সিসি ডেস্ক: নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের কিসামতডাঙ্গী চওড়া বালাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নন্দলাল রায় (৬৫)। তিনি ওই গ্রামে নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছেন ভাস্কর্য। ভাস্কর্যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের বর্বরতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এখন চলছে শেষ পর্যায়ের রংতুলির আঁচড়ের কাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, সনাতন চন্দ্র পালের (৩৮) নেতৃত্বে শুভচন্দ্র রায় (৩৬), নিতাই চন্দ্র পাল (৩৩), রতন চন্দ্র পাল (৩৭) ওই ভাস্কর্যগুলো তৈরি করছেন। কাজ প্রায় শেষ করে ভাস্কর্যে রংতুলির কাজ চলছে। এসব শিল্পী প্রায় ছয় মাস ধরে দৈনিক পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে কাজ করছেন।
ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে রয়েছে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের বর্বর নৃশংসতা, মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যাকশন, জঙ্গিবিমানের হামলা, নিরীহ বাঙালিদের ভারতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে ট্রেনে তুলে নৃশংসভাবে হত্যা, বাংকার থেকে মুক্তিযোদ্ধার পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশে গুলিবর্ষণ, আত্মসমর্পণের মুহূর্তসহ একাত্তরে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার ভাস্কর্য। পাশাপাশি স্থান পেয়েছে হিন্দুসম্প্রদায়ের চার যুগের ১০ অবতার ভাস্কর্য। এসব ভাস্কর্যে ব্যবহার করা হয়েছে আঁঠালো মাটি, খড়কুটো, জাল ও বাঁশ। পরে তা রোদে শুকানো হয়েছে। তারপর শুরু হয়েছে রঙের কাজ। আগামী ১০ এপ্রিল সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের মাসব্যাপী ওই ভাস্কর্যগুলোর প্রদর্শনীর উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
নন্দলাল রায় বলেন, তাঁর শুকনো পুকুরে এসব ভাস্কর্য সাজানো হয়েছে। ওপরে শামিয়ানা টানানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের প্রবেশের সময় মনে হবে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাচ্ছেন। ভাস্কর্যগুলোর প্রতিটিতে বর্ণনা থাকায় সহজে প্রেক্ষাপট বুঝতে পারবেন। ব্যক্তিগত অর্থে তিনি ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর সংসার। এক ছেলে ছাড়া সবার বিয়ে হয়ে গেছে। সামান্য জমিজমা ও পার্বতীপুর থেকে হাড় ভাঙা, মচকানোর তেল এনে হাটে হাটে খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করে তাঁর সংসার চলে। রাতে ভাস্কর্যগুলোর পাহারার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এতে খরচ কিছু বেড়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্মকে প্রকৃত ইতিহাস জানাতে ভাস্কর্যের মাধ্যমে তিনি তা করার চেষ্টা করেছেন। ভাস্কর্যের এই কাজটি দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে যাতে আসে, সে জন্য তিনি সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সৈয়দপুর উপজেলা কমান্ডের কমান্ডার একরামুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য নন্দলালের চেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এসব ভাস্কর্য চোখে দেখলে শিক্ষার্থীরা বইয়ে পড়ার চেয়েও বেশি মনে রাখবে বলে তিনি মনে করেন। মাসব্যাপী এই ভাস্কর্য প্রদর্শনী নানা প্রশ্নের জবাব দেবে। এ ছাড়া একই ইউনিয়নের বাসিন্দা নন্দলাল রায় কাজটি করছেন বলে গর্ববোধ করেন তিনি।
প্রথম আলো