সিসি ডেস্ক: রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনী থেকে উদ্ধার এক গুচ্ছ চুল নিয়ে রহস্যের জন্ম হয়েছে। এ চুল নিয়ে এখন চলছে চুলচেড়া বিশ্লেষণ। ৩১ অক্টোবর এই প্রকাশনীর ভেতরেই দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন প্রতিষ্ঠানটি স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফীন দীপন। এদিন লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর নামের একটি প্রকাশনীতেও হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ হামলায় গুরুতর আহত হন তিনজন।
জাগৃতি প্রকাশনীর অফিস থেকে উদ্ধার চুল প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব সংশ্লিষ্টরা বলেছেন ওই চুল সন্দেহভাজন ঘাতকদের। ওই চুল দীপনের নয়। এছাড়া শুদ্ধস্বরের যে তিন ঘাতক সরাসরি হামলা চালায় তাদের একটি স্কেচ তৈরি করার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা। শুদ্ধস্বরের অফিস সহকারী রাসেল ও হামলায় বেঁচে যাওয়া রণদীপম বসু ও তারেক রহিমের বর্ণনা থেকে এই স্কেচ তৈরি করা হচ্ছে। স্কেচ তৈরির পর ঘাতকদের শনাক্তে সেটা বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে পাঠানো হবে।
এদিকে মামলার ছায়া তদন্তকারী সংস্থা র্যাব সম্ভাব্য ঘাতক হিসেবে কয়েকজনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে। এছাড়া তিন দিন বন্ধ থাকার পর বুধবার আজিজ সুপার মার্কেটের দোকান খোলা হয়েছে। তবে এক অজানা আতংকে দিন কাটছে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের।
ফরেনসিক ল্যাব সংশ্লিষ্ট সিআইডির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাগৃতি প্রকাশনীর অফিসে ফয়সল আরেফীন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করার পর সেখান থেকে রক্ত, এক গোছা চুল, হাতের ছাপ, পায়ের ছাপসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়। ওইসব আলামত মামলার তদন্ত সংস্থাকে দেয়া হয়। আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর সেগুলো সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ঘাতকরা দক্ষতার সঙ্গে অনেক আলামত নষ্ট করে গেছে। কিছু স্পষ্ট হাত ও পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। আর পাওয়া গেছে এক গোছা চুল। ধারণা করা হচ্ছে উপুড় করে দীপনের ঘাড়ে কোপানোর সময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ঘাতকদের কারও মাথা থেকে চুলগুচ্ছ কেটে নিচে পড়ে।
ডিবি পুলিশের একটি সূত্র জানায়, দীপন হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষদর্শী নেই। কিন্তু লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর অফিসে হত্যা চেষ্টা মামলায় চারজন প্রত্যক্ষদর্শী আছেন। তাদের মধ্যে তারেক রহিমের অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন। অফিস সহকারী রাসেল ঘাতকদের দেখেছেন। তিনি তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে ঘাতকদের চেহারা, শারীরিক অবয়বের একটি বর্ণনাও দিয়েছেন। এছাড়া রণদীপম বসু ও টুটুল সুস্থ হলে তাদের কাছ থেকে বর্ণনা নিয়ে ঘাতকদের আঁকা স্কেচ চূড়ান্ত করা হবে। এই স্কেচ প্রকৃত ঘাতকদের শনাক্ত করতে সহযোগিতা করবে বলে তদন্ত সূত্র জানায়।
এদিকে আজিজ সুপার মার্কেটে সিসিটিভির যে অস্পষ্ট ফুটেজ পাওয়া গেছে, সেখানে তিনজনকে সন্দেহভাজন ঘাতক হিসেবে মনে করছেন গোয়েন্দারা। ঘটনার দিন বেলা ২টার পর আজিজ সুপার মার্কেটে প্রবেশ করা ও বাইরে তাড়াহুড়া করে যাওয়ার ছবি দেখে তিনজনকে সন্দেহ করা হয়। এরপর তাদের আরও বেশ কিছু ছবি পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা ধারণা করছেন- এই তিনজন সেদিনের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।
তবে মঙ্গলবার ডিবি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ফুটেজ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য সমর্থন করেননি আজিজ সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি ইফতেখার হোসেন। তারা দাবি করে বলেন, মার্কেটের নিচতলার বিভিন্ন স্থানে মোট আটটি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো ছিল। কেউ যদি নিচতলা দিয়ে ভবনে প্রবেশ করেন এবং বের হন তাহলে অবশ্যই তার ছবি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়বে।
মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল আহসান বলেন, ওই দিন দুপুরে দীপনের গাড়ি আসার পর কয়েকজন ঘাতক তাকে অনুসরণ করে। তারা পূর্বপাশের গেট দিয়ে মার্কেটে প্রবেশ করেছে এবং হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মার্কেটের পূর্বপাশের গেট দিয়ে বের হয়ে গেছে। মার্কেটের ভেতরে সিসি ক্যামেরা ছিল না বলে জানান তিনি। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও সন্দেহভাজন ছয়জনের তথ্য জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে দীপন হত্যা মামলার তদারকি কর্মকর্তা ডিবির উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, আমরা ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করেছি। মার্কেটে অনেক লোকের যাতায়াত ছিল। সেখান থেকে সন্দেহভাজন ঘাতক শনাক্ত করা খুবই কঠিন। ফুটেজের যে অংশটুকু আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি সফটওয়্যার ব্যবহার করে সেটা স্পষ্ট করার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে আমরা ধারণা করছি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের স্লিপার সেলের সদস্যরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
দীপন হত্যা মামলার ছায়া তদন্তকারী সংস্থা র্যাব বলছে- তারা সম্ভাব্য ঘাতক হিসেবে কয়েকজনকে শনাক্ত করতে পেরেছেন। তাদের পরিচয় সম্পর্কে কোনো তথ্য না দিয়ে র্যাবের একজন কর্মকর্তা বলেন, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে।
এদিকে লালমাটিয়ায় ঘাতকদের অভিযান ছিল মাত্র ৩ থেকে ৪ মিনিটের। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শুদ্ধস্বরের স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল সাংবাদিকদের বলেন, প্রথমে দুজন ভেতরে প্রবেশ করে অস্ত্রের মুখে দুই জনকে সোফায় বসিয়ে জিম্মি করে। পরে আরও একজন ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকে। কোনো কিছু বোঝার আগেই তারা এলোপাতাড়ি সবাইকে কুপিয়ে জখম করে। যাওয়ার সময় তাদের বাইরে তালা দিয়ে যায়।
এর আগে তদন্ত সংস্থার একটি সূত্র জানায়, জোড়া মামলার ঘাতক দল চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে ঢাকায় এসেছিল। কিলিং মিশন শেষ করে তারা আবার ঢাকা ছেড়ে চলে যায়। প্রায় একই সময়ে পৃথক দুটি হামলার ঘটনায় চারজন করে মোট আট জন অংশ নেয়। প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন এসব অপরাধী কেউই মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখেনি। তবে ঘটনার আগে-পরে তারা ভাইবারের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন। দুটি জায়গাতেই ঘাতকরা গিয়েছিল বইয়ের ক্রেতা সেজে। ধারণা করা হচ্ছে তারা আগেও কয়েক দফা ওই এলাকা রেকি করে।
দীপন খুনের ঘটনায় তার স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান জলি শাহবাগ থানায় ও শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ টুটুল অসুস্থ থাকায় তার পক্ষে ভায়েরা সাজ্জাদ হোসেন সোমবার মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। জোড়া হামলার মামলা দুটির তদন্ত ওই দিনই স্থানান্তর হয় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে।
জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফীন দীপন হত্যাকাণ্ডের পর টানা তিন দিন শোক পালন করেন আজিজ সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। শোক পালন শেষে বুধবার তারা মার্কেট খুলেছেন।
মার্কেটের দোকান মালিক ও প্রকাশকদের কয়েকজন জানান, দীপনের মতো একজন অমায়িক সজ্জন ব্যক্তি খুন হওয়ার পর তারা আর কেউ নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারছেন না। দীপন দোকান মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দীপন খুনের পর অজানা আতংকে দিন কাটছে ব্যবসায়ী, লেখক ও প্রকাশকদের।
মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক আজহারুল ইসলাম কনক বলেন, আমরা বুধবার থেকে যথারীতি মার্কেট খুলেছি। কিন্তু সবার মধ্যে ভয় ও উৎকণ্ঠা কাজ করছে। কেউ আগের মতো নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারছে না।
এদিকে দীপন হত্যার প্রতিবাদে পুরো মার্কেট কালো কাপড়ে ঢেকে বুধবারও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। দুপুর ১২টার সময় বিক্ষোভ সমাবেশে আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের প্রকাশক, সাধারণ ব্যবসায়ী, দোকান কর্মচারীরা অংশ নেন। এ সময় তারা দীপনের ঘাতকদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আজিজ কো-অপারেটিভ দোকান মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি নাজমুল আহসান, সহ-সভাপতি এমএ শাহবুদ্দীন আহমেদ ফারুক, দপ্তর সম্পাদক আজহারুল ইসলাম কনক, শ্রাবণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রবিন আহসান, প্যাপিরাস প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মোতাহার হোসেন প্রমুখ। সূত্র: যুগান্তর।