।। ডা. কিউ. এম. অহিদুল আলম ।।
মেহেরবানু ৮০ বছরের প্রৌঢ়া মহিলা, বুকে ব্যথা অনুভব করায় একমাত্র কাছে থাকা পুরুষ মানুষ ড্রাইভার ‘খালাম্মাকে’ হাসপাতাল নেয়ার পথেই বৃদ্ধা ইন্তেকাল করেন। ড্রাইভার কর্তব্য মতে হাসপাতালে পৌঁছায়। কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রায় বিশ ঘণ্টা হাসপাতালের শীতাতপ কক্ষে থাকতে হয়। রাত দু’টায় মৃত্যু হলে- পরের দিন বাদ আছর মেহেরবানুকে কবর দেয়া হয়।
মেহেরবানুর জন্ম বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে। স্বচ্ছল পরিবারে জন্ম। ব্রিটিশ আমলে বাবা থাকতেন রেঙ্গুনে। সেকালে রোগবালাই অনেক কম বয়সি মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। প্রসূতি মৃত্যুও ছিল অনেক বেশি যা আজকাল কার যুগের জন্য অবিশ্বাস্য। মেহেরবানুও মা-হারা হন চার বছর বয়সে। গ্রামে চাচা-চাচী বেষ্টিত যৌথ পরিবারে মা-হারা চার বছরের বাচ্চা বুঝতেই পারে না যে মা-হারা। এমনি সবার আদর যত্নের মেহের নেহায়েত প্রাকৃতিক ছন্দে লালিত ও বর্ধিত হয়। গ্রামে সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে প্রাথমিক স্কুলেও যখন মেয়েরা পড়ত না তখনও মেহের লেখাপড়া শিখেছিল। মেয়ে একটু বড় হলে রেঙ্গুনে কর্মরত বাবা মেয়ের মন খুশি রাখার জন্য ‘গ্রামোফোন’ ও কিনে দেন। ‘গ্রামোফোনকে বলা হত কলের গান। মেহেরের এক ভাই। সেও সেই যুগের ‘ফাস্ট’ টাইপের ও শিক্ষিত ছেলে ছিল। ভাইবোন দু’জনে রাফি, তালাত ও শামসাদ বেগমের গানের রেকর্ডগুলো শুনত আর দু’জনে অলস দুপুরে গানেরও চর্চা করত। ভাইয়ের সংসারে মা-হারা মেহের আদর যতেœ বড় হতে থাকে। বিয়ের বয়স হতেই মেহেরের বাপও মারা যায়। তখন বার্মার জীবন শেষ হয়ে পাকিস্তানের জীবনের শুরু মাত্র। ভাই মেহেরের জন্য উপযুক্ত ‘পাত্র’ খুঁজতে থাকে।
পাকিস্তানের শুরুতে অর্থাৎ ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মেট্রিক ভাল ফল নিয়ে পাস করা ছাত্রের সহজেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি হয়ে যেত। এসব চাকরি লোভনীয় ছিল, প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ- উড়োজাহাজে করে ঢাকা থেকে করাচি। করাচি পৌঁছে পেশোয়ার, কোহাট অঞ্চলে অপরিচিত পরিবেশে উন্নত সেনাজীবন শুরু হতো, এমনি একজন বিমান বাহিনীতে উচ্চপদে কর্মরত তরুণের সাথে মেহেরের বিয়ে ঠিক হয়। মেহেরের শ্বশুর বাড়িতে সম্পন্ন আর্থিক অবস্থা না থাকলেও বর কিন্তু ভাল ভবিষ্যতওয়ালা ও মেধাবী তরুণ। তখন বাংলাদেশ থেকে যারা মেট্রিক পাস করে পাকিস্তান যেত তাদের চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনার সুযোগও থাকত। এ সুবাদে প্রায় সবাই বি. এ. এম.এ. পাস করে ফেলত, যারা টেকনিক্যাল ক্যাটাগরিতে চাকরি করত তারাও ইঞ্জিনিয়ার বনে যেত। মেহেরের স্বামীও এম. এ. পাস করে ফেলে সহজেই। মেহেরও পাড়ি জমায় পাকিস্তানে। মেহেরের স্বামী বিভাগীয় পরীক্ষা দিতে দিতে বড় অফিসার হয়ে যান।
মেহের পাকিস্তানে আর অজ গাঁয়ের বধূ থাকেন না। অফিসার্স ক্লাব, পার্টি ইত্যাদিতে অবাধ বিচরণ। ইসলামাবাদ, লাহোর, সারগোদা, পেশোয়ার সব জায়গায় স্বামীর কর্মক্ষেত্রের বদৌলতে মেহেরের জীবনের পরিধি ও বিস্তৃত হয়। সরকারের উঁচুস্তরে তাদের একটা অবস্থান গড়ে ওঠে। বছরে একবার স্কুল ছুটিতে বাংলাদেশে বেড়াতে আসত। এমনিভাবে চলছিল জীবন। করাচির অভিজাত আবাসিক এলাকায় একটা প্লটও কিনেছিল তারা। জীবনের সমস্ত ছন্দের পতন ঘটে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়। কয়েক লাখ সরকারি বাঙালি কর্মকর্তা- যারা পাকিস্তানে কর্মরত ছিল তাদের সবাইকে ‘বন্দি’ করে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। মেহেরুন ও তার তিন ছেলে, দুই মেয়ে নিয়ে বন্দি জীবনযাপন করে তিন বছর। আন্তর্জাতিক রেডক্রসের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ রাখত।
’৭৪ সালে মুজিব-ভুট্টো চুক্তি মতে লাখ লাখ বাঙালি দেশে ফিরে আসে। এই কাফেলায় কপর্দকহীন অবস্থায় মেহেরের পরিবার বাংলাদেশে ফিরে আসে। মেহেরের স্মৃতিতে এটা দুইবার উদ্বাস্তু হওয়ার ঘটনা। প্রথমবার ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় মেহেরের পরিবার বার্মা থেকে রিক্ত হস্তে দেশে ফিরে। ’৭৪-এ আবার একই ঘটনার শিকার হন মেহের। বাংলাদেশে ’৭৪ সালের এবং তৎপরবর্তী সময়ে কখনো ডলার ব্যবসা, কখনো হু-ি ব্যবসা করে খুব দ্রুত নতুন একটি ধনিক শ্রেণির উদ্ভব হয়। মেহেরের ছেলেরাও ঢাকায় পয়সা কামানোর এ সুযোগ ব্যবহার করে। পাকিস্তানের ২৪ বছরে মেহেরের স্বামী যত কামাই করতে পারে নি, ’৭৪ পরবর্তী দু’তিন বছরে মেহের পরিবার ঢাকায় বাড়ি গাড়ির মালিক হয়ে যায়। তাদের চলনে বলনে পরনে নব্য আভিজাত্য, অতি আধুনিকতা ও প্রাচুর্য্যের প্রতিফলন দেখা যায়।
তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগ। সেনা সদস্যদের গোলাগুলিতে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় বসে থাকা মেহেরের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছেলে মাথায় উড়ন্ত গুলি লেগে মারা যায়। হতোদ্যম হয়ে যায় পুরো পরিবার। এর জন্য কি জন্মভূমিতে ফিরে এসেছিল তারা! মেধাবী পুত্রহারা শোক নিয়ে মেহেরের পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন এগিয়ে যায়। বাড়ি-গাড়ি, নাতি-নাতনির হৈ হুল্লোড় -মেহেরের জীবন আলাদা মাত্রা পায়। এর মাঝে ঢাকার অন্যান্য পরিবারের মতো এক মেয়ে উত্তর আমেরিকা, অন্য মেয়ে সুইডেন মাইগ্রেশন করে। মেহের হলিডে করে দুই মেয়ের কাছে। জীবনের ষষ্ঠ দশকে উচ্ছল আনন্দে হঠাৎ নেমে আসে এক ট্র্যাজেডি। মেহেরের স্বামী বাথরুমে পড়ে মাথা ফেটে মারা যান। তার দু’মাস পরেই বিত্তশালী তরুণ ব্যবসায়ী ছেলে বিদেশে ভ্রমণের সময় দুবাই-এয়ারপোর্টে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়।
বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলে আলাদা বাসায় থাকে। মেহের একা ছয়তলা বাসায় ড্রাইভার আর কাজের বুয়া নিয়ে থাকেন। জীবনের সব আনন্দ-উচ্ছলতা- কিছুটা বার্ধক্য-কিছুটা আধুনিক সময়ের একাকীত্ব ক্ষয় করতে থাকে। গেল কয়েক বছর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। বিছানাতেই খাওয়া, মাঝে মাঝে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। রাতে ডিমলাইটের ক্ষীণ আলোয় মেহেরুন ফিরে দেখে সচ্ছল পরিবারের গ্রামীণ যৌথ পরিবার।
চারিদিকে স্বজন। তখন এত আধুনিকতা সুইচ টিপলেই সব-এমন সময় ছিলনা, ছিল না প্রাচুর্য আর নিঃসঙ্গিতা। এখন মেহেরুনের নাতি-নাতনী মেয়ে-ছেলে সবই আছে-কিন্তু কাছেকেউ নেই-সবাই প্রবাসে। কাছে আছে শুধু ড্রাইভার।
মাঝ-রাতে বুকে ব্যথা হলে ড্রাইভারকে বলে মেহের। ড্রাইভার তাকে নিয়ে ছুটে হাসপাতালে। একমাত্র ছেলে তখন কক্সবাজারে। ছেলে বউ অন্য বাসায়। দুই মেয়ে প্রবাসে। মাহারা মেয়ে মেহেরের মা-বাবার তেমন কোন স্মৃতি নেই। জীবনের অন্তিম যাত্রায় শুধু গাড়ির শব্দ। আর ড্রাইভারের খালাম্মা ডাক। যৌবনের গ্রামের সশব্দ আনন্দ, পাকিস্তানের অফিসার্স ক্লাবের এলিট জীবন স্বাধীন বাংলাদেশের তড়িৎ প্রাচুর্য-সব ফিকে হয়ে আসল মেহেরের জীবনে। ড্রাইভার জানে ‘খালাম্মা’ নেই। তবুও শেষতক হাসপাতালে পৌঁছে। মেহের মৃত। জানাযা হবে। কবরস্থ হবে। ড্রাইভার ও অন্য চাকুরী নিবে। হয়তো সেখানে ও দেখবে গল্পের মতো কোন জীবন!
(সংগৃহীত)