সিসি ডেস্ক: প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে বিএনপির ভূমিকাকে নতজানু হিসেবে মনে করেছে দলটির দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক জোট-ভোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। এ কারণে বিএনপির মোদিপ্রেমে নাখোশ হয়েছে জামায়াত। পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপির সাক্ষাৎ-চেষ্টা এবং পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর বিএনপির আনন্দ-উল্লাসকে সাময়িক উত্তেজনা হিসেবে দেখছে জামায়াত। দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ, ঢাকা মহানগর ও দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার অন্তত তিনটি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জামায়াতের সূত্রমতে, খালেদা-মোদি বৈঠক আউট অব সাইট হয়ে যাবে খুব দ্রুত। খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ-চেষ্টা এবং একান্ত বৈঠক, এই সবকিছু মূলত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা না করার কাফ্ফারা। এটা বিএনপির সাময়িক উত্তেজনা।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের এক সদস্য বলেন, ‘আন্দোলন করে সরকার সরাতে পারেনি। নির্বাচনে বাধ্য করতে পারেনি। এখন ভারতের দিকে চেয়ে আছে। চেষ্টা করেছে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে কিছু বোঝাতে। কিন্তু বিএনপি নিজেও সক্রিয় না। এসব বিষয় বাদ দিয়ে এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার চেষ্টা করে পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসতে চায় তারা।’
গত ৭ জুন বিকালে ২০ দলীয় জোটের শরিক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির শীর্ষস্থানীয় এক নেতাও বলেছিলেন, খালেদা-মোদি বৈঠক হতাশার মাঝে বেঁচে থাকার কল্পনা মাত্র।
গত ৬ জুন ৩৬ ঘণ্টার ঝটিকা সফরে বাংলাদেশে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সফরে তিনি ২২টি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ সফরের আগে ১ জুন মোদির সফরকে স্বাগত জানায় জামায়াত। যদিও ৭ জুন সফরে এসে করা ২২টি চুক্তির বিরোধিতা করেন দলটির ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমদ।
জামায়াতের আমির বলেন, ‘সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের জনগণ আশা করেছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে তিস্তা নদী ও ফেনীর মুহূরী নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাবে বাংলাদেশ। কিন্তু এ দুটি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়ে কোনও আলোচনা না হওয়ায় বাংলাদেশের জনগণ হতাশ হয়েছে।’
মকবুল আহমদ বলেন, দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান অসম বাণিজ্য, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ, অপদখলীয় ভূমি হস্তান্তর, অনিষ্পন্ন সীমানা নির্ধারণ এবং পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত বিরোধের কোনও সমাধান এ সফরের মাধ্যমে জনগণ পায়নি।
জামায়াত মনে করে, ‘দেশের জনগণের কাছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কার্যকর কোনও সহায়ক পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। সার্বিকভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর থেকে দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় জনগণ হতাশ হয়েছে।’
মোদির সফর বিষয়ে কর্মপরিষদের ওই সদস্য জানান, ‘নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে এসে ১২টা বাজিয়ে দিয়ে গেছেন। কোনও চুক্তিতেই বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা হয়নি।’
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সরকার মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজেদের বৈধতা আদায়ের বিষয়টি দেখানোর চেষ্টা করেছে।’
জানা গেছে, ২০ দলীয় জোট গত ডিসেম্বর মাসে শেষ বৈঠক করে। এরপর জোটের শরিক নেতাদের সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠক করলেও খালেদা জিয়া অদ্যাবধি কোনও বৈঠক ডাকেননি। এমনকি বিএনপির কোনও পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। এ প্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী আলোচনা সভায় বিএনপিনেতা শাজাহান উমর জোট ভেঙে দেওয়ার দাবি জানান। এরপর থেকে জোটের নেতাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ দেখা দেয়। পরবর্তীতে জোটের ভাঙনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেও জামায়াত পিছিয়ে যায়।
জামায়াতের সূত্রমতে, বিএনপি যতক্ষণ পর্যন্ত জোট সক্রিয় না করবে, ততক্ষণ জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনও চাপ দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছে দলটি।
সূত্রমতে, জোট সক্রিয় রেখে জামায়াতের কোনও রাজনৈতিক ফায়দা অর্জিত হয়নি। উল্টো সরকারের চাপ বৃদ্ধি পায়। সেক্ষেত্রে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার দিকেই নজর দিতে চায় জামায়াত।
এ ব্যাপারে জোটের সঙ্গে লিয়াজোঁ রক্ষার দায়িত্বে থাকা জামায়াতের এক দায়িত্বশীল নেতা জানান, ‘জোট তো আছে। কিন্তু বিএনপি নিজেই নিষ্ক্রিয়। তাই, জোট সক্রিয় করতে পারছে না। আমাদের তো চাওয়া-পাওয়ার কিছু নাই। সমস্যা হয় ছোট দলগুলোর সঙ্গে। তাদেরতো জোটের ব্যানার প্রয়োজন।’
তিনি জানান, জামায়াত জোটপ্রসঙ্গে নতুন কিছু করবে না। অপেক্ষায় থাকবে জোটের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে। আগ বাড়িয়ে কিছু বলবেও না। বিএনপি যা করে তাই পর্যবেক্ষণ করবে জামায়াত।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. অব. মাহবুবুর রহমান বলেন, জোটের বিষয়টি তো দলীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপার। দল আগে বসে সিদ্ধান্ত নিক। এরপর বলা যাবে জোটের কার্যক্রম চলবে নাকি স্থগিত হবে।