সিসি ডেস্ক: ঢাকার গুলশানে ইতালির নাগরিক তাভেলা সিজার এবং রংপুরে জাপানের হোশি কুনিও হত্যার তদন্তে অনেকটাই এগিয়েছেন গোয়েন্দারা। তারা বলেছেন, এই দুই খুনের সঙ্গে জঙ্গি সংগঠন আইএসের জড়িত থাকার প্রমাণ নেই। তারা জানতে পেরেছেন সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য একটি কুচক্রী মহল এই দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে। এই দুই হত্যাকান্ডের জন্য অস্ত্র সরবরাহ ও অন্যসব সহযোগিতা জুগিয়েছেন সরকারবিরোধী এক ছাত্রনেতা। এই ছাত্রনেতাকে ঘিরেই চলছে এই দুই বিদেশি নাগরিক হত্যা মামলার তদন্ত।
এই দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে মাঠে নামেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। পুলিশের পক্ষ থেকেও গঠন করা হয়েছে একাধিক তদন্ত টিম। সেই টিমের সদস্যরাও তদন্ত করছেন। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্তে অগ্রগতির দাবি করেন। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, দুই বিদেশি হত্যাকা-ের তদন্তে তারা চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘টার্নিং পয়েন্টে’ আছেন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আলোচিত এই দুই হত্যাকাণ্ড একই সূত্রে গাঁথা। তবে খুনিরা ভিন্ন। বিভিন্নভাবে প্রচার চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা বলা হলেও কোনো জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি সরকারবিরোধী চক্র এই দুই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এ জন্য কাজ করেছেন এক রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের একনেতা। মূলত তার নেতৃত্বেই হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। তিনিই অস্ত্র সংগ্রহ থেকে কোনদিক দিয়ে পালাতে হবে, কি করতে হবে তার সব ব্যবস্থা করেছেন। আর হত্যাকা- শেষে আইএস নাম দিয়ে থাকতে চেয়েছেন আড়ালে। দুই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা এক স্থানে হলেও ভিন্ন দুটি দল দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়েছে বলেও নিশ্চিত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, আলোচিত দুই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন টার্নিং পয়েন্টে অবস্থান করছেন তারা। গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন কয়েকজন। ইতিমধ্যে কিছু তথ্য-প্রমাণও চলে এসেছে। তবে পুরোপুরি তথ্য-প্রমাণ হাতে না আসা পর্যন্ত এই বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তদন্তে নিয়োজিত পুলিশের কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দ্রুতগতিতে চলছে। আমরা এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য বের করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। শিগগিরই জাতির সামনে এ তথ্য উন্মোচন করা হবে।
পুলিশ সদর দফতরের এক অনুষ্ঠানে ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, ইতালির নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যাকাণ্ডে জঙ্গিদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে এই ঘটনায় বিদেশি ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। তিনি বলেন, তদন্তে অনেক বেশি অগ্রগতি হয়েছে। খুনিদের ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত আছে। আমরা পুরো প্রমাণ পেলেই তাদেরকে আইনের আওতায় আনব।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, তাভেলা সিজারের খুনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী তিনজনকে ঘিরেই তদন্ত কাজ এগিয়ে চলছে। বিদেশি হত্যাকাণ্ডে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। খুনিদের রাজনৈতিক পরিচয়ও এখনো পাইনি। আমরা আশাবাদী যে খুব তাড়াতাড়ি এই খুনের রহস্য বের হবে।
২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা। ইতালির নাগরিক তাভেলা সিজার এদিন বিকেলে হাঁটাহাঁটির পর গুলশান-২-এ তার বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে করে আসা তিন যুবক ৯০ নম্বর রোডে সিজারের পেছন থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন গুলিবিদ্ধ সিজারকে দ্রুত ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হত্যাকাণ্ডের দুই ঘণ্টার মধ্যে ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ নামের এক সাইটে ইরাক-সিরিয়া ভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে বলে প্রচার করা হয়। কূটনৈতিক এলাকায় এই হত্যাকা- দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। পুরো গুলশানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কয়েকটি পাশ্চাত্য দেশ ও জাপান বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের চলাচলে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেয়। এ সময় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয় জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিমের ঢাকায় আসা-না আসা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক। এমনি টানটান পরিস্থিতির মধ্যেই আলোচিত এই হত্যাকান্ডটি ঘটে। পরে বাতিল হয়ে যায় সেই বহুল আকাক্সিক্ষত সফর।
এই হহত্যাকাণ্ডের যখন সপ্তাহ পার হচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে রংপুরের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে একই কায়দায় জাপানি নাগরিক হোশি কুনিওকে হত্যা করা হয়। এই অবস্থায় বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে আসে। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পরও আইএস দায় স্বীকার করে বলে খবর দেয় সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ নামের সেই সাইটটি।
পরপর দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। ঝড় ওঠে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দক্ষতা নিয়েও। ঢাকায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের চলাফেরায় সতর্কতা জারি করে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিরাপত্তা নিয়ে কড়া সমালোচনা করে এবং কয়েকটি অনুষ্ঠানও বাতিল করে। ঢাকায় কানাডা দূতাবাসও একটি পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল করে। পাশাপাশি বিদেশিদের ওপর নির্বিচারে হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা করে বিবৃতি দেয় যুক্তরাজ্য। এমন অবস্থায় সে দেশের এক মন্ত্রীর সফর বাতিল হয়। ঢাকায় বিদেশিদের কয়েকটি অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। এমন অবস্থায় মুশকিলে পড়ে সরকার।