সিসি ডেস্ক: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন তরুণ বয়স থেকেই এলাকায় উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির যুবক হিসেবে পরিচিত। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের শাহাবাজ গ্রামে তার পৈতৃক বাড়ি। সে এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমপি লিটনের বাবা মৃত আশরাফ আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন কিন্তু লিটনকে এসএসসির পর পড়াশোনায় এগিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারেননি তিনি। উচ্ছৃঙ্খল সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে সময় কাটত লিটনের।
১৯৮৩ সালের দিকে তার উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে পরিবার থেকে একসময় তাকে নারায়ণগঞ্জে তার বোন ও দুলাভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তাদের সহযোগিতায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইসলাম শিপ বিল্ডার্স স্থাপন করেন। পরে ১৯৯৬ সালে সুন্দরগঞ্জে নিজ বাড়িতে ফিরে এসে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে ইসলাম শিপ বিল্ডার্সের নামে লিজ নেওয়া বেসরকারি ট্রেন পরিচালনার ব্যবসা করেন। এ সময় ট্রেন পরিচালনার কাজে কর্মী নিয়োগ দিতে গিয়ে চাকরির শর্ত হিসেবে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা জামানত নেওয়া হয়। কিন্তু চাকরি শেষে সেই জামানতের টাকা আর কর্মীরা ফেরত পাননি এবং ফেরত চাইতে গিয়ে মারধরের শিকার হন বলে তখন অভিযোগ ওঠে। বেসরকারি ট্রেন পরিচালনার ব্যবসা করার পর লিটন আর্থিকভাবে ফুলেফেঁপে ওঠেন। এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮২ সালের দিকে এসএসসি পাস করার পর লিটন পীরগাছা কলেজে ভর্তি হন। তখন তাকে জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে ওঠবস করতে দেখা যায় এবং এলাকায় সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা করতেন। এ অবস্থায় পরিবার থেকে তাকে নারায়ণগঞ্জে বোনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সুন্দরগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মাসুদ-উল ইসলাম চঞ্চল বলেন, লিটন ২০০১ সালের দিকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত হন। ট্রেন ব্যবসার বৈধ-অবৈধ রোজগারে ফুলেফেঁপে উঠে ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সৈয়দ আবুল হোসেন খাজার বিরুদ্ধে ‘কুলা’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভোট পেয়েছিলেন পাঁচশ’রও কম। এলাকার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, ২০০৩ সালে যখন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মকবুল হোসেন তখন দলের অবস্থা আর্থিকসহ নানা কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব সৃষ্টি করে দলের সভাপতি হন। এরপর থেকে তার একক সিদ্ধান্তেই দল পরিচালিত হয় এবং তখন থেকে তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলে দল চালাতে শুরু করেন। ফলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করা, তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা এবং সংগঠনের শৃঙ্খলা ও ন্যায়নীতি বিবর্জিত কাজ করার অভিযোগে উপজেলা আওয়ামী লীগের ৬৭ জন সদস্যের মধ্যে ৪২ জন সদস্যের স্বাক্ষরিত এমপি লিটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঢাকায় পাঠানো হয়। কিন্তু তখনো সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় কর্মীদের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি পায় এবং তারা দলকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। ফলে দল এলাকায় দুর্বল হয়ে পড়ে। গত জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার পর লিটনের উচ্ছৃঙ্খল ও বেপরোয়া আচরণ সীমা ছাড়িয়ে যায়। এ সময় প্রভাব খাটিয়ে তিনি তার স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতিকেও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের যু্গ্ম আহ্বায়ক পদে অধিষ্ঠিত করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি টি আই এম মকবুল হোসেন প্রামাণিক বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই এমপি লিটনের মদ্যপান আর মাতলামির মাত্রা বেড়ে যায়। অকারণে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, পিস্তল ও শটগানের যেখানে সেখানে গুলি ছোড়া, বাড়ি দখল, ভাঙচুর, মারপিট, গালাগাল, যাত্রা প্যান্ডেলে আপত্তিকর নৃত্যের আয়োজন আর কর্তব্যরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে নিজ হাতে পেটানোর সবই করলেন তিনি। এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দল ও এলাকায় সমালোচিত হলেও তার পেটোয়া বাহিনীর কারণে মুখ খুলতে পারেনি এলাকাবাসী। এখনো তার সেই বাহিনীকে টাকা-পয়সা দিয়ে তিনি তৎপর রেখেছেন। এমপি লিটনের গুলিতে শিশু সৌরভ আহতের ঘটনায় গড়ে ওঠা আন্দোলন মোকাবিলা করতে মাঠে নামানো হয়েছে পেটোয়া বাহিনীকে। সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও সাবেক উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন বার বার বিতর্কিত হচ্ছেন। তার কর্মকাণ্ড দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তিনি বেশির ভাগ সময় নেশাগ্রস্ত থাকায় নানা অঘটন ঘটিয়ে থাকেন। কিন্তু এসব অপকর্মের জন্য এখন পর্যন্ত দলীয়ভাবে কিংবা আইনগতভাবে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর ফলে তিনি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম বলেন, এমপি লিটন দিনে ঘুমান আর রাতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নিজে পাজেরো গাড়ি চালিয়ে ঘুরে বেড়ান। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ভোরে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে লোকজনকে গালাগাল করে বলেন, ‘এই তুই জামায়াত করিস, তোকে মারি ফেলব।’ শুধু তাই নয়, তিনি সরকারি কর্মকর্তাদেরও গালাগাল করে থাকেন। উপজেলার বামনডাঙ্গা আবদুল হক কলেজ মাঠে অবৈধভাবে চালানো অশ্লীল নৃত্যের সার্কাস প্যান্ডেল গত বছরের ২৫ মে ভেঙে দিতে গেলে গাইবান্ধা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেজবাহ আহম্মেদ এবং শরিফ আহম্মেদকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন তিনি। একই মাসে বামনডাঙ্গা কালীতলা বাজারে যাত্রা প্যান্ডেলে নগ্ন নৃত্য দেখার সময় নর্তকীকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে আনেন। পরে যাত্রা কমিটির সহায়তায় নৃত্যশিল্পীকে উদ্ধার করা হয়। এমপি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভোরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ েঢুকে ফাঁকা গুলি ছোড়েন। এর আগের দিন ২২ সেপ্টেম্বর ভোরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্রে ভিতর ঢুকে ওয়ার্ডবয় মামুনের বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করার চেষ্টা চালান। এ সময় মামুন দৌড়ে পালিয়ে নিজেকে রক্ষা করেন। গত ৫ জুলাই রামদেব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহির উদ্দিনকে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পায়ের জুতা দিয়ে পিটুনি দেন। গত ১৯ জুন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এমদাদুল হক বাবলুর সঙ্গে এমপির বাকবিতণ্ডা এমনকি তার গায়েও হাত দেন এমপি। এ নিয়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল এবং মানববন্ধন করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। এমনকি সংবাদ সম্মেলন করে এমপিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ এমপির নির্দেশনা মোতাবেক কাজ না করায় তাকে লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছুড়েছিলেন এমপি লিটন। এ কারণে তিনি বদলি নিয়ে চলে যান অন্যত্র। এরকম আরও অনেক অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে এমপি লিটনের বিরুদ্ধে।
লিটনকে আত্দসমর্পণের নির্দেশ স্থগিতে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন শুনানি আজ : গাইবান্ধা-১ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্দসমর্পণ করতে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। গতকাল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওই আবেদন করা হয়। পরে চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আবেদনটি শুনানির জন্য আজকের দিন ধার্য করেন। আবেদনের পক্ষে আদালতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। শিশুকে গুলি করাসহ দুটি মামলায় পৃথকভাবে এমপি লিটনের করা আগাম জামিন আবেদনে সোমবার খারিজ করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে তাকে গাইবান্ধার বিচারিক আদালতে আত্দসমর্পণ করতে নির্দেশ দেন আদালত। লিটনকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আইনি সুযোগের অস্পষ্টতা এড়াতে হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে চেম্বার আদালতে আবেদন করা হবে বলে সোমবারই সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। ওই দিন তিনি বলেন, এমপি লিটনের জামিন আবেদন খারিজ করা হয়েছে। কিন্তু তাকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্দসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
নির্দেশনা সংক্রান্ত হাইকোর্টের এ আদেশ আপিল বিভাগের রায়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। গত ২ অক্টোবর ভোরে জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্ধ ইউনিয়নের গোপালচরণ এলাকায় এমপি লিটনের ছোড়া গুলিতে দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ হয় স্কুলছাত্র শাহাদাত হোসেন সৌরভ (৯)। শিশুটি এখন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।