।। ফরীদ আহমদ রেজা ।। আরবী ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ আনন্দ-উৎসব। এর আরেক অর্থ যা বার বার ফিরে আসে। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ বার বার ফিরে আসে এবং আবার ফিরে এসেছে। ঈদুল ফিতর বা রমজানের পর যে ঈদ সে দিনের সবচেয়ে বড় দৈহিক ইবাদাত জামাতের সাথে দু রাকাত ঈদের নামাজ এবং আর্থিক ইবাদাত ফিতরা আদায় করা। নতুন কাপড় পরিধান করা, উপহার বিনিময়, মজাদার খাবার পরিবেশন ইত্যাদি এর আনুষঙ্গিক উপাদান। মুসলমানদের ঈদ উৎসবের মধ্যে ইবাদাত, দান-খয়রাত, সামাজিকতা, আনন্দ-উৎসব ইত্যাদির আপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
মুসলমানরা সংসার-বিরাগী সন্যাসী নয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মুসলমানদের ধর্মবোধ খুব সুন্দর ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়’ এবং ‘অসংখ্য বন্ধন মাঝে লভিব মুক্তির স্বাদ’। মুসলমানদের ঈদ উৎসব শুধু ব্যক্তিগত ধর্মীয় ইবাদত বা আচার-অনুষ্ঠান নয়। সেখানে ব্যক্তির আত্মিক উন্নয়ন এবং সামাজিক চিন্তার সমন্বয় রয়েছে। ঈদের নামাজে হাজির হয়ে মুসলমানরা বিশ্ব-জাহানের প্রভূর উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হন। ব্যক্তি সেখানে ব্যক্তিগত ভাবে উপস্থিত হলেও নামাজ আদায় করতে হয় জামাতের সাথে, গরীব-ধনী সকলে এক কাতারে এক সাথে দাঁড়িয়ে। আল্লাহর কাছে যখন তারা মুনাজাত করেন তখন স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের জন্যে কল্যাণ কামনা করেন না। তারা সকলের জন্যে দোয়া করেন। তারা বলেন, ‘আমরা’ তোমারই ইবাদত করি এবং ‘আমরা’ তোমার কাছেই সাহায্য চাই। ‘আমাদের’ সিরাতাল মুস্তাক্বিম বা সহজ, সরল ও সঠিক পথে পরিচালিত করো। ‘আমাদের’ দুনিয়া এবং আখেরাতের মঙ্গল দান করো। মুসলমানদের প্রার্থনায় ‘আমি’র পরিবর্তে ‘আমরা’ এবং ‘আমাদের’ প্রাধান্য দেয়া হয়। তারা শুধু পরকালের কল্যাণ কামনা করেন না, পার্থিব জীবনের কল্যাণও প্রার্থনা করেন।
কুরআন মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ হলেও সেখানে বহু ইহলৌকিক বিধি-বিধান রয়েছে। মহানবী (স)-এর জীবনও ধর্মীয় এবং ইহলৌকিক আচার-অনুষ্ঠানে ভরপুর। স্বাভাবিক কারণেই মুসলমানদের ঈদ উৎসবের মধ্যে ধর্মীয় আচার এবং ইহলৌকিক মেজাজের সমন্বয় ঘটেছে। দেড় হাজার বছরের পথ-পরিক্রমায় সেখানে সামাজিকতা এবং দেশাচারও ভূমিকা রাখছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতির কারণে পৃথিবীর একপ্রান্তের আচার-অনুষ্ঠান, ফ্যাশন, সমাজিকতা প্রভৃতি অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে নতুন আমেজ নিয়ে উপস্থিত হবার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যান্য বিষয়ের মতো ঈদ উদযাপনেও আমরা একটা গ্লোবাল চিত্র প্রত্যক্ষ করছি।
ঈদের জামাতে শুধু বয়স্ক পুরুষরা উপস্থিত হন না, ছেলেমেয়ে এবং মহিলারাও সেখানে যান। দেড় হাজার বছর থেকে এ নিয়ম চালু রয়েছে। ঈদের জামাতে মহিলাদের অংশ গ্রহণের নিয়ম ইসলাম এমন এক যুগে চালু করেছে যখন পৃথিবীর কোথাও ধর্মীয় সমাবেশে মহিলাদের উপস্থিতি অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল। ঈদের শুরু মহানবী (স) মদীনায় হিজরত করার পর। তখন রোজা ফরজ হয় এবং ঈদ উৎসবের প্রচলন হয়। রাসুল (স)-এর যুগে খোলা মাঠে ঈদের নামাজ পড়া হতো এবং মদীনার মহিলারা ঈদের নামাজে শরিক হতেন। মহানবী (স) পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঈদের মাঠে যেতে মুসলমানদের বলেছেন। তিনি সকল বয়সের মেয়েদের ঈদের জামাতে হাজির হতে বলেছেন। শারীরিক কারণে যাদের জন্যে নামাজ পড়া ফরজ নয় তাদেরও যেতে বলেছেন। তারা নামাজ পড়তে না পারলেও সমাবেশে হাজির থাকবেন এবং খুতবা শুনবেন। তিনি আরো বলেছেন, যে সকল মহিলার বাইরে যাবার নিজস্ব চাদর নেই তারা যেন অন্য মহিলার চাদরে নিজেকে আবৃত করে ঈদের জামাতে হাজির হন।
মহানবী (স)’র সময় তাঁর উপস্থিতিতে মহিলারা মসজিদে নববীতে স্বাধীনভাবে যাতায়াত করেছেন। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ঈদের জামাতে মহিলাদের উপস্থিতি নিয়ে সঠিক ধারণা নেই। অনেকে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য জানেন না এবং অনেকে এ নিয়ে বিভ্রান্তিকর কথা বলেন। বাংলাদেশে এবং বিলাতে বাঙালি পরিচালিত অধিকাংশ মসজিদে মহিলাদের প্রবেশাধিকার নেই। মহানবী (স)’র একটি বানী উল্লেখ করে তারা বলেন, ‘মহিলাদের ঘরে নামাজ পড়া উত্তম’। সুতরাং তাদের ঈদের জামাতে যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু মহানবী (স)’র এ বক্তব্য সাধারণ নামাজের ব্যাপারে, ঈদের নামাজের ব্যাপারে নয়। তা ছাড়া মহানবী (স) এটাও বলেছেন, ‘তোমরা মহিলাদের মসজিদে যেতে বাঁধা দিবে না।’
আমরা বিলাতে এমন জনগোষ্ঠীর সাথে পাশাপাশি বাস করছি যারা ভিন্ন ধর্মের অনুসারী। প্রচলিত কোন ধর্মমতের অনুসারী নয় এবং স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়, এ রকম মানুষের সংখ্যাও এখানে কম নয়। ঈদ মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব হলেও এর সাথে ভিন্নমতের অনুসারী মানুষকে শরিক করার অনেক সুযোগ রয়েছে। ঈদ-এর মধ্যে ইবাদাতের সাথে সাথে বেশ কিছু সেকুলার অনুষঙ্গ রয়েছে। ফিতরা, উপহার বিতরণ, খাবার-দাবার ইত্যাদি ঈদের সামাজিক দিক। ইসলামী বিধি-বিধানের প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হচ্ছে, ইবাদাতের ব্যাপারে নতুন সংযোজন হচ্ছে বিদআত, সুতরাং পরিত্যাজ্য। কিন্তু সামাজিক ব্যাপারে আমরা সংযোজন-বিয়োজন করতে পারি। আমরা ঈদ উপলক্ষে অমুসলমানদের দাওয়াত দিতে পারি। ঈদ পূনর্মিলনী অনুষ্ঠানে অমুসলমানরা যাতে অংশ নিতে পারে সে ব্যবস্থা করতে পারি। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে মেলামেশার এ সুযোগকে আমরা অনেক সময় অবহেলা করি। এর ফলে দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসবাস করেও আমরা একে অপরের কাছে অপরিচিত হয়ে আছি। খোলামেলা পরিবেশে ভাবের ও মতের আদান-প্রদানের মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি দূর হয় এবং একে অপরের কাছাকাছি আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়। হোস্ট কমিউনিটির অংশ গ্রহণের মাধ্যমে ঈদের আনন্দকে আমরা সার্বজনীন আনন্দে পরিণত করতে পারি।
ঈদের দিন আমাদের সকলের বাড়িতে মজাদার খাবার তৈরি হয়। প্রতিবেশীদের আমরা সে খাবারে শরিক করতে পারি। রাসুল (স)-এর সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) তাঁর চাকরকে সব সময় বলতেন, সে যেন তাঁর ইহুদী প্রতিবেশীকে কুরবানীর গোশ্ত দিতে ভুলে না যায়। কারণ আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (স) মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল প্রতিবেশীর হক আদায়ের ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছেন। আমাদের প্রতিবেশী ইহুদী-খৃস্টান এবং যারা কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন না তাদের সকলের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। তাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা, সুখ-দুঃখে অংশ নেয়া এবং বিপদ-মুসিবতে তাদের পাশে দাঁড়ানো মুসলমান হিসেবে আমাদের কর্তব্য। ঈদের খাবারে তাদের শরিক করে আমরা তাদের কাছে ইসলামের সাম্য-মৈত্রী এবং ভ্রাতৃত্বের বানী পৌঁছে দিতে পারি।
ইসলামী শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ পন্ডিত ইবনে কাইয়িম বলেন, ‘ইসলামী বিধি-বিধানের ভিত্তি হচ্ছে প্রজ্ঞা। এর লক্ষ্য মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ সাধন। ন্যায়-বিচার, উদারতা, প্রজ্ঞা এবং কল্যাণকামিতা এর সার কথা। তাই যে ফতোয়া ন্যায়-বিচারকে জুলুমে, জনকল্যাণকে জনদুর্ভোগে, অথবা প্রজ্ঞাকে নির্বুদ্ধিাতায় পর্যবসিত করে তা স্পষ্টতঃ ইসলামী বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এ ধরণের সিদ্ধান্তের পক্ষে কুরআন-হাদীসের কোন প্রকারের ব্যাখ্যা হাজির করা হলেও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’ ন্যায়-বিচার, উদারতা, প্রজ্ঞা এবং কল্যাণকামিতা যে কোন সমাজ বা রাষ্ট্রের ভিত্তি। আমরা ইউরোপ-আমেরিকায় বিভিন্ন ধর্মের অনেক অনুসারী এবং বহু ধর্মহীন মানুষের সাথে কাজ করি। একজন মুসলমানের নাগরিক দায়িত্ব হচ্ছে তিনি যে দেশে-ই বাস করবেন সে দেশের নাগরিকদের কল্যাণকামনাকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনায় রাখবেন। বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণের জন্যে তিনি কাজ করবেন।
এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মুফাসসির সাহাবা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। একবার আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে এক অগ্নিপূজারী ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলে সালাম দেয়। জবাবে তিনি বলেন, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।’ ইবনে আব্বাসের কিছু সাথী জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি তাকে ওয়া রাহমাতুল্লাহ (আপনার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক) বললেন? ইবনে আব্বাস জবাব দেন, ‘সে আল্লাহর রহমতের মধ্যে আছে, তাই নয় কি?’ আমরা প্রবাসী মুসলমানরা অমুসলিম প্রতিবেশীদের সাথে বাস করি এবং অমুসলিমদের সাথে স্কুল-কলেজ বা সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন স্থানে এক সাথে কাজ করি। আমরা অমুসলিমদের বিভিন্ন উৎসবের সময় তাদের অভিনন্দন জানাবো, এটা ভদ্রতা ও সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্কের দাবি। আমরা জানি, ইমাম ইবনে তাইমিয়া এটা করতে নিষেধ করেছেন। সে জন্যে অনেকে এটাকে হারাম মনে করেন। আমাদের মতে, ইমাম ইবনে তাইমিয়া বর্তমান সময় ও আমাদের পরিবেশে বাস করলে তাঁর সে মতামত পরিবর্তন করে নিতেন। কারণ অমুসলিমদের সুন্দরভাবে সম্ভাষণ জানানো এবং তাদের সাথে উপহার আদান-প্রদান করার মধ্যে কোন রকম স্থায়ী বিধি-নিষেধ রয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। মহানবী (স) মিশরের কপটিক খৃষ্টানদের উপহার গ্রহণ করেছেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করা ইসলামের বিধান। একই সাথে যে কোন দেশের রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক উৎসবে অংশ নেয়া বা সে উপলক্ষে তাদের অভিনন্দন জানানো মুসলমানদের জন্যে নিষিদ্ধ নয়। নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, মে দিবস, মা দিবস ইত্যাদি এ পর্যায়ে পড়ে।
এ ব্যাপারে একটা গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আমাদের অনেকের চোখের আড়ালে থেকে গেছে। বুখারী শরিফে আছে, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের সামনে দিয়ে একটি লাশ-বহনকারী দল যাচ্ছিল। তা দেখে মহানবী (স) দাঁড়িয়ে যান এবং আমরাও তাঁর সাথে দাঁড়াই। আমরা বলি, হে আল্লাহর রাসুল (স), এটা তো এক ইহুদীর লাশ-বহনকারী দল। জবাবে তিনি বলেন, সে কি মানুষ নয়?’ একজন ইহুদীর লাশকেও মহানবী (স) সম্মান দিয়েছেন। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, জীবিত অমুসলিমদের সাথে আমাদের কি রকম ব্যবহার করতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের এর আলোকে কর্তব্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
রমজানের ঈদের সাথে সাদাকাতুল ফিত্র বা ফিতরার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। ঈদের নামাজ পড়ার আগে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমান তার পরিবারের সকল সদস্যের পক্ষে একটা নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ গরীবদের প্রদান করেন, এর নাম ফিতরা। ফিতরার হক্বদার নিম্নবিত্তের মানুষ। ঈদের আনন্দে নিম্নবিত্তদের শরিক করার জন্যে ফিতরা আদায় করা হয়। এ ভাবে ধর্মীয় ইবাদতের সাথে ইহলৌকিক কাজের চমৎকার সমন্বয় সাধিত হয়েছে। একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক জীবনে এর ভূমিকা অপরিসীম। আমরা বিলাত প্রবাসী বাঙালি মুসলমানরা ফিতরা আদায় করি ঠিকই, কিন্তু এর পরিমান এবং ব্যবস্থাপনা অনেক সময় সঠিক মান অনুযায়ী হয় না। আমরা অনেকে গরীবের হক্ব ঠিক মতো আদায় করছি না এবং কোন কোন ক্ষেত্রে আলেম সমাজের নিকট থেকে গরীবদের হক্ব থেকে তাদের বঞ্চিত করার ছাড়পত্র আদায় করে নিচ্ছি।
ইসলামের নবী (স) ফিতরার আর্থিক পরিমাণ নির্ধারিত করে দেননি। এক সা পরিমান খেজুর, বার্লি, পনির, কিসমিস, আংগুর ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রীর মাধ্যমে তা আদায়ের বিধান রয়েছে। আমাদের সাড়ে তিন কেজি থেকে চার কেজি ওজনের সমপরিমাণকে এক সা বলা হয়। উলামায়ে কেরাম এর আলোকে প্রতি বছর প্রবাসী মুসলমানদের জন্যে ফিতরার একটি পরিমান ঠিক করে দেন। আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছি, খাদ্যসামগ্রীর মূল্য প্রতি বছর বৃদ্ধি পেলেও বিলাতে ফিতরার পরিমান সে অনুপাতে বাড়ছে না। ঈদের দিন খাবারের পেছনে আমরা জনপ্রতি যে খাদ্যসমাগ্রী ভক্ষন এবং অপচয় করি এর পরিমান কি তা আমাদের বিচার করা দরকার।
মহানবী (স) এর যুগে খেজুর, কিসমিস, জব, পনির ইত্যাদি দিয়ে সাদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা) বলেন, ‘আমাদের সময় ঈদের দিন এক সা খাদ্য দ্বারা সাদকা আদায় করতাম। আর তখন আমাদের খাদ্য ছিল জব, কিসমিস, পনির ও খেজুর।’ রাসুল (সা)-এর যুগে গম সহজলভ্য ছিল না। হজরত মুয়াবিয়ার (রা) যুগে গমের ফলন বেড়ে যাওয়ায় গমকে ফিতরার পণ্যের সঙ্গে সংযোজন করা হয়। তখন গমের দাম ছিল বাকি চারটি পণ্যের তুলনায় বেশি। এর মূল্য বেশি হলেও গম সহজলভ্য হবার পর হজরত মুয়াবিয়া গমকে ফিতরার তালিকভুক্ত করেন। অপর দিকে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলেন, মহানবী (সা) এক সা খেজুর বা এক সা জব দিয়ে ফিতরা আদায় করার আদেশ দিয়েছেন। পরবর্তী সময় লোকজন দুই মুদ বা আর্ধেক সা গমকে এগুলোর সমতুল্য মনে করে এবং আদায় করে। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, হাদিসে এক সা পরিমাণ আদায় করার কথা উল্লেখ থাকার পরও এর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সাহাবারা আধা সা পরিমাণ গম আদায়ের সিদ্ধান্ত নেন। উল্লেখ্য যে সে সময় আধা সা গমের মূল্য অন্য চারটি পণ্যের এক সা-এর চেয়েও বেশি ছিল।
বর্তমান সময়ে আলোচ্য পাঁচটি পণ্যের মধ্যে গমই হচ্ছে সবচেয়ে কম দামি পণ্য। সাহাবারা সবাই সর্বনিম্ন দামের জিনিস দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন বলে আমরা কোথাও পাই না। তাঁদের সবার আগ্রহ ছিল সর্বাধিক দামি পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা। কিন্তু বর্তমানে আমরা সবাই সর্বনিম্ন দামের পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করছি। সম্পদশালী আর মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে সবাই নিম্নমূল্যের গম দিয়ে সাদকাতুল ফিতর আদায় করা কতটুকু সঠিক হচ্ছে তা আমাদের বিচার করা দরকার। হাদিসের আলোচনা থেকে আমরা বুঝি, সামর্থ্য অনুযায়ী ফিতরা আদায় করতে হবে। আবার দ্রব্যমূল্য, জনগণের আর্থিক অবস্থা এবং পণ্যদ্রব্যের সরবরাহকেও সাহাবারা বিবেচনায় নিয়েছেন। আমরা মনে করি, যাদের সামর্থ্য আছে তাদের কিসমিস, খেজুর, পনির ইত্যাদির মূল্য অনুপাতে ফেতরা আদায় করা উচিত। গরীব-ধনী সবাই গম বা সর্বনিম্ন মূল্যের পণ্য দ্বারা সাদকাতুল ফিতর আদায় করা আমাদের বিবেচনায় সঠিক নয়।
প্রবাসী মুসলমানরা গরীব নয়, বাংলাদেশের বিচারে তারা সবাই বিত্তশালী। আমরা জানি, ইফতারের পেছনে আমরা জনপ্রতি কত ব্যয় করি। সত্যিকার অর্থে আমাদের ব্যয়-ক্ষমতার আলোকেই ঠিক করতে হবে আমাদের ফিতরার পরিমান। বিলাত-আমেরিকার বাঙালি মুসলমানদের প্রধান খাদ্য আটা নয়। আমরা আংগুর, খেজুর, পনির, কিসমিস ইত্যাদিও খাই। গোটা রমজান মাস আমাদের প্রতিটি পরিবারে খাওয়া-দাওয়ার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন থাকে। ঈদের দিন সে আয়োজন কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ন্যায়বিচারের দাবি হচ্ছে, জনপ্রতি ব্যয়ের আলোকে আমরা ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করবো। আমরা নিজের জন্য কোরমা-পোলাও-এর আয়োজন করি এবং গরীবের হক বন্টনের সময় গম বা আটা দিয়ে হিসাব করি। এটা ইনসাফের দাবি হতে পারে না।
আমরা জানি, ফিতরা গরীবের হক এবং ফিতরা দিয়ে গরীবরা ঈদ উদযাপন করবে। আমরা দেখেছি, অনেক আলেম-উলামা মসজিদ মাদ্রাসার জন্যে যাকাত-ফিতরা সংগ্রহ করেন। আমরা জানি না, মাদ্রাসার ফান্ডে ফিতরার টাকা প্রদান করলে সে টাকা ঈদের আগে গরীবের হাতে পৌঁছার কতটুকু নিশ্চয়তা রয়েছে। প্রবাসে বসবাসকারী বিত্তশালী মুসলমানরা মসজিদ-মাদ্রাসায় দান-খয়রাত করার ব্যাপারে মোটেই পিছিয়ে নেই। তাদের টাকায় পৃথিবী-ব্যাপী মসজিদ-মাদ্রাসা চলছে। কিন্তু ফিতরার টাকা মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য নয়, সাধারণ গরীবদের জন্য। ফিতরার টাকা মসজিদ-মাদ্রাসায় না দিয়ে ঈদের আগেই সে টাকা গরীবদের হাতে পৌঁছে দেয়ার নিশ্চয়তা বিধান করা দরকার।
ঈদ প্রসঙ্গে বিলাত প্রবাসী মুসলমানদের জন্যে একটি বিব্রতকর বিষয় হচ্ছে, অধিকাংশ সময় আমরা সকল মুসলমান এক সঙ্গে ঈদ করতে পারি না । সবাই এক কা’বার দিকে মুখ করে নামাজ পড়লেও ঈদ উদযাপনের ব্যাপারে আমাদের কিবলা বিভিন্নমুখি হয়ে পড়ে। আমরা একদল সৌদি আরবের সাথে ঈদ করি, আরেক দল করি পাকিস্তানের সাথে, আবার কেউ করি স্থানীয় মতামতের ভিত্তিতে। কোন কোন সময় একই এলাকার দু মসজিদকে ভিন্ন ভিন্ন দিনে ঈদ করতে দেখা যায়। একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পরও আমরা কেউ আগের দিন ঈদের ছুটি গ্রহণ করি এবং কেউ পরের দিন গ্রহণ করি। আত্মীয়-স্বজনরাও অনেক ক্ষেত্রে একদিনে ঈদ উদযাপন করতে পারি না। অমুসলমানরা আমাদের নিয়ে এ জন্যে অনেক হাসাহাসি করে। এ কারণে সাধারণ মুসলমানদের অনেক অসুবিধা এবং বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ঈদের তারিখ নির্ধারণ করে মসজিদগুলো এবং ইমামগণ। সাধারণ মুসলমানদের সেখানে কোন কার্যকর ভূমিকা নেই।
আমাদের জানা মতে, বিলাতের সবাই যাতে একই দিনে ঈদ করতে পারেন সে উদ্দেশ্যে কয়েকটি মসজিদের পক্ষ থেকে অনেক দিন ধরে চেষ্টা চলছে। কিন্তু জ্ঞাত-অজ্ঞাত নানা কারণে তাদের সে প্রচেষ্টা ফলপ্রসু হয় না।মনে হচ্ছে কিছু লোক মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভক্তির প্রমাণ টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর।
ঈদের ব্যাপারে একটি বহুল প্রচলিত হাদিস রয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখবে এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙবে, অর্থাৎ ঈদ করবে। কিছু লোকের বক্তব্য হচ্ছে, এখানে চর্মচোখে চাঁদ দেখার জন্যে বলা হয়েছে। যদি আবহাওয়ার কারণে কোন এলাকায় চাঁদ দেখা সম্ভব না হয় তা হলে পাশের কোন দেশ থেকে চাঁদ দেখার বিশ্বস্ত খবর পাওয়া গেলে সেটাও বিবেচনায় নেয়া যাবে। আবহাওয়া বিভাগ বা বৃটিশ অবজারভ্যাটরি থেকে পাওয়া রিপোর্টের উপর নির্ভর করা যাবে না।
সত্যিকার বিবেচনায় আলোচ্য হাদিসকে আক্ষরিক অর্থে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। এ হাদিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, রমজান বা শাওয়াল মাস শুরুর তারিখ নির্ধারণ করা। অন্য কোন উপায়ে চন্দ্রমাস শুরুর নিশ্চিত খবর পেলে সেটাকে কোন্ যুক্তিতে আমরা প্রত্যাখ্যান করবো? মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঈদের বাইরে ধর্মীয় অনেক ব্যাপারে আমরা চোখ বন্ধ করে বৃটিশ অবজারভ্যাটরির রিপোর্ট গ্রহণ করছি। ইফতার, সেহরি, পাঁচ বেলা নামাজের ওয়াক্ত নির্ধারণ করতে গিয়ে আমরা সব সময় বৃটিশ অবজারভ্যাটরির রিপোর্ট মেনে চলি। কিন্তু ঈদের বেলা সেটা মানতে রাজি নই।
অবজারভ্যাটরির রিপোর্ট গ্রহণ করে নিলে প্রতি বছর আমরা একই দিনে রোজা রাখতে পারি এবং সবাই এক সাথে ঈদ করতে পারি। রমজানের শুরুতে নয়, কোন্ দিন ঈদ হবে তা এক বছর আগেই আমরা জানতে পারবো। এর আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বছরের শুরুতে ঈদের ছুটি কোন দিন হবে তা ঘোষণা করতে পারবে। আমরা নিজেরাও ঈদের ব্যাপারে অগ্রিম পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবো। বিশ্বের সকল মুসলমান না হোক, কমপক্ষে একটি দেশের সকল মুসলমান একই দিন ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারবো। ঈদের ব্যাপারে যাদের মতামত গুরুত্ববহ তারা বিষয়টা বিবেচনায় নিবেন বলে আমরা আশা করছি।
ঈদ উপলক্ষে মুসলমানরা আনন্দ-উৎসব করবে, এটা ঈদের স্বাভাবিক দাবি। শুধু নামাজ, নতুন কাপড়, মজাদার খাবার আর দান-খয়রাত করে সকল মানুষ সকল সময় সন্তুষ্ট বা আনন্দিত থাকতে পারে না। মানুষের চাহিদা আরো ব্যাপক ও বহুমুখি। বিনোদনের আকাঙ্খা মানুষের প্রকৃতির মধ্যে নিহিত। আনন্দ-উৎসবের জন্যে মানুষ দেশে-দেশে এবং কালে-কালে নানা প্রকার উপায়-উপকরণ বা মাধ্যম ব্যবহার করেছে, আবিষ্কার করেছে। আবহাওয়া ও দেশাচারের কারণে বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে চিত্ত-বিনোদনের চাহিদা এবং উপকরণের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সময়ের বিবর্তনে এর মধ্যে বার বার পরিবর্তনও ঘটে। কিন্তু সব কিছুর লক্ষ্য বা উপলক্ষ হচ্ছে বিনোদন। আবার কোন জনগোষ্ঠীর বিনোদনমূলক তৎপরতা নিছক বিনোদনে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর মাধ্যমে একটা সাংস্কৃতিক আবহ ও ঐতিহ্য গড়ে উঠে, যে সংস্কৃতি বিশ্ব-সভায় সে জনগোষ্ঠির পরিচয় তুলে ধরে এবং প্রতিষ্ঠিত করে।
ইসলামের দবি হচ্ছে, এটা সকল যুগের এবং সকল মানুষের জন্যে জীবন-বিধান। তাই মানুষের প্রকৃতিগত বিনোদন চাহিদা পূরণের ব্যাপারে ইসলাম নিরব থাকতে পারে না। বুখারি এবং মুসলিমে বর্ণিত হাদিস থেকে আমরা মহানবী (স)-এর সময় মুসলমানরা ঈদের সময় কি ধরণের বিনোদন করতেন এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হজরত আয়েশা (রা) বলেন, ঈদের দিন মসজিদে নববীতে ইথিওপিয়ার লোকেরা বর্শা ও ঢাল দিয়ে খেলা খেলেছে এবং তিনি মহনবী (স)-এর পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা তিনি উপভোগ করেছেন। হজরত আয়েশা (রা) খেলা দেখে তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মহানবী (স) সেখানে দাঁড়িয়ে থাবেন। হজরত আয়েশা (রা) থেকে আমরা আরো জেনেছি, একবার ঈদের দিন মহানবী (স) হজরত আয়েশার ঘরে এমন সময় প্রবেশ করেন যখন সেখানে দুটি মেয়ে গান গাইছে। একটু পরে আবু বকর (রা) সেখানে আসেন এবং বলেন, ‘এ সব কি হচ্ছে, শয়তানের আওয়াজ !’ এ কথা আবু বকর তিনবার উচ্চারণ করেন। তখন মহানবী (স) বলেন, হে আবু বকর, ‘তাদের এটা করতে দাও। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর খুশির দিন আছে এবং আজ আমাদের খুশির দিন।’ তিনি আরো বলেন, ‘মদীনার মানুষের জানা উচিত, ঈদের দিন আমাদের নির্দোষ আনন্দের সুযোগ রয়েছে।’
এ হাদিসের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, ঈদ উপলক্ষে মহানবী (স)-এর গৃহে এবং তাঁর উপস্থিতিতে মেয়েরা গান গেয়েছে। আমরা এটাও জেনেছি, সেখানে তারা যে গান গেয়েছে তা কোন ইসলামী সঙ্গীত ছিল না, ছিল জাহিলিয়াত বা ইসলামপূর্ব যুগের একটি যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট। হজরত আয়েশা (রা) মেয়েদের গান পরিবেশন করতে অনুমতি দিয়েছেন এবং আবু বকর (রা) আপত্তি করার পরও মহানবী (স) তা অনুমোদন করেছেন। মসজিদে নববীতে এক রাকাত নামাজ পড়লে সাধারণ মসজিদে পঞ্চাশ হাজার রাকাত নামাজের সওয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে মহানবী (স)’র উপস্থিতিতে ঈদ উপলক্ষে বর্শা ও ঢাল খেলা হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা) যাতে সে খেলা উপভোগ করতে পারেন সে জন্যে মহানবী (স) দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে সুযোগ করে দিয়েছেন। আলোচ্য দুটি হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি, রাসুল (স)’র যুগে ঈদ উপলক্ষে বিনোদনমূলক কর্মকান্ডের প্রচলন ছিল। ঈদ উপলক্ষে নন-রিলিজিয়াস বা সেকুলার নির্মল আনন্দ-উৎসব করা দোষের কিছু নয়, বরং ঈদের সাথে তা সঙ্গতিপূর্ণ। এ সকল হাদিসের আলোকেই হয়তো বাংলাদেশে ঈদ উপলক্ষে খেলাধূলা, নৌকা বাইচ, ঈদ-মেলা ইত্যাদির প্রচলন হয়েছে।
এ ব্যাপারে বিলাতের বাঙালি মুসলমানরা অনেক পিছিয়ে। বিলাতের বাঙালি মুসলমানদের ঈদ স্বাধারণতঃ নতুন জামা-কাপড় পরিধান করা, মজাদার খাবার খাওয়া বা খাওয়ানো এবং আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবকে দেখতে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। শিশু-কিশোর বা তরুণদের জন্যে বিনোদনমূলক কোন আয়োজনের কথা আমরা চিন্তা করি না। এর ফলে ঈদের আনন্দের সাথে আমরা তরুণদের জড়িত করতে পারছি না। তাদের অনেকের কাছে, ঈদ মানে হচ্ছে আরেকটা ‘বউরিং’ দিন। লোক-লজ্জা বা সামাজিকতার খাতিরে তরুণরা আমাদের সঙ্গ দেয় ঠিক-ই। বাস্তবে তারা মোবাইল, আইপড বা কমপিউটার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অনেক তরুণ-তরুণী মা-বাবাকে ফাঁকি দিয়ে লিমুজিন বা স্পোর্টস কার ভাড়া করে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়ে। কোন দুর্ঘটনা না ঘটলে এর কোন খবরই আমাদের জানা থাকে না।
ঈদ উপলক্ষেএখানে তরুণদের রুচি ও মেজাজ সামনে রেখে কোন কর্মসূচি না থাকার সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। আমরা হয়তো মনে করি, বিনোদন হচ্ছে ইহলৌকিক বা দুনিয়াবী কাজ। ঈদের মেজাজের সাথে তা খাপ খায় না। আমাদের প্রশ্ন, নতুন জামা-কাপড় আর মজাদার খাবার কি দুনিয়াদারী নয়? শিশু-কিশোর এবং তরুণদের উপযোগী খেলা-ধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঈদ-মেলা, নাটক ইত্যাদি কর্মসূচি কি ইসলামের নিষিদ্ধ এলাকা? ঈদ কী, এটা কী ভাবে উদযাপন করতে হবে, ঈদের সুন্নাত-ওয়াজিব কী ইত্যাদি প্রশ্নের জবাব আমরা অনেক ইসলামী পন্ডিতের কাছে থেকে জানতে চাই। কিন্তু তারা আমাদের বলেন না, ঈদ উপলক্ষে আনন্দ-উৎসব বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হারাম নয়, বরং বৈধ এবং ক্ষেত্র বিশেষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এ দেশে বেড়ে উঠা তরুণ-তরুণীর মানসিকতা বিবেচনা করলে এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
আরেকটা কারণ হচ্ছে, ভবিষ্যৎ বংশধরদের নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সময় আমাদের নেই। বৈধ-অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের চিন্তা আমাদের সবসময় মোহগ্রস্থ করে রাখে। আবার অনেকে দেশীয় রাজনীতি এবং কমিউনিটি নেতৃত্ব নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটান। আরেক দল আছেন যারা বাংলাদেশের খেদমত নিয়ে ব্যস্ত। এ দেশ তাদের অগ্রাধিকার নয়, এ দেশের উন্নতি-অবনতি তাদের আহত বা আবেগ তাড়িত করে না। বরং বাংলাদেশে এতিমখানা, মাদ্রাসা, স্কুল বা হাসপাতাল স্থাপনই তাদের দিনরাত্রির আরাধনা। আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী কোন চিন্তা তাদের মাথায় নেই। কিন্তু এ সকল মানুষই বিলাতে আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন। এ দেশ তাদের অগ্রাধিকার না থাকার কারণেই হয়তো তারা এ দেশের তরুণদের জন্যে উপযোগী সাংস্কৃতিক এবং সুস্থ বিনোদনমূলক কর্মসূচি দিতে পারছেন না।
মহানবী (স)-এর সাথে শিশু ও তরুণদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর এবং আন্তরিক। শিশুদের সাথে দেখা হলে তিনি তাদের সালাম দিতেন, কুশল জিজ্ঞেস করতেন। প্রথম দিকে ইসলামের দাওয়াত যারা কবুল করেন তারা অধিকাংশ ছিলেন তরুণ ও যুবক। সবচেয়ে বয়স্ক ছিলেন আবু বকর (রা) এবং তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৫ বছর। মহানবী (স) যুবকদের অত্যন্ত মর্যাদা দিতেন। রোমানদের সাথে লড়াইয়ের জন্যে গঠিত সেনাবাহিনীর সেনাপতি হিসেবে মহানবী (স) যখন উসামা বিন জায়েদ (র)কে মনোনয়ন দেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। অথচ সে বাহিনীতে আবু বকর (রা) এবং ওমর (রা)’র মতো প্রবীণ সাহাবারা ছিলেন। সে হিসেবে আমরা যারা বিলাতে মসজিদ বা মাদ্রাসা পরিচালনা করি তাদের বয়স কতো এবং তরুণ বা যুবকদের সাথে তাদের কি ধরণের হৃদ্যতা বা সংযোগ রয়েছে তা বিবেচনায় নেয়া দরকার। তরুণদের মনের খবর আমরা কতটুকু রাখি, তাদের আমরা কতটুকু অনুপ্রাণিত করতে পারি এবং আমাদের ক’জনের নিকট থেকে তারা তাদের বহুমুখি প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব পায় ?
তরুণদের উপযোগী বিনোদন কর্মসূচি না থাকার কারণ যা-ই হোক না কেন ফলাফল কিন্তু একটিই আমরা পাচ্ছি। অনেক তরুণ ঈদের জামাতে আমাদের সাথে থাকলেও পরে তারা উধাও হয়ে যায়। যারা আমাদের সাথে থাকে তাদের মধ্যে উৎসবের কোন মেজাজ বা প্রাণ-চাঞ্চল্য দেখা যায় না। ঈদ-উৎসব একটা বিরক্তিকর অনুষ্ঠান হিসেবে তরুণ মনে চিহ্নিত হবার পরিণতি যে শুভ নয় তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের ছেলেমেয়েরা এ দেশে আমাদের ভবিষৎ। তরুণদের চিন্তা-ভাবনা, বেড়ে উঠা, মেধা এবং বিবেচনা আগামী দিনে এ দেশে এবং বিশ্ব-মানচিত্রে আমাদের অবস্থান নির্ধারণ করবে। মুসলিম কমিউনিটির অসচেতনতা এবং অদক্ষতার কারণে এ দেশের বাঙালি তরুণ-তরুণী ইসলামী বিধি-বিধানকে একটি সেকেলে এবং রসহীন নিয়মনীতির সমষ্টি হিসেবে মনে করতে পারে। মুসলিম সভ্যতার গৌরবোজ্জল ও বুদ্ধিদীপ্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে তরুণদের সংযুক্ত করতে যদি আমরা ব্যর্থ হই তা হলে আগামী দিনের ইতিহাস কখনো আমাদের ক্ষমা করবে না।
আসন্ন ঈদ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের সকল পাঠককে অগ্রিম ঈদ মোবারক।