• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫১ অপরাহ্ন |

দিনাজপুরের দলিত ও হরিজন সম্প্র্রদায়ের অমানবিক জীবনযাপন

Dolito Picমাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর : দিনাজপুরের হরিজন জনগোষ্ঠি তথা দলিত সম্প্রদায় অমানবিক জীবনযাপন করছে। কোন রকমের নাগরিক সুবিধা তারা পায় না। ক্ষুন্নিবৃত্তির কোন নিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ বলে তাদের জীবনে কিছুই নেই। সরকারী কোন সুযোগ-সুবিধাও তারা পায়না। সামাজিক বৈষম্য, বঞ্চনা, অস্পৃশ্যতা, ঘৃণা, সমাজ বিচ্ছিন্নতা, সমাজে মর্যাদাহীনতা, পেশাচ্যুতি, ভুমি দখল, অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা, রাষ্ট্রীয় পরিসেবা না পাওয়া ইত্যাতি এই জনগোষ্ঠির সার্বিক উন্নয়নে বাধার সৃষ্টি করেছে। ফলে সমাজের মূলস্রোতধারা থেকে তারা বিস্তর দুরত্বে অবস্থান করছে। সমাজের কাছে তারা অস্পৃশ্য অশুচি।
দিনাজপুরের ৪টি কলোনীতে বসবাস করে হরিজন জনগোষ্ঠির ৯২টি পরিবার। এই কলোনীগুলো হচ্ছে- বালুবাড়ী কলোনী, সিএস কলোনী (সদর হাসপাতাল সংলগ্ন), ষষ্টিতলা ও কাচারী কলোনী। এই কলোনীগুলো নির্মিত হয়েছে সরকারী খাস জায়গার তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেয়া অস্থায়ী ভিত্তিতে বসববাসের অনুমতি। সমাজে মর্যাদাহীন এসব পরিবারের রাষ্ট্রীয় পরিসেবা প্রাপ্তির পেছনে বিস্তর বাধা।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, সিএস (সদর হাসপাতাল সংলগ্ন) কলোনীতে ৭ ফিট ঢ ৮ ফিট মাপের একটি ঘর পরিবার পিছু বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই ঘরে কোনরকমে গাদাগাদি ও ঠাসাঠাসি করে থাকে ৭/৮ জন করে মানুষ। এখানে নেই কোন নাগরিক সুবিধা। বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদির কোন ব্যবস্থাই নেই।
দলিত ও হরিজন শিশুরা শিক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত। দিনাজপুর রামকৃষ্ণ আশ্রম পরিচালিত বালুবাড়ী সুইপার কলোনীতে অবস্থিত একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম “শ্রী রামকৃষ্ণ আদর্শ শিশু বিদ্যালয়।” এই বিদ্যালয়ে দলিত ও হরিজন শিশুরা পড়াশোনা করে। পঞ্চম শ্রেণির পর কোন স্কুলে তাদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সরকার ঘোষিত মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, এবং উচ্চতর স্তরের শিক্ষা লাভের কোন সুযোগ তাদের নেই। হরিজন ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষাভাতা বা শিক্ষা উপবৃত্তিও কোন কাজেই আসছে না। আর শিক্ষা না থাকায় তাদের মনে উচ্চাকাংখা জাগ্রত হচ্ছে না। সরকারের সেফটিনেট কমূসূচী যেমন-ভিজিএফ, ভিজিডি, বয়ষ্কভাতা, বিধুবাভাতা, একশ’ দিনের কর্মসূচী, প্রতিবন্ধিভাতা, মাতৃত্বকালিন ভাতা প্রভৃতিতে হরিজন জনগোষ্ঠির অন্তর্ভুক্তি শূন্যের কোটায়।
বিভিন্ন কারণে এই জনগোষ্ঠি তাদের পৈতৃক পেশা থেকে বিচ্যুৎ হচ্ছে। বিভিন্ন পেশায় যেতে না পারায় এই জনগোষ্ঠির বেকারের জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। রেল, পৌরসভা, হাসপাতালে দলিত বা হরিজন শ্রেণির সংরক্ষিত সুইপার পদে ইদানিং বেআইনীভাবে মুসলিম সুইপারদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এসব নিয়োগ প্রাপ্তরা এক হাজার-বারশ’ টাকার বিনিময়ে জাত সুইপারদের নিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। আর বেতনের সিংহভাগ অর্থ নিয়োগপ্রাপ্তরা হাতিয়ে নিচ্ছে। যার উদাহরণ দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালে বর্তমান ৪০টি জাত সুইপারের পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে মুসলিম সুইপারদের। এসব নিয়োগপ্রাপ্ত মুসলিম সুইপাররা এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশ’ টাকার বিনিময়ে জাত সুইপারদের দিয়ে সুইপারের কাজটি করিয়ে নেয়। আর মাস শেষে নিয়োগপ্রাপ্ত মুসলিম সুইপাররা পুরো টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
দিনাজপুরে কর্মরত বেসরকারী সংস্থা “গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের আলো প্রকল্পের সিবিও কমিটির সভাপতি রংলাল বাঁশফোড় জানান, দিনাজপুরের দলিত হরিজন শ্রেণির লোকজন কায়ক্লেশে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। দিনমুজুরি ছাড়া তাদের উপার্জনের অন্য কোন পথ নেই। এই দিনমুজুরিও ড্রেন ও নালা-নর্দমা পরিষ্কার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাদের নিজস্ব জায়গা-জমি বা আবাসস্থল না থাকায় শুকর পালনের কোন সুবিধাও তাদের নেই।
রংলাল বাঁশফোড় আরো জানান, ধর্মে তারা সনাতন (হিন্দু) হলেও সনাতন ধর্মের লোকেরাও তাদের এড়িয়ে চলেন। তিনি দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য খাসজমি বরাদ্দের দাবী জানান। তাদের শিশুদের শিক্ষার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে কোটা বরাদ্দ, সরকারের সেফটিনেট কর্মসূচীতে তাদের অন্তর্ভুক্তি, স্থায়ী চাকরীর ব্যবস্থা করার দাবী জানান। পাশাপাশি তাদের সম্পর্কে সমাজের অধিবাসিদের মনমানসিকতা পরিবর্তনের আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা অস্পৃশ্য অশুচি নই, এই বোধোদয় সমাজের মানুষের মধ্যে জাগ্রত না হলে আমরা এই দুরবস্থা থেকে নিস্তার পাবো না। তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
এ ব্যাপারে দিনাজপুর মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলের (বাংলা স্কুল) প্রধান মো. সমসের আলী বলেন, হরিজন ও দলিত সম্প্রদায়ের লোকজনের প্রতি এতো বৈষম্য কেন?। দেশের অন্যান্য নাগরিকদের জন্য অনেক সুযোগ থাকলেও হরিজন বা দলিতরা আজো বৈষম্যের শিকার। অথচ তারা আমাদের মতোই মানুষ। তারা কঠোর পরিশ্রম করে আমাদের বাসা-বাড়ী, রাস্তা-ঘাট, ড্রেন-নালা-নর্দমা পরিষ্কার করে প্রতিনিয়ত আমাদের উপকার করে থাকে। তাদের সন্তানরা সাধারণ ছেলে-মেয়েদের মত পড়ালেখার সুযোগ পায়না। একজন সুইপার মাত্র ৯শ’ টাকায় পৌরসভা ও অন্যান্য অফিসে কাজ করে। তা দিয়ে তাদের সংসারের খরচ যোগাড় করা কত যে কঠিন তা বলা বাহুল্য। তিনি এ অবস্থার উত্তরনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করেছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ