মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর : ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ী ট্রাজেডী দিবসের অষ্টম বার্ষিকী। ২০০৬ সালের এই দিনে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি প্রকল্প বাতিল এবং এশিয়া এনার্জীকে প্রত্যাহারের দাবীতে তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে মিছিল-সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিডিআর’র সাথে জনতার সংঘর্ষে সালেকীন (২০), তরিকুল ইসলাম (২১) ও আমিন (১৩) নিহত হয়। আহত হয় ২ শতাধিক। এ সময় উত্তেজিত জনতা এশিয়া এনার্জীর স্থানীয় অফিস ভেঙ্গে দেয়। এর পরে শুরু হয় লাগাতার হরতাল। পরবর্তীতে আন্দোলন কমিটির সাথে সরকারের সমঝোতার ভিত্তিতে হরতাল প্রত্যাহারসহ ধীরে ধীরে এলাকায় শান্তি ফিরে আসে।
২০০৬ সালের ৩১ আগস্ট’ তৎকালীন জোট সরকারের একজন উপমন্ত্রী ও রাজশাহী সিটি মেয়র ফুলবাড়ীতে এসে আন্দোলনরত নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকের পর এশিয়া এনার্জীকে প্রত্যাহার, হতাহতদের ক্ষতিপুরণসহ ৬ দফা চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
সমঝোতার আলোকে আন্দোলন কমিটির অন্যতম দাবী নিহত ও আহতদের ক্ষতিপুরণ এবং নিহতদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবীসহ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলেও অন্যান্য দাবীগুলো আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এগুলো হলো উন্মুক্ত পদ্ধতিতে দেশের কোথাও খনি প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে না, বাংলাদেশ থেকে এশিয়া এনার্জীর সকল কার্যক্রম বন্ধ করে তাদের প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির তৎকালীন অন্যতম নেতা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু জানান, ৬ দফা চুক্তির পর তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফুলবাড়ী এসে এক সভায় ঘোষনা দিয়েছিলেন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় গেলে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা হবে। সেই কথা রাখেননি আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফুলবাড়ীতে এখনও এশিয়া এনার্জির অফিস রয়ে গেছে। ভিন্ন নামে আবার এখানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পায়তাড়া চালানো হচ্ছে। এটা করা হলে এখানকার মানুষ তা প্রতিহত করবে।
উল্লেখ্য, ফুলবাড়ী পৌর এলাকাসহ এর আশপাশের এলাকায় ভূগর্ভে কয়লার সন্ধান পাওয়ার পর এশিয়া এনার্জী নামে একটি বিদেশী কোম্পানী ২০০৫ সালের ২ অক্টোবর ফুলবাড়ীতে কয়লার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করে। তারা ওই এলাকায় ১১টি কূপ খনন করে। ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও পার্বতীপুর উপজেলার অধীনে ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার অংশ ফুলবাড়ী প্রকল্প এলাকার অভ্যন্তরে অবস্থিত।
খনি বাস্তবায়নে ৫ হাজার ৯৩৩ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এর মধ্যে কৃষি জমির পরিমান ৪ হাজার ৭৬২ হেক্টর। খনির মেয়াদকালে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ এবং প্রায় ২০ হাজার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এক পর্যায়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু করলে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা এবং এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে ‘ফুলবাড়ীর মানুষ ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’ নামে একটি আন্দোলন কমিটি গঠন করে আন্দোলন শুরু করে।
তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি খনি বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়। শুরু হয় তীব্র আন্দোলন। চলতে থাকে মিছিল, মিটিং এবং সমাবেশ। এর পরও এশিয়া এনার্জী তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। আন্দোলনে বিস্ফোরণ ঘটে ২০০৬ সালের ২৬ আগষ্ট।
ফুলবাড়ী ট্রাজেডি দিবস উপলক্ষে এবার ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারন, গণজমায়েত, শোক র্যালী, স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ অর্পণ ও শহীদ স্মরনে দোয়া ইত্যাদি।