সিসি নিউজ: বাংলাদেশের ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখন মধ্যবিত্ত-এক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করেছে সরকারি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস।
আর বিআইডিএস দেশের মধ্যবিত্তদের বিকাশের এই দাবি করছে, দৈনিক দুই থেকে তিন ডলার (মাথা পিছু ক্রয়ক্ষমতা তথা পিপিপি হিসাবে) আয় করেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যবিত্ত ধরে নিয়ে।
গত বৃহস্পতিবার বিআইডিএসের গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ওইদিন প্রতি ডলারের সাথে বাংলাদেশি টাকার সর্বোচ্চ বিনিময় মূল্য ছিল ৭৮.২ টাকা। এ হিসাবে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের দৈনিক আয় দাঁড়ায় ১৫৬.৪ টাকা থেকে ২৩৪.৬টাকা।
তবে গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, রাজধানীর একজন রিকশাচালক দৈনিক গড়ে ৪৪৬ টাকা আয় করেন। আর গ্রামের রিকশা চালক দৈনিক গড়ে ৪০২ টাকা আয় করেন।
আর ভ্যানচালকের আয় গড়ে ৫০০ টাকা। এছাড়া ইজিবাইক চালিয়ে দৈনিক ১ হাজার ১৬১ টাকা আয় হয়। থ্রি-হুইলার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকেরা দৈনিক আয় করেন ১ হাজার ৪০৬ টাকা।
এ অবস্থায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক বা সিএনচি চালকরাও কি মধ্যবিত্ত? বিআইডিএসের গবেষণাতেও কি তাদের মধ্যবিত্তের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে?
জানা গেছে, মধ্যবিত্তদের নিয়ে গবেষণাটি করেছেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন। ঢাকা শহরের ১২টি এলাকায় ৮০৯ সংখ্যক নমুনা নিয়ে তিনি গবেষণাটি করেছেন।
বৃহস্পতিবার বিআইডিএস কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সেমিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন বিনায়ক সেন।
এ সময় মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংজ্ঞা নির্ধারণ প্রসঙ্গে ড. বিনায়ক সেন বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন ব্যক্তি ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) দৈনিক দুই থেকে তিন ডলার পর্যন্ত আয় করলে তাকে মধ্যবিত্তের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়; যদিও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংজ্ঞা হলো দুই থেকে ১৩ ডলার। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সংজ্ঞা উপযোগী নয়। কারণ বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের কাতারে চার ডলারের বেশি আয়ের লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯২ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৯ শতাংশ মধ্যবিত্ত ছিল। আর মধ্যবিত্ত বাড়ার হিসাবটি করা হয়েছে ২০১০ সালকে ভিত্তি বছর ধরে।
প্রায় দুই দশক পরে এ মধ্যবিত্তের হার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এ সময়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে দারিদ্র্য বিমোচন দ্রুত হয়েছে। উন্নয়ন টেকসই হয়েছে।
বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের হার যেভাবে বাড়ছে, এটি অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালে এ হার ২৫ শতাংশে আর ২০৩০ সালে ৩৩ শতাংশে উন্নীত হবে।
বিনায়ক সেনের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, রবিবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৯৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫৬২ জন। এর মধ্যে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী হলো ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৬৭৬ জন।
গবেষণা সম্পর্কে বিনায়ক সেন বলেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির আরও বিকাশ হলে প্রবৃদ্ধির জন্য ভালো হবে। এতে উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও চাকরিজীবীর সংখ্যা বাড়বে। যত বেশি চাকরিজীবী বাড়বে, প্রবৃদ্ধিও সুসংহত হবে।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির চরিত্রটি কেমন—তাও এ গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে যত মধ্যবিত্ত রয়েছে, এর ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ বা প্রায় অর্ধেকই বেসরকারি চাকরি করে। আর ২০ শতাংশের বেশি সরকারি চাকরি করে। মধ্যবিত্তদের মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ ব্যবসা করে। নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ বেসরকারি চাকরি করে। আর ব্যবসায় সম্পৃক্ত মাত্র ১৭ শতাংশ।
একসময় ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা শুধু উচ্চবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরাও এখন ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে। গবেষণায় ফলাফলে দেখা গেছে, ২৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে। আর বাংলা মাধ্যমে পড়ে দুই-তৃতীয়াংশ মধ্যবিত্তের ছেলেমেয়েরা। তবে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৭৫ শতাংশই বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে শহর এলাকায় জমি, ফ্ল্যাট বা অন্য স্থাবর সম্পদ তৈরির ঝোঁক বেড়েছে। ২০১২ সালের হিসাবে, এ শ্রেণির অর্ধেকই এখন জমির মালিক। ১৯৯২ সালে তাদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশের জমির মালিক ছিল। আবার ৩৩ দশমিক ০৬ শতাংশ ফ্ল্যাটের মালিক। ১৯৯২ সালে এর হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। তবে উচ্চবিত্তদের মধ্যে ৯০ শতাংশের ফ্ল্যাট রয়েছে। ২০ বছরের আগে এ হার ছিল মাত্র ২৬ দশমিক ১১ শতাংশ। শহরে বসবাসরত মধ্যবিত্তের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ জমির মালিক, আর প্রায় এক-চতুর্থাংশ ফ্ল্যাটের মালিক।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারেও মধ্যবিত্তের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ মধ্যবিত্ত তাদের বাসাবাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যে এ হার যথাক্রমে ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ ও ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ। আর বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে প্রবাসী-আয় পায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মধ্যবিত্ত পরিবার।
মধ্যবিত্তদের মধ্যে আর্থিক খাতে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রবণতাও বেশ ভালো। গবেষণায় বলা হয়েছে, ৯৬ শতাংশ মধ্যবিত্তের ব্যাংক হিসাব আছে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী ব্যাংকে স্থায়ী আমানত রাখে। আর প্রায় ১৭ শতাংশ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। মধ্যবিত্তদের ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে।
সূত্র: বাংলাদেশে ব্যাংক, বিবিএস, প্রথম আলো ও কালেরকণ্ঠ