সিসি ডেস্ক: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নতুন বেতন কাঠামো থেকে সিলেকশন গ্রেড, টাইমস্কেল ও উচ্চতর স্কেল বিলুপ্ত ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন স্তর বিশেষ করে নিম্ন স্তরের কর্মচারিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, সিলেকশন গ্রেড, টাইমস্কেল এবং উচ্চতর স্কেল বিলুপ্ত হওয়ায় নিম্নস্তরের কর্মচারিরা তাদের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার যে আশংকা করছেন তা অমূলক। বরং তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।
সোমবার মন্ত্রিপরিষদ সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর অনুমোদন দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত পে-কমিশনের প্রতিবেদনে সিলেকশন গ্রেড, টাইমস্কেল ও উচ্চতর স্কেল বিলুপ্তের সুপারিশ করা হয়। সচিব কমিটিও সে সুপারিশ বহাল রেখে সুপারিশকৃত বেতন কাঠামোতে সামান্য পরিবর্তন এনে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হলে সেটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
এরপরই সিলেকশন গ্রেড/টাইমস্কেল/উচ্চতর স্কেল বিলুপ্ত প্রসঙ্গে অর্থবিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি প্রেসনোট দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে-
১. বর্তমানে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের প্রাপ্যতা নিয়ে চাকরিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে এবং নানা প্রকার বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে আন্ত:ক্যাডার ও অন্ত:ক্যাডার বৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। নিম্ন গ্রেডভুক্ত চাকরিজীবীদের মধ্যে এই বৈষম্য আরও প্রকট।
২. একই বেতনস্কেলে বেতন পেলেও প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিজীবীর জন্য একই ধরনের সিলেকশন গ্রেড বা টাইমস্কেলের বিধান বর্তমানে নেই। ক্যাডার, নন-ক্যাডার, ব্লক পদধারীদের মধ্যেও অনেক পার্থক্য রয়েছে। এই সমস্যা অন্যান্য শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যেও রয়েছে।
৩. চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের মধ্যে যারা সচিবালয়ে কর্মরত তারা ৮, ১২ ও ১৫ বছরে টাইমস্কেলের পাশাপাশি ১০ বছরে একই সিলেকশন গ্রেড পেয়ে থাকে। কিন্তু সচিবালয়ের বাইরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিরা তা না পাবার কারণে একই শ্রেণির কর্মচারিদের ক্ষেত্রে তীব্র অসন্তোষ বিরাজমান।
৪. জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯-এর ৭ (৬)এর দফা অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োজিত পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ১০ বছর পূর্তিতে ১০০% সিলেকশন গ্রেড প্রদানের যে বিধান করা হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে কার্যক্ষেত্রে পরিদৃষ্ট ক্যাডার-বৈষম্যের কারণে ২০১১ ও ২০১৩ সালে দুই বার সংশোধন করতে হয়েছে। এ সংশোধনীর পরেও আন্ত:ক্যাডার ও অন্ত:ক্যাডার বৈষম্য নিরসন হয়নি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে এই যে, এ ধরনের টাইমস্কেলের কারণে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা তৃতীয় গ্রেডে এবং ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা চতুর্থ গ্রেডে পৌঁছে গিয়েছেন।

৫. টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড প্রদানের ক্ষেত্রে চাকরিকাল গণনা ও স্কেল সুবিধা নির্ধারণের বিষয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এই জটিলতাকে কেন্দ্র করে সারা বছর বিভিন্ন মামলার উদ্ভব হচ্ছে যার নিস্পত্তি সহজ হয় না এবং চূড়ান্ত নিস্পত্তি করার সময় এককালীন অনেক অর্থ নির্বাহ করতে হয়।
৬. প্রকল্প হতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রকৃত চাকরিকাল গণনা করে টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড প্রদানের সুযোগ না থাকায় এ সুবিধা প্রবর্তনের জন্য ইতোমধ্যে প্রকল্প হতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত অনেক কর্মচারী রিট মামলা দাখিল করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব মামলায় সরকারের বিপক্ষে রায় হয়েছে।
৭. পদোন্নতি ব্যতিরেকে ক্যাডার কর্মকর্তাদের স্ব স্ব স্কেলের সর্বোচ্চসীমায় পৌঁছার এক বছর পর পরবর্তী উচ্চতর স্কেল (টাইম স্কেল) প্রাপ্তির সুবিধাটি যে সব ক্যাডারে চতুর্থ গ্রেডের পদোন্নতিযোগ্য পদ নেই সে সব ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ সমভাবে পান না। তাছাড়া কর্মচারীবৃন্দও এই সুবিধা পান না। কারণ নির্ধারিত বেতনক্রমের সময়সীমা বড় হবার কারণে কর্মচারিরা এই বিধানের সুবিধা প্রাপ্ত হন না।
৮. টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর স্কেল যে নামেই ডাকা হোক না, তার ফল একই। কিন্তু শুধু সময়ের ব্যবধানে কর্মকর্তা-কর্মচারিরা আপনাআপনি এই উচ্চতর স্কেল বা টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেড প্রাপ্ত হন না। এজন্য ডিপিসি’র (বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি) সভা অনুষ্ঠানের প্রয়োজন হয় এবং সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর এসিআর এবং সন্তোষজনক চাকরি বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ডিপিসি’র সভা সবসময় যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয় না। এসব কারণে এই ধরনের সিলেকশন গ্রেড/টাইম স্কেল নিয়ে অসন্তোষ রয়ে যায়।
৯. ডিপিসি’র সভার আলোকে সরকারি আদেশ জারি করার পর এজি অফিসে বেতন নির্ধারন প্রয়োজন হয়। যেখানে অনিয়ম বা দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে প্রচুর অভিযোগ রয়েছে।
১০. টাইম স্কেল/সিলেকশন গ্রেড/উচ্চতর স্কেল বিভিন্ন সময়ে চাকরিজীবীরা পেয়ে থাকেন, যার ফলে বাজেট নির্ধারণও জটিল হয়ে পড়ে।
১১. চাকরিজীবীরা যাতে আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য এবারের বার্ষিক বর্ধিত বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনা হয়েছে। ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ইনক্রিমেন্ট হিসেবে দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান প্রস্তাবে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ ক্রমপুঞ্জিত হারে ইনক্রিমেন্ট দেয়া হচ্ছে।
২০০৯ এর বেতনস্কেলে ২০ তম গ্রেডের সঙ্গে ১৯ তম গ্রেডের পার্থক্য মাত্র ৪২৫০-৪১০০= ১৫০ টাকা এবং বর্ধিত বেতন বৃদ্ধি ২০ তম গ্রেডে ১৯০ টাকা এবং ১৯ তম গ্রেডে ২১০ টাকা। অর্থাৎ টাইম স্কেল/ সিলেকশন গ্রেড পেলেও একজন চাকরিজীবীর জন্য খুবই সামান্য অর্থ বৃদ্ধি পায় এবং এজন্য ৮, ১২ বা ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়।
কিন্তু প্রস্তাবিত বেতনস্কেলে এই সুবিধা আরো আকর্ষণীয়। ২০ তম গ্রেডের চাকরিজীবী পাঁচ শতাংশ হারে প্রথম বছরে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি হবে ৮৬৭০-৮২৫০=৪২০ টাকা এবং পরবর্তী বছর ক্রমপুঞ্জিত হারে ৪৪০ টাকা এবং এইভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। প্রত্যেক গ্রেডের জন্য এই সুবিধা আছে। এমনকি যারা ব্লক পদে চাকরিরত তারা স্বীয় স্কেলে এই ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক সুবিধা পাবেন, যা জটিল টাইমস্কেল/ সিলেকশন গ্রেড থেকে সহজলভ্য হবে। যেমন-
টাইমস্কেল দিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণ
২০ নম্বর গ্রেডভুক্ত কর্মচারির ক্ষেত্রে:
৮ বছর পূর্তিতে কর্মচারিদের বেতন = ১১,৩৮০/-
১২ বছর পূর্তিতে কর্মচারিদের বেতন = ১৩,৩৬০/-
১৫ বছর পূর্তিতে কর্মচারিদের বেতন = ১৫,১৫০/-
ক্রমপুঞ্জিভূত ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা হলে বেতন হবে
২০ নম্বর গ্রেডভুক্ত কর্মচারির ক্ষেত্রে:
৮ বছর পূর্তিতে কর্মচারিদের বেতন = ১২,২৪০/-
১২ বছর পূর্তিতে কর্মচারিদের বেতন = ১৪,৯০০/-
১৫ বছর পূর্তিতে কর্মচারিদের বেতন = ১৭,২৭০/-
১২. প্রস্তাবিত বেতনস্কেলে ক্রমপুঞ্জিত ইনক্রিমেন্টের যে বিধান রাখা হয়েছে (৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ) তাতে চাকরিজীবীরা আর্থিক দিক থেকে লাভবান হবেন। কারণ, সনাতন পদ্ধতি অনুসারে নতুন বেতনস্কেল না হওয়া পর্যন্ত একই হারে ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্য হন। প্রস্তাবিত বেতনস্কেলে এই ইনক্রিমেন্ট প্রতি বছর ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকায় মুদ্রাস্ফীতির সাথেও সামঞ্জস্য বিধান সম্ভব হবে।
উৎস: রাইজিংবিডি