সিসি ডেস্ক: বাইরে লালবাতি আর হুইসেল। ভেতরে শোয়ানোর মতো শুধু একটি সিট। এছাড়া দুজন বসার মতো আরেকটি সিট। এরপর ‘অ্যাম্বুলেন্স’ লিখে দিয়ে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে চলছে জমজমাট অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা। গত কয়েক বছরে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালকে ঘিরে বেশ কিছু অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী চক্র গড়ে উঠেছে । সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের স্বল্পতার সুযোগে এসব ব্যবসায়ী চক্র রোগীদের জিম্মি করে তাদের নির্ধারিত মূল্যেই গন্তব্যে যেতে বাধ্য করে। ভাঙাচোরা ও লক্কর-ঝক্কর যেমনই হোক, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে বা গন্তব্যে রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বজনদের আর কোনও উপায়ও থাকে না। লাশ নিতে আরও হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। হাসপাতালের কর্মচারী ও দালালদের হাতে রেখে অনেকটা রেন্ট-এ-কারের মতোই চালানো হচ্ছে এই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা।
হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসাপতাল, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, বক্ষব্যাধী ইনস্টিটিউট, শিশু হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতালসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালকে ঘিরে এসব অ্যাম্বুলেন্স চক্র গড়ে উঠেছে। এসব হাসপাতালের কর্মচারী ও দালালদের দৌরাত্ম অনেক বেশি। সাধারণ রোগীরা তাদের কাছে জিম্মি। তাদের বাইরে যাওয়ার কোনও উপায় থাকে না রোগী ও স্বজনদের।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাজধানীর এক হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স অন্য হাসপাতালে রোগী স্থানান্তরের পর খালি চলে যেতে বাধ্য। এটাই বিভিন্ন হাসপাতাল কেন্দ্রীক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবায়ীদের অলিখিত চুক্তি। যেমন- ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স রোগী বের করতে পারবে না। আবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স অন্য হাসপাতাল থেকে রোগী বের করে আনতে পারবে না। কোনও কারণে নিতে হলেও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটকে নির্দিষ্ট অংকের কমিশন দিয়ে তারপর নিতে হবে। এসব চক্রের বাইরে অন্যকোনও জেলার অ্যাম্বুলেন্সও রাজধানীর হাসপাতালগুলো থেকে রোগী নিতে পারবে না।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কেন্দ্রীক অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটটি খুবই শক্তিশালী। কথা হয় হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে তারা জানান, বিশাল এই হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র চারটি। সেগুলোর মধ্যে একটি অকেজো। এসব অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে ডাক্তার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আনা নেওয়া হয়। মাঝে-মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী স্থানান্তর করা হলেও নানা অজুহাতে নির্ধারিত তিনশ’ টাকার চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে থাকেন চালকরা। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের টাকাই চালকদের পকেটে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ঢামেক হাসপাতালের গাড়ি শাখার প্রধান মো. নাসির উদ্দিন নান্নু দাবি করেন, বর্তমানে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স থেকে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।
বাইরে থাকা অ্যাম্বুলেন্সগুলোর কিছু ভালো থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রেন্ট-এ-কারের মাইক্রোতে লালবাতি, হুইসেল ও ভেতরে একটি সিট দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স বানানো হয়েছে। অনেকগুলোতে এসিও নেই। থাকলেও ঠাণ্ডা হয় না। এতে প্রায়ই আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন রোগীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা অনেকটা ওয়ার্ড বয় ও কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণে। কারণ কোন ওয়ার্ড থেকে কোন রোগী বের হবেন সেই তথ্য ওয়ার্ড বয়দের কাছে থাকে। প্রত্যেক ভাড়ার জন্য ওয়ার্ড বয়দের বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচশ’ টাকা দিতে হয়। ঢাকার বাইরে দূরুত্ব অনুযায়ী একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে গেলেও পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয় রোগী ও স্বজনদের।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সমিতিভুক্ত এই চক্রে ৫৪টি অ্যাম্বুলেন্স ও ২৭টি প্রাইভেটকার রয়েছে। এগুলো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উত্তরপ্রান্তে রাস্তার দুই ধারে রাখা হয়। যার কারণে ওই রাস্তার প্রায় দুই ভাগই এখন তাদের দখলে। এছাড়া হাসপাতালের চারপাশে আরও অর্ধশত মাইক্রো ও প্রাইভেট কার থাকে নিয়মিত। স্থানীয় ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে আপোষ করেই এসব মাইক্রো ও প্রাইভেটকার হাসপাতালের চারপাশে রাখা হচ্ছে বলে জানান অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির এক সদস্য।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অ্যাম্বুলেন্সের একজন চালক জানান, তিনি যে গাড়িটি চালান, সেটিও হাসপাতালের একজন কর্মচারীর। ওয়ার্ড বয় ওসমানের একটি, মেডিক্যাল কলেজের কর্মচারী বাশারের দুটি, ওয়ার্ডবয় সাত্তারের তিনটি ও কিতাব আলীর মেয়ে মিনার একটি, নান্নু মিয়ার দুটি, সরদার জামালের তিনটি অ্যাম্বুলেন্সের তথ্য পাওয়া গেলেও হাসপাতালের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নামে-বেনামে অ্যাম্বুলেন্স আছে সেখানে। ফলে হাসপাতাল প্রশাসনও তাদের কাছে অসহায়। ওই চালক আরও জানান, ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা সমিতির ফান্ডে জমা দিয়েই এখানে গাড়ি নথিভুক্ত করতে হয়। এরপর নিয়মিত মাসিক চাঁদা দিতে হয়। অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের কাছ থেকে সমিতির পক্ষ থেকে মাসিক ভাতার বিনিময়ে নিয়মিত চাঁদা উঠিয়ে থাকেন লাইনম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কোনও কথা বলতে রাজী হননি।
ঢামেক হাসপাতাল অ্যাম্বুলেন্স পরিবহন সমিতির সভাপতি ভাণ্ডারী হারুনের মতে, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায় দোষের কিছু নেই। আমরা ব্যবসা করে খাই। ব্যবসা করতে হলে কিছু টাকা-পয়সা খরচ করতেই হয়। তাছাড়া বিভিন্ন দিক ম্যানেজ করতে মাসে মাসে টাকা খরচ করতে হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. খাজা আবদুল গফুর বলেন, বাইরের অবৈধ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার বিষয়ে লিখিতভাবে একাধিকবার সিটি করপোরেশন ও পুলিশকে জানানো হয়েছে। কারণ রাস্তাটি সিটি করপোরেশনের। যানজট নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। মাঝে-মধ্যে অভিযান চালালেও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। রোগীর সেবা বাড়ানোর জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভাবছে বলে জানান তিনি।
একই চিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল, সোহারওয়ার্দী, হৃদরোগ ও পঙ্গুসহ বিভিন্ন হাসপাতালেও। এখানকার সরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলোতেও চলাফেরা করেন ডাক্তার ও কর্মকর্তারা। ঢামেক হাসপাতালের মতো এসব হাসপাতালেও রয়েছে অ্যাম্বুলেন্সের সিন্ডিকেট ব্যবসা। এসব সিন্ডিকেটের বাইরে কোনও অ্যাম্বুল্যান্সের রোগী পরিবহনের সুযোগ নেই। এদের বাইরে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করলে জরিমানা হিসেবে দিতে হয় বাড়তি টাকা। ওয়ার্ডবয় ও কর্মচারীদের সঙ্গে হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরাও এই অ্যাম্বুলেন্স চক্রের সঙ্গে জড়িত। এসব সিন্ডিকেটে কয়েকশ’ অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। যেগুলোর বেশিরভাগেরই অনুমোদন নেই।