করছি। উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। কিন্তু বিএনপি যা করছে এই অবস্থায় আমরা পাল্টা ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতির আরো খারাপ হবে। এই জন্য আমরা কৌশলেই এগুচ্ছি।
বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। বিএনপি পরিস্থিতি আরও খারাপ করার জন্য যা যা করার তা করবে। তারা ঘোষণা করেছে, তারা সফল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। বেগম খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে বসেই সব নির্দেশনা দিচ্ছেন। আগে সরাসরি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দিতে পারলেও এখন পারছেন না। তবে ভিন্ন মাধ্যমে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকারপ্রধানও। বিএনপির আন্দোলন দমনে কোনো ব্যবস্থাই দ্রুত কাজে আসছে না দেখে প্রধানমন্ত্রী নিজেই চেষ্টা করছেন, যে কোনো মূল্যে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানোর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে বলার পরও তারাও তেমন সাফল্য দেখাতে পারছেন না। এই অবস্থায় শঙ্কিত দেশের মানুষ। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া মানুষ বাইরে বের হচ্ছেন কম। আর এই কারণেই তারা মনে করছেন যে, পরিস্থিতির উন্নতি দরকার। এজন্য অনেকেই জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে মত দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, চলমান অবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য অবশ্যই সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। আপদকালীন ব্যবস্থা হিসাবে জরুরি অবস্থাও জারি করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। জরুরি অবস্থা জারি করে মাঠে সেনাবাহিনীর সদস্যদের দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তবে একাধিক সূত্র বলছে, সরকার এখনও জরুরি অবস্থা জারি করা কিংবা সেনাবাহিনী মাঠে নামানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এমনটি সম্ভাবনা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে সরকারের একটি সূত্র জানায়, সব শেষ ব্যবস্থা হিসাবে সেটা হতে পারে। তবে এখনও সরকার মনে করছে না তা লাগবে। আস