।। মুজম্মিল আলী ।। কথা দিয়ে কথা রাখা একান্ত অপরিহার্য – তা ক’ জনে বোঝে? কথা দিয়ে না রাখা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নামান্তর। যে কোন মানুষ প্রত্যাশা করে যে, তাকে যে কথা দিয়েছে সে তা পালন করবেই । কথা দিয়ে কথা রাখার উপর প্রত্যেক ধর্মেরই তাগিদ । যে তার কথামত কাজ করে,প্রত্যেকেই তাকে ভালবাসে । যে কথা রাখে না, সে সকলের ঘৃণার পাত্র হয় । যখন কেউ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তখন তার প্রতি মানুষের আস্থা সঙ্গত কারণেই হ্রাস পায় । তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধার বিলুপ্তি ঘটে । কারো প্রতি একবার শ্রদ্ধা- ভক্তি লোপ পেলে, তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে ওঠে ।
ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে প্রত্যাশা পূরণের এক অনন্য মাস। এ মাসেই আমাদের প্রিয় মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মাসটিকে সকলেই অধিকার প্রতিষ্ঠার মাস বলে গণ্য করে থাকে । কিন্তু, এবারের ফেব্রুয়ারিতে প্রত্যাশা ভঙ্গ হলো দেশের কয়েক লক্ষ এমপিও ভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর। এমনিতেই শুরু থেকে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলের বিষয়ে শিক্ষকরা অনেকটা হতাশার মধ্যে ছিলেন । স্কেল পাচ্ছেন কী পাচ্ছেন না, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বহু দ্বিধা- দ্বন্ধ ছিলো। স্কেল পেলে তা কখন পাবেন কিংবা কবে থেকে দেয়া হবে? – সে প্রশ্ন ও কুরে কুরে তাঁদের খেয়েছে অনেকদিন । অবশেষে নতুন স্কেলে অন্তর্ভুক্তি এবংজুলাই ২০১৫ থেকে তা কার্যকরের বিষয়ে তাঁদের সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্থ করা হলো । তাঁরা আশ্বস্থ হলেন এবং আস্থার সাথেই নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করে যাচ্ছিলেন ।
সর্বশেষ যে সন্দেহটি সকলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল, সেটি ছিল কবে অর্থাৎ কোন মাস থেকে তাঁরা নতুন স্কেলে বেতন পারেন? পরষ্পর দেখা হলেই একে অন্যকে জিজ্ঞেস করেছেন, কোন মাস থেকে নতুন স্কেলে বেতন পাওয়া যাবে? অবশেষে তাঁরা জানলেন যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন বকেয়া সহ নতুন স্কেলে পাবেন । স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রি মহোদয় মাদ্রাসা শিক্ষকদের এক সমাবেশে এ বিষয়ে আশ্বস্থ করায় সর্বশেষ সন্দেহটির অবসান ঘটে । আপামর শিক্ষক-কর্মচারী আশায় বুক বাঁধেন। নিজেদের হিসেব-নিকেশ নিজেদের মতো করে কষতে থাকেন। মহার্ঘ্য কেটে নিলে কতো থাকবে, বকেয়া কত টাকা আসবে, নতুন স্কেলে বেতন কত দাঁড়াবে ইত্যাদি নানা রকম স্বপ্নের ডালপালা বিস্তৃত হতে থাকে নিজেদের মনের আঙ্গিনায় ।
এমপিও ভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অনেককেই নানা কারণে দূর্গতির মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়। এমনিতেই বেতন ভাতা অপর্যাপ্ত। একজন সহকারি শিক্ষক বা প্রভাষক সাকুল্যে আর ক’ টাকা বেতন পান? এর ওপর স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা সহ অন্যান্য পোষ্য থাকে। কর্মচারীগণের বেতন তো আরো নগণ্য। প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ যা পান, তা ও তেমন মর্যাদার কাছাকাছি যায় না। তবে এ কথা সত্য যে, এবার একটা ভাল স্কেলে পড়েছেন তাঁরা সবাই। যদি বাড়ি ভাড়াটা অন্ততঃ ২০% দিয়ে শুরু করা যেতো।
এমন অনেক শিক্ষক-কর্মচারী আছেন, যারা কেবলমাত্র নিজের বেতনের টাকা দিয়েই সংসার নির্বাহ করেন। সন্তানের পড়ালেখার খরচ, বৃদ্ধ বাবা-মা’র চিকিৎসা ব্যয়, স্ত্রীর যৌক্তিক চাহিদা মিটিয়ে একজন শিক্ষক-কর্মচারীর হাতে মাস শেষে আর কোন অবশিষ্টই থাকে না। যুগ পাল্টেছে। এক সময় মোবাইল, বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি ছিল না। সময়ের প্রয়োজনে আজকাল এ জাতীয় অনেক ব্যয় বেড়েছে। টিভি, ইস্ত্রি, ফ্রিজ- এ সব না হয় বিলাস দ্রব্য বলে বিবেচিত। কতো ভাবে কতো ব্যয়ই না বেড়েছে আজকাল। একজন শিক্ষক কোনভাবে দূর্নীতির প্রশ্রয় নিতে পারেন না। তাঁর তো বাড়তি ব্যয় নির্বাহের অন্য কোন সুযোগ নেই, থাকলে ও তো শিক্ষক সে পথে যেতে পারেন না । সুতরাং বেতনই তাঁর একমাত্র সম্বল ।
কোন শিক্ষকই ভিন্ন গ্রহ থেকে আসেননি । পৃথিবীর আর দশজনের মতো একজন শিক্ষকের চাওয়া পাওয়া থাকবেই। তা খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বরং ক্ষেত্র বিশেষে শিক্ষকের চাহিদা বা জীবন যাত্রার ব্যয় অন্যদের চেয়ে খানিকটা বেশীই থাকে।
নতুন স্কেলে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ও বকেয়ার সংবাদে শিক্ষক-কর্মচারীরা নতুন আঙ্গিকে নিজেদের সাংসারিক পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। ফেব্রুয়ারিতে বকেয়াসহ নতুন স্কেলে বেতন পেলে সন্তানকে নতুন বাইসাইকেল কিংবা জামা কিনে দেবার, স্ত্রী বা স্বামীকে নতুন বেতনের একটা উপহার দেবার, ছোট ভাই কিংবা বোনকে একটা নতুন কিছু দেবার, দোকানীর বকেয়া পাওনা মিটিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি হয়তো কোন কোন শিক্ষক-কর্মচারী দিয়েই রেখেছিলেন।
কিন্তু, গত ক’ দিন আগে দৈনিকশিক্ষাডটকমে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন নতুন স্কেলে পাচ্ছেন না মর্মে খবর প্রকাশের পর সংশ্লিষ্টরা আশাহত ও মর্মাহত হয়েছেন। আশা ভঙ্গের বেদনায় তাঁরা সবিশেষ জর্জরিত আজ। যাদের তাঁরা কথা দিয়েছিলেন, তাদের মুখ দেখাবেন কী করে? খবরে ফেব্রুয়ারিতে বেতন না দিতে না পারার যে অজুহাত দেখানো হয়েছে, তা মোটে ও যৌক্তিক মনে হয়নি তাঁদের কাছে । তাঁরা অনেকেই এ খবরটি বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁদের বিশ্বাস, সরকার ঠিকই বকেয়া সহ নতুন স্কেলে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন দেবে। আবার, অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, যেহেতু নতুন স্কেলে বেতন ফেব্রুয়ারিতে পাওয়া যাচ্ছে না, সেহেতু তা আদৌ পাওয়া যাবে কিনা কিংবা পেলে আর কখন পাওয়া যাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। এ দুঃসংবাদটি অষ্টম পে-স্কেল সম্পর্কে তাঁদের পূর্বের সকল আশংকাকেই আবারো জাগিয়ে দিয়েছে ।
নতুন স্কেল নিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী ও সরকারের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্ঠি হউক-তা কারো কাম্য নয়। সম্ভব হলে বকেয়া সহ নতুন স্কেলে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনটা দিয়ে দিন। প্রয়োজনে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন আরো দু’ সপ্তাহ পরে দিন । কষ্ট করে হলে ও তাঁরা চালিয়ে নেবেন। দিবেনই যখন, তা হলে দিয়েই দেন না। কথা যখন দিয়েছেন, কথাটা রাখবার চেষ্টা করুণ।
লেখক : অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট।