ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ লেনদেন হচ্ছে। এমন ভয়াবহ তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দিনাজপুর, নওগাঁ, নাটোর, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার ও টেকনাফসহ ছয়টি জেলায় এর আলামত মিলেছে। এসব জেলায় বিকাশের বিভিন্ন একাউন্ট থেকে কোটি কোটি টাকা ঢুকেছে। জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বিকাশ একাউন্ট মানব পাচার ও মাদক ব্যবসার বিস্তার লাভে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া টাকা লেনদেনের নামে অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। তাই সম্পদ বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এক বছরে প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পদ বেড়েছে বিকাশের। আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত কেওয়াইসি (গ্রাহককে জানুন) ফর্ম পূরণ ও সংরক্ষণ করা হয় না। ওদিকে মানা হচ্ছে না লেনদেনের সীমাও। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সূত্র বলছে, বিকাশকে ঘিরে এভাবে প্রতারণার জাল ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। গড়ে উঠছে বড় ধরনের সিন্ডিকেট। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। প্রতারণাকারীদের খপ্পরে পড়ছেন সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। একশ্রেণীর প্রতারক চক্রের সদস্যরা নিজেকে বিভিন্ন মোবাইল ফোন কোম্পানির কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে গ্রাহকদের নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলেন। বলা হয়, তিনি সেরা গ্রাহক হিসেবে তাদের লটারিতে বিজয়ী হয়েছেন। পেয়েছেন গাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা আরও লোভনীয় কিছু। এরপর পুরস্কার পাওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি হিসেবে বিভিন্ন হারে টাকা দাবি করে তা বিকাশ একাউন্টের মাধ্যমে পাঠাতে বলা হয়। এক্ষেত্রে কোথাও টাকা পাঠানোর অনুরোধ, আবার কোথাও বাধ্য করা হয়। টাকার পরিমাণ ৩০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ লাখ টাকা পর্যন্ত।
জানা গেছে, বিকাশের নিয়ম অনুসারে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠাতে প্রতি হাজারে সার্ভিস চার্জ বাবদ দেয়ার কথা ১৮ টাকা। কিন্তু নেয়া হচ্ছে কমপক্ষে ২০ টাকা। এছাড়া গ্রাহকের নিজস্ব একাউন্ট না থাকলেও অন্য একাউন্টের মাধ্যমে বিকাশের এজেন্টরা টাকা স্থানান্তরে সহায়তা করছে, যা নিয়মের লংঘন।
অপরদিকে নিয়ম অনুযায়ী মোবাইল ফোনের একটি সিম দিয়ে একজন গ্রাহক কোনো মোবাইল ব্যাংকে একটি মাত্র একাউন্ট খুলতে পারবেন। কিন্তু বিকাশের ক্ষেত্রে এই বিধি মানা হচ্ছে না। একই সিমের বিপরীতে একাধিক একাউন্ট খোলা হচ্ছে। এছাড়া নিয়ম হল এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা এবং মাসে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পাঠাতে পারবে। তবে এজেন্ট প্রতিদিন ৫ বারে ২৫ হাজার টাকা এবং মাসে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে পারবে। টাকা তোলার ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৩ বারে ২৫ হাজার টাকা এবং মাসে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা তোলা যাবে। কিন্তু এই নিয়মও মানা হচ্ছে না। গ্রাহকরা প্রতিদিন লাখ টাকার বেশি পর্যন্ত স্থানান্তর করছেন।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত প্রাথমিক প্রতিবেদনে বিকাশের বেশ কিছু জাল জালিয়াতির ঘটনাও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- মোবাইল ফোনের সিম চুরি করে একজন গ্রাহকের হিসাব থেকে আড়াই লাখ টাকা তুলে নেয়ার ঘটনা। লেনদেনের ক্ষেত্রে কেওয়াইসি সংরক্ষণ না করা। অথচ বিকাশ একাউন্ট খোলার জন্য এটি মেনে চলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই তথ্য সংযুক্ত না করলে টাকা পাঠানোর আড়ালে থাকা অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে না। এছাড়া মানা হচ্ছে না লেনদেনের সীমাও। অনেকে ইচ্ছেমতো টাকা লেনদেন করছেন, যার বেশিরভাগ সন্দেহজনক। এসব টাকা লেনদেনের পেছনে কেউ চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, কেউ আবার মাদক কিংবা হুন্ডির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
সম্পদ বাড়ছে যেভাবে : ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুসারে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বিকাশের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৫৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। কিন্তু আগের বছর ছিল ৫৪৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এ হিসাবে এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট রাজস্ব এসেছে ৫৭৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সার্ভিস খরচ ৪৭৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা বাদে গ্রস মুনাফা ৯৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। কর, প্রভিশন এবং অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে ২০১৪ সালে মোট মুনাফা ১৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। কিন্তু আগের বছর ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির ২০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা লোকসান ছিল। এ হিসাবে এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২০০ শতাংশ মুনাফা বেড়েছে। আর বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির এজেন্টের সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার। যাদের মাধ্যমে শুধু গত ডিসেম্বরেই বিকাশের দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ২৭০ কোটি টাকা।
মাদক বিস্তারে ভূমিকা : বিভিন্ন সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলার টেকনাফে ইয়াবার মূল অর্থ লেনদেন হয় বিকাশের মাধ্যমে। কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই সারাদিন বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন হচ্ছে। টেকনাফে প্রতিনিয়ত গজিয়ে উঠছে নিত্যনতুন বিকাশের এজেন্ট। এসব এজেন্টের বেশিরভাগ মালিক ব্যাংকিং নীতিমালা বহির্ভূত অবৈধ ও রোহিঙ্গা নাগরিক। এ চক্র যেখানে সেখানে বিকাশ এজেন্টের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে টাকা লেনদেন করছে। স্থানীয়রা বলছেন, এর কোনো নিয়মনীতি ও জবাবদিহিতা নেই। যার যা ইচ্ছা যেখানে পায় সেখানে বসে লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বরং মাদকের বিস্তারে বিকাশ পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট বিকাশ এজেন্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে।
একমুখী লেনদেন বেশি : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ব্যবসায়িক কাজে টাকা দুই দিকেই লেনদেন হয়। কিন্তু বিকাশের টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে কয়েকটি জেলায় দেখা গেছে শুধু একমুখী টাকা ঢুকেছে। জেলাগুলো হল দিনাজপুর, নওগাঁ, নাটোর, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার ও টেকনাফ। এর মধ্যে কক্সবাজার অঞ্চলে বেশি পরিমাণে টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু এসব জেলা সমহারে বা তার কাছাকাছি হারে কোনো টাকাই ঢোকেনি। বাস্তব অবস্থা এমন যে, যেখানে টাকা এসেছে ১০ লাখ, সেখানে টাকা গেছে ১ লাখের নিচে। স্বাভাবিক লেনদেনের অংকগুলো খুব ছোট ছোট।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ দিয়ে মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরে মানব পাচারের যে রুট আবিষ্কৃত হয়েছে তার গডফাদাররাই এসব টাকার সুবিধাভোগী ছিলেন। ওইসব জেলার যেসব নাগরিক অভিবাসী হয়ে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর যেতে আগ্রহী হয়েছেন তারাই প্রয়োজনীয় টাকা কক্সবাজারের বিভিন্ন ব্যাংকে পাঠিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যেভাবে টাকা স্থানান্তর হচ্ছে, এতে দেশের আইন-শৃংখলাজনিত সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এসব কারণে প্রতিবেদনে মোবাইল ব্যাংকিং নিরাপদ করতে আরও আধুনিক ও নিরাপত্তামূলক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইনি কাঠামোকে অধিকতর শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, এসব ব্যাংকিং পরিচালিত হতে হবে মূল ব্যাংকের মাধ্যমে। আর এর ভালোমন্দের সব দায় ব্যাংককেই নিতে হবে।
এছাড়া জঙ্গি এবং সন্ত্রাসী অর্থায়নের কথা বিবেচনা করে মোবাইলে লেনদেনেও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন প্রযোজ্য করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজেন্ট টু এজেন্ট তহবিল স্থান্তান্তরও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নীতিমালা ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে সঙ্গে সঙ্গে এজেন্টশিপ বাতিলের কথা বলা হয়েছে। কেউ একাউন্ট খুলতে চাইলে কেওয়াইসি ফর্ম বাধ্যতামূলক। কোনো ধরনের সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে বলা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিকাশের কেওয়াইসি পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে কারা লেনদেন করছে তা জানা যাচ্ছে না, যা প্রচলিত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের লংঘন। মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব খোলার ক্ষেত্রে সিমের সঠিকতা, গ্রাহকের পরিচয় সম্পর্কেও নিশ্চিত হয়ে নেয়া হয় না। যে কারণে টাকা স্থানান্তরের ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টের হিসাব রাখা হয় এজেন্টের কাছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যাংকের কাছে তা থাকে না। এছাড়া প্রযুক্তিগত সুবিধা দিচ্ছে মোবাইল কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির জটিলতায় গ্রাহকের একাউন্ট থেকে টাকা খোয়া যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এ ব্যাপারে ব্যাংক বা এজেন্ট কেউই দায়িত্ব নিচ্ছে না। ফলে এক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য : এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, অনিয়ম যেহেতু ধরা পড়েছে, সেহেতু একটি বিষয় প্রমাণিত যে আমরা ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, যেসব ব্যাংকে অনিয়ম বা নিয়মের ব্যত্যয় পাওয়া গেছে, সেসব ব্যাংককে সতর্ক করা হয়েছে। প্রচলিত নিয়ম মেনে ব্যাংকিং করতে না পারায় এরই মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছে। তবে আমরা বিষয়টি নজরদারির মধ্যে রাখছি। অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
বিকাশের বক্তব্য : জানতে চাইলে বিকাশের মুখপাত্র জাহেদুল ইসলাম বলেন, গ্রাহকের একাউন্ট খুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নীতিমালায় মেনে চলা হয়। এর মধ্যে এজেন্ট কেওয়াইসি ফর্মে ছবির সঙ্গে গ্রাহকের চেহারা মিলিয়ে দেখেন। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা অন্যান্য ফটো আইডিতে দেয়া ছবি ও ঠিকানার সঙ্গে কেওয়াইসি ফর্মের ছবি ও ঠিকানা যাচাই করে দেখা হয়। তবে গ্রাহকের একাউন্টটি সক্রিয় করার সময় মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার পেলে সংশ্লিষ্ট তথ্য আরও কঠোরভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা এখনও রয়েছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে বর্তমানে দেশে ২৮টি ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করেছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন ৪০৮ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ২ কোটি ৫২ লাখ। এর মধ্যে সক্রিয় ১ কোটি ২২ লাখ। মোবাইল ব্যাংকের এজেন্টের সংখ্যা ৫ লাখ ৩৩ হাজার। এদের প্রতিদিন লেনদেনের সংখ্যা ২৯ লাখ ৬৩ হাজার। আর এ পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে ১২ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। আর মোট লেনদেন সংখ্যা ৮ কোটি ৮৯ লাখ ৮৩ হাজার।