• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

অপরিণত প্রেমের গল্প

golpo_thereprt।। হোসেন শহীদ মজনু ।।

এক.

‘কবিতার পর্যটনে তার সঙ্গে কখনও দেখা হবার নয়,
সমকাল বিভ্রান্ত হলে কেউ আধফালি চাঁদ গিলে খায়!’

—রাতে মোবাইলে কথা বলার সুযোগ সীমিত করেছে সরকার।
—তাইলে দিনেই বেশি বেশি কথা বলো।
—আমার আর কাম নাই। খালি কথা কমু।
—তাইলে রাতের অজুহাত দেও ক্যান।
—রাতের কথা তো দিনে কওন যায় না।
—ধুর তুমি খালি খারাপ কথা কও।
—এইডা বুঝি খারাপ কথা হইল।
—তাইলে কী?
—সকাল সকাল পূবাকাশে দেখো কেমন রংধনু উঠছে! বর্ষায় এই মজা! এখন বৃষ্টি তো তখন রোদ!
—আমার এইখান থেকে আকাশ দ্যাখা যায় না। জানালায় বৃষ্টির ছোঁয়া এখনও লেগে আছে!
—ওহ্ তাই তো, আমি ভুলেই গেছিলাম তোমাদেরফ্লাট থেকে তো শুধু অন্য মাইনষের ছাদ দ্যাখা যায়। আকাশের নাগাল মেলা ভার!
—তুমি না খালি খালি প্যাঁচাও।
—এই দাঁড়াও তো, কে জানি এসএমএস দিছে, পুটপুট করতাছে।

[পলাশের এসএমএস দেখে মেজাজ বিগড়ে যায় তাশিকের। ব্যাটা যে কোনো অজুহাতে অফিসে না আসার জন্য এসএমএস পাঠায়। আবার কী ভাব নিয়ে লিখেছে— Vaia vore theke bomi hochce.. shorirta khub klanto, pore ghumiecilam, utheci matro… ki korbo vaia? Akhon ki office asbo? Chittagong road e aci, naki Friday te office kori vaia, akta sms diben vaia, amar mobile taka nai]

অধৈয ফারিয়া চিৎকার করে উঠে— এই কী হল, আর কতক্ষণ হোল্ড করব। তোমার এসএমএস পড়া হলো, নাকি আমি রাখব?একটু পরেই তো আবার বলবে— নিউজ এডিটর ডাকতেছে, পরে কথা বলি। সময় না থাকলে ফোন দিবা না, আর ফোন যদি দাও কথা বলবা, কি শুনতেছো?????????????

—হাঁ বলো, পলাশের এসএমএসে হঠাৎ করে মাথাটা গরম হয়ে গেছে।
—তাইলে পলাশ নিয়েই থাক, মাথা ঠাণ্ডা করো, রঙধনু দেখো, বাই।

এরপর আর কথা নেই, কটাস করে লাইন কেটে দেয় ফারিয়া। শব্দটা যেন তাশিকের বুকের বামপাশ ঘেষে বুলেটের মতো ছুটে যায়!

কেউ সাংবাদিকদের প্রেমে পড়ে না, কেউ সাংবাদিকদের বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। পাত্র হিসেবে সাংবাদিক তেমন যুৎসই নয়! এই চিরন্তনের ব্যতিক্রম হিসেবে চল্লিশে চালশে হওয়া তাশিকের জীবনে এসেছে ফারিয়া!তাই সকল আলস্যের ছুটি! পপুলার নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের চিফ সাব-এডিটর তাশিক বেশ ফুরফুরে মেজাজে থাকে। তবে মাঝে-মধ্যে বিপত্তিও ঘটে। তাশিক বুঝে— সাংবাদিকের নিজের বলে কোনো সময় নেই। পরিবার বলে কিছু থাকতে নেই। প্রেম বলেও বোধহয় কিছু থাকা উচিতনয়! যেন আপাদমস্তক সাংবাদিক হওয়ার বিকল্প নেইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইই।

সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টার রুটিন অফিস হলেও দু’চার ঘণ্টা বাড়তি দায়িত্ব পালন ছাড়া অফিস ত্যাগ করতে পারা যেন যানজট মুক্ত ঢাকার মতো! শুক্র-শনিবারের বাইরে কালেভদ্রে যেমন চোখে পড়ে পুরো ঢাকাবাসীর বেঘোর ঘুমে ফাঁকা সড়কে ক্রিকেট খেলার দৃশ্য! তেমনি বিকেলে ম্রিয়মান সুযের কোমল স্পর্শে তাশিকের ভাল-লাগা ছড়িয়ে পড়ার দিন আঙুলে গোনা যায়!

ভাবনার ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে তাশিক। এডিট ফোল্ডারে জমা পড়েছে ৭-৮টা নিউজ। সেগুলো দেখে দ্রুত ফাইনালে ছাড়তে হবে। এরই মধ্যে বার্তা সম্পাদকের তাগাদা বিশেষ একটি রিপোর্ট দেখে দেওয়ার। সব মিলিয়ে দৌড়ের ওপর থাকতে থাকতে নিজেকে মাঝে-মধ্যে মেশিন মনে হয় তার।

দুই.

‘শহুরে ব্যস্ততার পোশাক-পরিচ্ছেদ চল খুলে ফেলি
ঝুম অন্ধকারে জোনাকির আলোয় মনের কথা বলি।’

ছ’মাসের আলাপ-পরিচয়ে ভালমন্দ দুজনেরই বোঝা হয়ে গেছে। প্রিয়-অপ্রিয়র তালিকাটাও ছোটো নয়। রমনার লেকে ছোট্ট বোটে ফারিয়ার কোলঘেষে বসার সুযোগ সেই একদিনই হয়েছে! ওহ্ প্রতিদিনই কল্পনার ফানুস উড়িয়ে তাশিক ছুটে গেছে ওই লেকে! কিন্তু বাস্তবের পাগলা ঘোড়া ও পথ মাড়াইনি যেন গোপন সচেতনতায়! সাংবাদিকের হাজার চোখ! অন্যকোনো সগোত্রীয় যদি দেখে; গাল-গল্প লিখেও দিতে পারে। এ ভয়ের সঙ্গে অফিসের ব্যস্ততাওতাশিককে গিলে খায়। নিরিবিলি মোবাইল ফোনেও দু’চার দণ্ড কথা বলার সময় হয় না। অবসর মনে করে যেই আলাপে সমর্পিত; অমনি দেখা দেয় উদ্ভট কোনো জটিলতা— ‘বায়তুল মোকাররমে হেফাজতের বিক্ষোভে লাঠিচার্জ’ কিংবা ‘নিউমার্কেটে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের গাড়ি ভাংচুর’ জরুরি সংবাদ! প্যানেলে সরাসরি আপ করার স্বপ্রণোদিত তাগাদা। তারপর কেটে যাওয়া তাল ফেরাতে ফেরাতে রমনার লেকে নামে ঘোর অন্ধকার, ক্ষোভ-দুঃখ বাম পাশে রেখে; সবার আগে নিউজ দেওয়ার আমলনামা তালুবন্দি করে মেসে ফেরা!

কম্পিউটারের মনিটরে দীর্ঘক্ষণ চোখ রাখার ফল— অকাল ঘুম! সন্ধ্যা ৭টায় আজিমপুর কলোনির ফ্লাট-কাম মেসে ফিরে বিছানায় গা রাখতেই বর্ষার বৃষ্টির মতো হুড়মুড় করে চোখের পাতা বন্ধ! কতক্ষণ এমন বেঘোরে কেটেছে বেমালুম ভুলে যায়—‘‘সখী, ভাবনা কাহারে বলে।/সখী, যাতনা কাহারে বলে।/তোমরাযেবলোদিবস-রজনী ‘ভালবাসা’ ‘ভালবাসা’—/সখী, ভালবাসা কারে কয়!/সে কি কেবলই যাতনাময়।/সে কি কেবলই চোখের জল?/সে কি কেবলই দুঃখের শ্বাস?/লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ।’’— মোবাইল ফোনের সুরেলা এ কণ্ঠে চোখ মেলে তাশিক—

—হ্যালো…ওওওও
—একটা গুড নিউজ আছে। [ফারিয়ার কণ্ঠের আনন্দধ্বনি কানে বাজে! কিন্তু ঘুম ভাঙানোর রাগটা পড়ে না তাশিকের, তাই যেন বলে]
—কী বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে নাকি!
—তাইলে তো তুমি বাঁচো?[খোঁচা দিতে ছাড়ে না ফারিয়া, ধাতস্থ হয় তাশিক— ভুল পথে চলে গেল কী!]
—আরে না; ইয়ার্কি…।
—পারো তো শুধু ওই একটাই কাজ।
—আচ্ছা হল, সরি! বলো গুড নিউজটা কী?
—না থাক। আজকে আর বলার মুড নেই।
—এই থামো থামো; মুড থাক আর না থাক। লাইনটা কিন্তু কেটে দিও না। প্লিজ লক্ষ্মীটি।
—পাগলকে নাও দুলাইতে না করতেছো…। ভাল ভাল!
—এই-ইই…ই প্লিজ…।
—রাখো তোমার পিলিজ! কালকে ঠিক সাড়ে ৫টায় রমনায় আসো।
—আচ্ছা আসব। এখন খবরটা বলো?
—এখন না, তখনই বলব। তারপর সন্ধ্যায় বসুন্ধরায় গিয়ে তোমাকে একটা ঈদ উপহারও কিনে দিতে চাই।
—ওহ্ তাই! দারুণ!আমি আসব। তুমি এখনই সুখবরটা বলো না?
—না, এখন না রাখছি।
এরপর সব সুর কেমন বেসুরো হয়! অকাল বৈধব্য ভর করে রুমমেটদের না ফেরা অন্ধকার মেসে!

তিন.

‘মনে মনে কথা হয়
দূরে তবুও কাছে রয়’

ফারিয়ার প্রায়ই এমন হয়। প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয়ে চলে যায়। একটা রহস্য তৈরির জন্যও এমনটা করে অনেক সময়। এই যেমন তাশিককে সুখবরটা দিতে চাইলেও কেমন কেমন করে যেন ঘটনাটা ঘটল না। এখন ভীষণ মন খারাপ হয় তার। রাতের খাওয়া বাদ দিয়েই শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে একটা চিঠি লেখে ফারিয়া! কাগজ-কলম নেই, তবুও লেখে; মনে মনে! —শোনো তাশিক, তোমাকে সুখবরটা আজকেই দিতাম; কিন্তু কোথা থেকে কী যে হল! তুমি সবকিছু কেমন গুলিয়ে ফেললে। তোমার কথার পিঠে কথা বলতে গিয়ে আমিও…। আসলে আমার ভাগ্যটাই এমন। কোনো ভাল কাজ ভালভাবে শুরু করতে পারিনা। এই দেখো না গত বছর মাস্টার্স পরীক্ষার সময় প্রথমদিনই সেকি জ্বর! মনে হচ্ছিল; জীবন আগে। পরীক্ষা গোল্লায় যাক! নেহায়েত মা জোর করল, আমিও গেলাম। তারপর রেজাল্টটা দেখেছো! ডিপার্টমেন্টে সেরা ৩ জনের একজন আমি!চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অতো ভাল রেজাল্ট আগে কখনও হয়নি। সেই মানুষটাকে যদি চাকরির জন্য স্রেফ বসে থাকতে হয় তখন কেমন লাগে বলো?

ফারিয়া আর এগুতে পারে না। এরপর চিঠিতে কী লিখবে তা ভেবে পায় না; নাকি ভাবতে চায় না! ঘুমের রাজপুত্তর কখন যে কোমল পরশে মাথার চুলে বিলি কেটে যায় বুঝতে পারে না সে। রমনার লেক; বসুন্ধরা সিটি; তাশিকের বোকা বোকা হাসি সব কেমন গোলমেলে আধোজাগরণ জুড়ে থাকে! মনে মনে সাজানো কথামালা কষ্টিপাথরে খোদাই হয়ে ফিরে আসে! তারপর…

চার.

‘দুঃখবিলাস ভাল নয়, তবুও থাকে কারো সেই ঘোর
পথজানা মানুষ কেন যে, হঠাৎই হারায় জীবনের মোড়’

—আর দশটা মিনিট অপেক্ষা করো সোনা। এই যে রিকশায় উঠেছি। শুক্রবারের বিকেল। বুঝতেই পারছো রাস্তা ফকফকা। মতিঝিল থেকে রমনা ১০ মিনিটের ব্যাপার!
—আধাঘণ্টা হয়ে গেল। একা একা একটা মেয়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা, কাকের সামনে মাংশ রাখার মতো। এইডা কী তুমি বুঝো না?
—বুঝি তো রে বাবা! আর কয়েক মিনিট প্লিজ।
—আচ্ছা রাখলাম, আসো তাড়াতাড়ি।

তাশিক রিকশাওয়ালাকে তাগাদা দেয়— ভাই একটু জোরে যান না? আমার একটু তাড়া আছে।

ফাঁকা রাস্তায় রিকশা ছুটছে। তার চেয়ে জোরে ছুটছে তাশিকের মন! জাতীয় প্রেস ক্লাব পেরিয়ে কদম ফোয়ার মোড় ঘোরার মুহূর্তেই গুলিস্তান থেকে আসা শাহবাগমুখী ৩ নম্বর বাসটা ব্রেক কষে শ্‌-শ্‌-শ্‌-শ্‌-শ্‌ শব্দে। রিকশা থেকে বামপাশে ছিটকে পড়ে তাশিক। রিকশাওয়ালা সিট থেকে সরে রডের মাঝে বসে কঁকিয়ে উঠে। আর ততক্ষণে তাশিকের ডান পা বাসের সামনের চাকার নিচে। মাআআআ গো… এক চিৎকারেই সকল ভয় গলাফেটে বের হয় যেন।

ব্রেককষা বাসটা ত্বড়িত গতিতে যেন এক কদম পেছনে সরে যায়। তাৎক্ষণিকতার মহাযন্ত্রণার ঘোর কেটে উঠার আগেই তাশিকের মনে হয়— কান বেয়ে গরম পানি পড়ল কী! কিন্তু পানি আসবে কোথা থেকে? অবচেতনে বাম হাতটা কানের গোড়ায় যায়; একটু আঠালো অনুভব হয়! দ্রুতই হাতটা চলে আসে চোখের সামনে। চমকে ওঠে রক্ত-লালে! তাশিক নিমিষেই বুঝে যায়— মাথার কোথাও ফেটেছে বড় রকমের। আর পায়ের ওপরের পাহাড়টা সরে গেলেও নির্ভার মনে হয় না। তবুও উঠে দাঁড়ানোরব্যর্থ চেষ্টায় বুঝতে পারে— পা দু’টো নিজের নয়!

কেমন ভয়াল ঘোরের ভেতরে অনেক শব্দ শুনতে পায় তাশিক। সবকিছু শূন্য শূন্য মনে হয়। রমনা পার্ক, ফারিয়া, অনেক মানুষের শোরগোল, চিৎকার যেন দূর থেকে কীন্নর কণ্ঠে ভেসে আসে! তার মনে হয়— কারা যেন তাকে ধরাধরি করে কোথাও নেওয়ার চেষ্টা করছে। অবচেতনে অনুভব করে— এরা বোধহয় মৃত্যুদূত! গভীর সাগরের অতলে তলিয়ে যেতে যেতে কোনোমতো শুনতে পায় প্যান্টের বাম পকেটে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠে—‘‘সখী, ভাবনা কাহারে বলে।/সখী, যাতনা কাহারে বলে।/তোমরাযেবলোদিবস-রজনী ‘ভালবাসা’ ‘ভালবাসা’—/সখী, ভালবাসা কারে কয়!/সে কি কেবলই যাতনাময়।/সে কি কেবলই চোখের জল?/সে কি কেবলই দুঃখের শ্বাস?/লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ।’’ … … … … … …

সংগৃহিত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ