সিসি ডেস্ক: সারাদেশে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর-পরবর্তী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হই চই এবং নিন্দা-সমালোচনা চলছে তেমন এক সময়ে একটি তথ্য-বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। একে আমরা ‘প্রণব-বোমা’ বলতে পারি। ভারতের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন সানডে গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া জানিয়েছেন, মূলত নিজের প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল বলেই ২০১৩ সালের মার্চে তিনি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকে অংশ নেননি। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, সেদিন জামায়াতে ইসলামীর ডাকে হরতাল পালিত হচ্ছিল। হরতালের মধ্যে গাড়িতে চড়ে সোনারগাঁও হোটেলে আসা যাওয়ার পথে তার ওপর হামলা চালানো হতো আর হামলা ও হত্যার দায় চাপানো হতো জামায়াতের ওপর। এটাই ছিল সরকারের ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা- ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্রের বিষয়টি সম্পর্কে আগেই জেনে গিয়েছিলেন বলেই খালেদা জিয়া বৈঠক বাতিল করেছিলেন। সানডে গার্ডিয়ানের সাংবাদিককে খালেদা বলেছেন, এতদিন পর এসে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করার ‘প্রকৃত’ কারণ আপনাকে জানালাম।
পাঠকদেরও নিশ্চয়ই মনে পড়বে, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ২০১৩ সালের ৪ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও আরো অনেকের সঙ্গেই দেখা ও কথা হয়েছিল তার। নড়াইলে শ্বশুরবাড়িতে গেছেন তিনি, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহের দিঘীতে নৌকায় বসে রবীন্দ্রসঙ্গীত উপভোগ করেছেন। খাওয়া-দাওয়াও যথেষ্টই করেছিলেন। কিন্তু এতকিছুর পরও প্রণব মুখার্জি নাকি খুশি হতে পারেননি বরং ফিরতি পথে বিমানে তাকে যথেষ্ট ‘ক্ষুব্ধ’ দেখেছিলেন ভারতের সাংবাদিকরা। কথাটা ভারতীয় পত্রপত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশেও প্রকাশিত হয়েছিল। ‘ক্ষুব্ধ’ হওয়ার কারণ ছিল একটাইÑ বেগম খালেদা জিয়া তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি এবং পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করেছিলেন। প্রণব মুখার্জির প্রতিক্রিয়া জানারও আগে এ ব্যাপারে জানান দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা। তারা এমন এক প্রচারণা চালিয়েছিলেন যেন ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে খালেদা জিয়া বিরাট কোনো ‘অপরাধ’ করে ফেলেছিলেন! ‘কচি-কাঁচার আসর’-এর সদস্য হিসেবে পরিচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের লন্ডন প্রবাসী সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের প্রত্যেকেই একই কঠোরতার সঙ্গে নিন্দা-সমালোচনায় সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। সে প্রচারণা তারা এখনো অব্যাহত রেখেছেন। এখনো তারা বিএনপির বিরুদ্ধে ভারতীয়দের উস্কানি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। শেখ ফজলুল করিম সেলিম তো মাত্র ক’দিন আগে সংসদে দাঁড়িয়েও মিথ্যাচার করেছেন। অন্যদিকে সত্য কিন্তু তেমন ছিল নাÑ ক্ষমতাসীনরা যেমনটি বোঝাতে চেয়েছিলেন এবং এখনো বোঝাতে চাচ্ছেন। কারণ, এই সাক্ষাতের জন্য নির্ধারিত তারিখ ছিল ২০১৩ সালের ৪ মার্চ। সেদিন এবং তার আগেরদিন আগেই হরতাল ডেকেছিল ১৮ দলীয় জোটের দ্বিতীয় প্রধান দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জোটের প্রধান নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে হরতাল ভঙ্গ করা এবং গাড়িতে চড়ে সোনারগাঁও হোটেলে গিয়ে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বৈঠকে বসা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া গণহত্যাসহ সরকারের ফ্যাসিস্ট কর্মকাণ্ডের কারণে তার নিরাপত্তার প্রশ্নও ছিল, যে কথাটা এতদিন পর তিনি প্রকাশ করেছেন। এজন্যই খালেদা জিয়া অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। এতেই নাকি সরকারের ‘মহাভারত’ অশুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল! ওদিকে ভারতীয়রাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার লিখেছিল, প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিল করার মাধ্যমে খালেদা জিয়া নাকি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ব্যাপারে ‘সুদূরপ্রসারী বার্তা’ দিয়েছেন! রাষ্ট্রপতি ভবনের উদ্ধৃতি দিয়ে আনন্দবাজার আরও জানিয়েছিল, খালেদা জিয়া আসবেন না- এ খবরটি জানার পর প্রণব মুখার্জির মুখের হাসি নাকি কিছুক্ষণের জন্য ‘উধাও’ হয়ে গিয়েছিল!
ক্ষমতাসীনরা ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ না করার বিষয়টিকে নিয়ে এভাবে ‘পলিটিক্স’ করলেও দেশপ্রেমিকরা কিন্তু ১৮ দলীয় জোট নেত্রীর সিদ্ধান্তকে সঠিক ও জাতীয় নেত্রীসুলভ হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। তারা বলেছিলেন, সরকার আসলে প্রণব মুখার্জিকেও নিজেদের দাবার ঘুঁটিই বানিয়ে ছেড়েছেন। নাহলে এবং ভারতের রাষ্ট্রপতিকে সম্মান দেখানোর সত্যিই সদিচ্ছা থাকলে সরকার অবশ্যই জামায়াত-শিবিরের গণতন্ত্রসম্মত প্রতিবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে এতটা ভয়ঙ্করভাবে মারমুখী হয়ে উঠতো না। তার সফরের প্রাক্কালে ডজনে-ডজনে লাশও ফেলতো না। ক্ষমতাসীনরা ঠিকই জানতেন, আন্দোলনকারীদের লাশের ওপর দিয়ে খালেদা জিয়া অন্তত প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবেন না। তেমন অবস্থায় তারা সহজেই খালেদা জিয়াকে ভারতবিরোধী হিসেবে তুলে ধরতে এবং নতুন পর্যায়ে ভারতের সমর্থন আদায় করতে পারবেন। মূলত অমন এক কুটিল কৌশল নিয়েই এগিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা। অন্য একটি কথাও প্রসঙ্গক্রমে ব্যাপকভাবেই আলোচিত হয়েছিল। সেটা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি প্রণব মুখার্জির সমর্থন সংক্রান্ত। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় যখন সেনা অফিসারদের হত্যা করা হচ্ছিল তখন এই প্রণব মুখার্জি নাকি ঢাকা থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ‘অনুরোধ’ তথা এসওএস বার্তা পেয়েছিলেন। এই বার্তার ভিত্তিতেই তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। কলকাতা ও আসামের গৌহাটি বিমান বন্দরে যুদ্ধ বিমানগুলোকেও রেখেছিলেন ‘প্রস্তুত’ অবস্থায়। পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য পাল্টা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এটা ছিল পরিস্কার হুমকি, যার ওপর ভর করে তখনকার মতো বিপদ পাড়ি দিয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার। পরবর্তীকালেও বিভিন্ন উপলক্ষে প্রণব মুখার্জি আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থনে দাঁড়িয়েছেন। তিনি ঢাকা সফরে এসে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ এবং আওয়ামী লীগের ‘র্যাটস’ নামের চার নেতাসহ অনেকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন কিন্তু বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসার সময় পাননি। এজন্যই প্রশ্ন উঠেছিল, সেটা যদি ‘অশোভন’ ও ‘কূটনৈতিক সৌজন্যের লংঘন’ না হয়ে থাকে তাহলে হরতালের যুক্তিসঙ্গত কারণে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন এত পাড়া মাতানো হয়েছিল?
প্রশ্নটির উত্তর রয়েছে অন্য একটি কারণের মধ্যে। ক্ষমতাসীনরা আসলে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন খালেদা জিয়ার দুটি বিবৃতির জন্য। প্রথম বিবৃতিটি তিনি দিয়েছিলেন ২ মার্চ। এক সংবাদ সম্মেলনে ‘গণবিচ্ছিন্ন’, ‘ব্যর্থ’ ও ‘রক্তপিপাসু খুনী’ সরকারকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করার ডাক দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, নিরস্ত্র জনগণের ওপর সরকার শুধু গুলি চালাচ্ছে না, গণহত্যার ভয়ঙ্কর অভিযানও চালাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ভিনদেশী কোনো হানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। এ ধরনের গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই আমরা ১৯৭১ সালে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছিলাম। দেশের ওই সময়ের পরিস্থিতিকে ভয়াবহ সঙ্কট হিসেবে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, সরকার গোটা জাতিকে বিভক্ত করে এক ভয়ঙ্কর সংঘাত ও সহিংসতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ইসলাম এবং স্বাধীনতার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। অথচ সরকারের মদদে একটি কুচক্রী মহল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের নামে পবিত্র ইসলাম এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে নোংরা কুৎসা রটনা করে বেড়াচ্ছে। তারা সরকারবিরোধী সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলো বন্ধ করার হুমকি দিচ্ছে। ভিন্ন মতাবলম্বীদের ধরে ধরে ‘জবাই’ করতে চাচ্ছে।
শাহবাগের তরুণ প্রজন্মের প্রতি ইঙ্গিত করে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, সরকার একটি গোষ্ঠীকে উসকানিমূলক ও বেআইনি কর্মকাণ্ড সংঘটনে প্রতিনিয়ত আসকারা ও সমর্থন দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে এই গোষ্ঠীর লোকজন জাতীয় জীবনে বিভেদ-বিভাজনকে উস্কে দিচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংক বীমা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালানোয় উৎসাহ দিচ্ছে। সরকার তাদের বাধা দেয়ার পরিবর্তে উল্টো সহযোগিতা করে যাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। শাহবাগীরা অভিযুক্ত প্রত্যেককে ফাঁসি দেয়ার যে অন্যায় দাবি জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তার পক্ষ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের প্রতি দাবিটি বিবেচনায় রেখে রায় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন ঘটনা নজীরবিহীন। এর মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচারের সর্বশেষ আশাটুকুও তিরোহিত হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো বিচারকের পক্ষেই স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করা কিংবা রায় দেয়া সম্ভব নয়। তাই এ ট্রাইব্যুনালের যে কোনো রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে। প্রসঙ্গক্রমে কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারেও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। বলেছিলেন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার আমরাও চাই। তবে সে বিচার হতে হবে স্বচ্ছ এবং দেশী ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে। আমরা বিচারের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের পক্ষপাতী নই। অন্যদিকে চলমান বিচার প্রক্রিয়া, ট্রাইব্যুনাল ও আইন নিয়ে শুধু দেশে নয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপক প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। সে কারণে আমরা বারবার সরকারকে সতর্ক করেছি। এ বিচারের ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য গঠন খুবই জরুরি ছিল। কিন্তু সরকার আমাদের কথায় কান দেয়নি।
৪ মার্চের দ্বিতীয় বিবৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার হীন উদ্দেশ্যে সরকার পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণ চালিয়ে দেশে বিরাজিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংসের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি এই আত্মঘাতী ষড়যন্ত্র থেকে বিরত হওয়ার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংসের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সজাগ থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বিচার প্রক্রিয়ার ওপর বিক্ষোভের চাপ প্রয়োগকে সমর্থন জানিয়ে, জাতিকে বিভক্ত করে ও সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়ে এবং নিজের দেশের নাগরিকদের ওপর বর্বর হত্যাকান্ড চালিয়ে সরকার ক্ষমতায় থাকার সব নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। এ সরকার ক্ষমতায় থাকলে দেশ আরো ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হবে। সে কারণে অনতিবিলম্বে ‘রক্তপিপাসু খুনী’ সরকারের পদত্যাগ দাবি করে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, জুলুম-নির্যাতনের পথ বেছে নেয়া হলে আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবো। সরকারের জন্য এর পরিণাম হবে ভয়াবহ। সবশেষে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আসুন সবাই মিলে দেশ বাঁচাই, মানুষ বাঁচাই। আসুন মহান মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ ফসল গণতন্ত্রকে রক্ষা করি। জনগণের জানমালের হেফাজত করি এবং জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করি।
এসব লক্ষ্য অর্জন করার উদ্দেশ্যেই বেগম খালেদা জিয়া ২০১৩ সালের ৫ মার্চ সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালনের ডাক দিয়েছিলেন। তার ডাকে সাড়াও পড়েছিল জনগণের মধ্যে। হরতাল পালিত হয়েছিল সর্বাত্মকভাবে। এর কারণ, কোনো একটি প্রশ্নেই তিনি সামান্য বাড়িয়ে বলেননি বরং বলিষ্ঠভাবে উচ্চারণ করেছিলেন কঠিন সত্য। বস্তুত ইসলাম বিরোধী প্রচণ্ড উসকানি থেকে নিষ্ঠুর গণহত্যা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র পর্যন্ত প্রসঙ্গগুলোর পর্যালোচনায় দেখা যাবে, সরকারের মদদে শাহবাগের কথিত তরুণ প্রজন্ম শুধু বিচার প্রক্রিয়াকেই চ্যালেঞ্জ করেনি, ‘ফাঁসি চাই’ স্লোগানের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতার ওপরও হস্তক্ষেপ করেছিল। বন্দী সব নেতাকে সরাসরি ফাঁসির আদেশ দেয়ার জন্য প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ট্রাইব্যুনালের কাছ থেকে তারা গায়ের জোরে রায় আদায় করার চেষ্টা চালিয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়াও তাই না বলে পারেননি যে, ন্যায়বিচারের সর্বশেষ আশাটুকুও তিরোহিত হয়ে গেছে। একই কারণে এ ট্রাইব্যুনালের যে কোনো রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে। ইসলাম বিরোধী ধৃষ্টতাপূর্ণ প্রচারণা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও যথার্থই বলেছিলেন তিনি। ইসলাম ও স্বাধীনতার মধ্যে কোনো বিরোধ না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকার শুধু উস্কানি দিয়ে বেড়ায়নি, ইসলাম এবং স্বাধীনতাকেও মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের নামে শাহবাগের নাস্তিক ব্লগাররা ইসলামের বিরুদ্ধে নোংরা কুৎসা রটিয়ে বেড়ানোর সাহস পেয়েছে। হীন ও ভয়ঙ্কর এ অপচেষ্টার বিরুদ্ধেই সোচ্চার হয়েছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। কিন্তু দেশের ৯০ ভাগ অধিবাসী মুসলমানদের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার প্রতি সম্মান দেখানোর পরিবর্তে সরকার পুলিশকে লেলিয়ে দিয়েছিল। প্রণব মুখার্জির সফরের প্রাক্কালে ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ঘটনাপ্রবাহের প্রাথমিক পর্যায়ে মাত্র ১১ দিনে পুলিশ ১৭ জনের লাশ ফেলেছিল। এরপর এসেছিল মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা-উত্তর উত্তপ্ত পরিস্থিতি। ২৮ ফেব্রুয়ারির একদিনেই সরকার পুলিশকে দিয়ে ৬০ জনের বেশি মানুষের লাশ ফেলেছিল। সব মিলিয়ে নিহতদের সংখ্যা একশ’র কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। পৈশাচিক এ হত্যাকাণ্ডকেই বেগম খালেদা জিয়া ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তার এ মন্তব্য যথার্থ হলেও ক্ষমতাসীনরা জনগণকে গণহত্যার সংজ্ঞা সম্পর্কে জ্ঞান দেয়ার হাস্যকর প্রচেষ্টা শুরু করেছিলেন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছিলেন, খালেদা জিয়া নাকি গণহত্যার সংজ্ঞাই জানেন না! প্রশ্ন উঠেছিল, লাশের সংখ্যা কয়েক হাজার বা লাখ না ছাড়ালে তাকে গণহত্যা বলা যাবে নাÑ এ ধরনের জ্ঞানই বা তথ্যমন্ত্রীকে দান করেছেন কোন মহাজন? অন্য কিছু পন্থায়ও বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে উঠে-পড়ে লেগেছিলেন ক্ষমতাসীনরা। বলে বেড়িয়েছিলেন, জামায়াতের ডাকা ৩ ও ৪ মার্চের হরতালের পরদিন হরতালের ডাক দেয়ার মাধ্যমে বিএনপি নাকি জামায়াতের ‘লেজুড়বৃত্তি’ শুরু করেছে! এ ব্যাপারে এককালের ঘোর আওয়ামী লীগ বিরোধী বামপন্থী নেতা রাশেদ খান মেননের বক্তব্য উল্লেখ করতেই হবে। তিনি বলেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া নাকি জামায়াতের ‘ভারপ্রাপ্ত আমীর’ হয়েছেন! একই নেত্রী কিভাবে একদিকে জামায়াতের ‘ভারপ্রাপ্ত আমীর’ হন এবং অন্যদিকে তার দল বিএনপি কিভাবে জামায়াতের ‘লেজুড়বৃত্তি’ করেÑ সে প্রশ্নের জবাব কিন্তু কেউই দেননি। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয়নি, ইনু-মেননদের উদ্দেশ্য আসলে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করা, সম্ভব হলে দল দুটির ঐক্যে ভাঙন ধরানো। এই চেষ্টা তারা অবশ্য বহুদিন ধরেই চালাচ্ছেন। বিএনপির জন্য মায়াকান্নাও তারা কম কাঁদেননি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি বলে শেষ পর্যন্ত তারা বেগম খালেদা জিয়ার মান-সম্মান ধরে টান মেরেছিলেন। বিএনপিকে বলেছেন জামায়াতের ‘লেজুড়’!
এ ধরনের কোনো চেষ্টাতেই যে কাজের কাজ কিছু হবে না সে কথা স্বয়ং খালেদা জিয়াই পরিষ্কার করে দিয়েছেন। স্মরণ করা দরকার, ২ মার্চের সংবাদ সম্মেলনেই প্রথম নয়, কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে শুরু থেকেই তিনি একই অবস্থান বজায় রেখেছেন। যেমন জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারের পরপর, ২০১০ সালের ৫ অক্টোবর তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারের কথা বলে জাতিকে হানাহানির দিকে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা চলছে। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, স্বাধীনতার পর প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়েছিল মুজিব সরকার। চার দশক পর আরেক আওয়ামী লীগ সরকার বিচারের নামে জাতিকে হানাহানির দিকে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কথিত যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে সরকারের এই নীতিকে খালেদা জিয়া ‘দু’ মুখো নীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছিলেন, বিচারের নামে সরকারের পদক্ষেপটি জাতিকে শুধু বিভক্তই করবে না, দেশে রাজনৈতিক সংঘাতেরও উস্কানি দেবে। প্রায় আড়াই বছর পরও খালেদা জিয়া সে একই কথারই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। বাস্তবেও দেখা গেছে, সরকার দেশকে বিভক্ত করে ফেলেছে। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত যাতে ছড়িয়ে না পড়তে পারে এবং দেশের নিরাপত্তা যাতে বিপন্ন না হয় সে জন্যই খালেদা জিয়া দেশপ্রেমিক নাগরিকদের উদ্দেশে জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। জনগণ যে বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজপথে নেমে আসবে তার লক্ষণ ও সূচনা দেখা গিয়েছিল ৫ মার্চের হরতালে। এজন্যই প্রণব মুখার্জিকে নিয়ে ‘পলিটিক্স’ তখন কোনো কাজে আসেনি। এখনো আসবে বলে মনে হয় না। কারণ, এতদিন পর খালেদা জিয়া ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক বাতিল করার প্রকৃত কারণ ফাঁস করেছেন। বাংলাদেশের জনগণ তো বটেই, ভারতীয়রাও তার কথাই বিশ্বাস করবে।