ঢাকা: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সহকারী পরিচালক ইকবাল পারভেজ। তার সম্পদের পরিমাণ ২১৮ কোটি টাকা। এমন অভিযোগ পাঠানো হয় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। কমিশন অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে দুদকের চোখ ছানাবড়া। একজন সামান্য কর্মকর্তার এত সম্পদ!
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকায় রাজউকে চাকরি পান ইকবাল পারভেজ। আবদুল মান্নান খান ক্ষমতায় থাকাকালে রাজউকের জমি বরাদ্দ, ভবনের নকশার অনুমোদন, ভূমিব্যবহার ছাড়পত্র প্রদানের তদবির, পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় ছাড়করণ, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল ইকবাল পারভেজের। প্রতিমন্ত্রীর লোক বিবেচনায় তার তদবির ফিরিয়ে দেওয়ার সাহস পেতেন না কোনো কর্মকর্তা। মাত্র ৫ বছরেই তিনি কয়েকশ কোটি টাকার মালিক বনে যান। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তার সম্পদের তথ্য-উপাত্তের বিস্তারিত তুলে ধরে লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয় দুদকে। কমিশন অভিযোগটি আমলে নিয়ে সংস্থার উপ-পরিচালক এসএম রফিকুল ইসলামকে অনুসন্ধানী কর্মকর্তা নিয়োগ করে। অনুসন্ধানী কর্মকর্তা তার নামে-বেনামে থাকা সম্পদের তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করতে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেন। পাশাপাশি চিঠি দেন অভিযুক্ত ইকবাল পারভেজকেও। চিঠির ভিত্তিতে কোনো-কোনো দপ্তর থেকে কিছু তথ্য-উপাত্ত ইতোমধ্যে দুদকে সরবরাহ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানী কর্মকর্তা এসএম রফিকুল ইসলামকে পরিবর্তন করে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংস্থার উপ-পরিচালক ফানাফিল্যাকে।
দুদক সূত্র জানায়, বিভিন্ন ব্যক্তিকে ভুয়া মালিক সাজিয়ে কাগজপত্রে তিনি ক্রয়সূত্রে মালিক হন। তার নামে রাজধানীর ৯৬৭ পশ্চিম মোহাম্মদবাগ কদমতলী এলাকায় ২০ কাঠা, কদমতলীর ১০৯২ এবং ১০৯০ সি-ব্লকের মেরাজনগরে ৭ তলা এবং ৩ তলা দুটি বাড়ি, কদমতলী এলাকায় ১৬২ এ-ব্লকে একটি একতলা মার্কেট, পূর্বাচল এলাকায় ১০ কাঠার একটি প্লট রয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৬৬ কোটি ২০ লাখ টাকা। এছাড়াও আছে রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় মোট ৫৬০ দশমিক ৯৪ শতাংশ জমি। এসব সম্পদের বাজারমূল্য ১৬ থেকে ১৭ কোটি টাকা। তিনি মো. খাদেম আলীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সাজিয়ে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ১০ কাঠার একটি প্লট হাতিয়ে নেন এবং পরবর্তী সময়ে প্লটটি তার ভগ্নিপতি (বোনজামাই) আনোয়ার হোসেনের নামে স্থানান্তর করেন। এর বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। তার নামে রাজধানীর রমনা এলাকায় ৭০ ও ৭১ ইস্টার্ন মহলের দ্বিতীয়তলায় ২ হাজার ১০০ বর্গফুট, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জাহাঙ্গীর টাওয়ারের তৃতীয় তলায় ১ হাজার ১০০ বর্গফুট এবং রাজধানীর টিকাটুলিতে টয়েনবি সার্কুলার রোডের কিংস প্লাজায় ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে। এসব ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। তার একটি মিতসুবিশি ব্র্যান্ডের ও একটি প্রিমিউ এফ ব্র্যান্ডের গাড়ি রয়েছে। এছাড়াও ঢাকা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে তার নামে প্রায় ৪০ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে নামে-বেনামে প্রায় ৩০ কোটি টাকার শেয়ার এবং স্ত্রী-সন্তানদের নামে প্রায় ১০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। দুদকে পাঠানো তথ্যানুযায়ী এসব সম্পদের বাজারমূল্য দেখানো হয়েছে ২১৮ কোটি ৬৫ লাখ ১২ হাজার টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, দুদকে পাঠানো অভিযোগে রাজউক কর্মকর্তা ইকবাল পারভেজের সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ২১৮ কোটি টাকার। কিন্তু বাস্তবে তার সম্পদের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি এত অল্প সময়ে কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তা কল্পনাকেও হার মানায়। এসব সম্পদের মালিক কি তিনি একাই নাকি এর সঙ্গে অন্য কোনো রাঘববোয়াল আছে তারও অনুসন্ধান চলছে।
এ বিষয়ে জানতে গতকাল শুক্রবার বিকালে মোবাইল ফোনে ইকবাল পারভেজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি এখন রাজউকের চাকরি করি না। অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।