সিসি ডেস্ক: এবার বাংলাদেশ থেকে কাতার এয়ারওয়েজে কার্গো নেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল যুক্তরাজ্য। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে গত দু’দিন ধরে কাতার বাংলাদেশ থেকে বিকল্প পথে কার্গো নিচ্ছে না। কাতার এয়ারওয়েজের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া বিমানে করে ঢাকা থেকে সরাসরি পণ্য নেয়া বন্ধের পর বিকল্প পথে কার্গো নেয়ার বিষয়ে কাতার এয়ারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল। দুটি এয়ারলাইন্সের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে অন্যান্য এয়ারলাইন্সের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কারণে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে পণ্য রফতানিতে ধস নামার আশংকা দেখা দিয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে সবজি, তৈরি পোশাক খাতে বছরে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হবে। শুধু সবজি খাতে বছরে ক্ষতি হবে কমপক্ষে ৫শ’ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ বিমান হারাবে বছরে ১শ’ কোটি টাকার রাজস্ব। একই সঙ্গে সারা বিশ্বে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সের উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে কার্গো পরিবহনে যুক্তরাজ্যের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। কাতার এয়ার পণ্য পরিবহনে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি না। তবে যুক্তরাজ্য থাইল্যান্ড থেকেও সরাসরি বিমানে কার্গো পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে।’
বাংলাদেশ বিমানের জিএম পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাতার এয়ারলাইন্স বিকল্প পথে যুক্তরাজ্যে কার্গো পরিবহন করছিল। যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার কারণে গত দু’দিন ধরে তারা বাংলাদেশ থেকে বিকল্প পথে কার্গো নিচ্ছে না।
বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল এলাইট প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কাতার এয়ারের অন্যতম সেলস এজেন্ট মনসুর আহম্মেদ বলেন, কাতার এয়ার গত দু’দিন ধরে তাদের কোনো ফ্রেইট ও শিডিউল ফ্লাইটে কার্গো নিচ্ছে না। এতদিন স্ক্যানিং ছাড়া তাদের পণ্য কাতার হয়ে সরাসরি যুক্তরাজ্যে যেত। এ কারণে এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে এই পণ্য কাতারে রি-স্ক্যান হলে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে বলে কাতার এয়ার থেকে বলা হয়েছে।
বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর সংগঠন বোর্ড অব এয়ারলাইন্স রিপ্রেজেনটেটিভের (বার) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, করণীয় চূড়ান্ত করতে শিগগির তারা এ বিষয়ে জরুরি সভা ডাকবেন। তিনি বলেন, স্ক্যানিং ছাড়া বাংলাদেশ থেকে বিকল্প পথে কার্গো পণ্য বহন সংশ্লিষ্ট দেশের বিমানবন্দরগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে যে কোনো সময় স্যাবোটাজেরও আশংকা থেকে যায়।
শনিবার সকালে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে এসিসি-৩ টিমের একমাত্র সদস্য জন অলিভার ঢাকায় পৌঁছেছেন। আগামী ১৬ মার্চ পর্যন্ত তিনি শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে টার্মিনাল দুটি পরিদর্শন করবেন। এ সময় গত ফেব্রুয়ারিতে দেয়া নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখবেন। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তাসংক্রান্ত মেশিনপত্র ও কার্গা কমপ্লেক্সে বহিরাগত কোনো লোক কাজ করছে কিনা এবং সিকিউরিটি মেশিন পরিচালনাকারী অপারেটরদের দক্ষতা সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। এ দলটি বাংলাদেশ বিমানের গুরুত্বপূর্ণ সনদসংক্রান্ত ‘এয়ার কার্গো সিকিউরিটি-৩ (এসিসি)’ ও ‘রেগুলেশন এজেন্ট-৩ (আরএ) অডিট করবে। কার্গো পরিবহন ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবা দিতে হলে বিমানের এই দুটি সনদ লাগবে। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর এই দুটি সনদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। শর্তসাপেক্ষে তিন মাসের জন্য বিমানকে এই দুটি সনদের সময় বৃদ্ধি করে ‘এসিসি-৩’ অডিট টিম। যার মেয়াদ ৩১ মার্চ শেষ হবে। ‘বার’-এর ওই কর্মকর্তা জানান, যদি কোনো কারণে যুক্তরাজ্য এসিসি-৩ ও আরএ-৩ সনদ নবায়ন না করে তাহলে বিকল্প পথেও তারা আর কার্গো পণ্য পরিবহন করতে পারবে না।
জানা গেছে, কাতার এয়ারলাইন্স বাংলাদেশ থেকে দু’ভাবে যুক্তরাজ্যে কার্গো পরিবহন করে থাকে। যুক্তরাজ্য সরকার এর একটি পন্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। দ্বিতীয় পন্থার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় দু-এক দিনের মধ্যে তারা ওই পন্থায় বাংলাদেশ থেকে কার্গো নেয়া শুরু করবে। সে ক্ষেত্রে তারা নিজস্ব স্ক্যানিং মেশিন ও এক্সপ্লোসিভ ডিটেকটর ট্রেস (ইডিটি) মেশিন দিয়ে কার্গো পণ্য স্ক্যান করে নিজ দায়িত্বে তারা ঢাকা থেকে কার্গো পাঠাবে যুক্তরাজ্যে। কার্গো পণ্য পরিবহনের জন্য ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের সঙ্গে তাদের চুক্তি আছে। আগে তারা বাংলাদেশ থেকে সব পণ্য নিয়ে কাতার বিমানবন্দরে রাখতেন। সেখান থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে যেত।
সূত্র জানায়, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট পরিচালনার সময় কার্গো পণ্য স্ক্যানিংয়ে নিজস্ব স্ক্যানিং ও ইডিটি মেশিন ব্যবহার করেছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তারা নিরাপত্তাসংক্রান্ত মেশিনটি কাতার এয়ারলাইন্সের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু অভিযোগ আছে, সিভিল এভিয়েশনের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কাতারকে সিকিউরিটি মেশিনটি খুব বেশি ব্যবহার করতে দেয়নি। সিভিল এভিয়েশনের নিজস্ব সিকিউরিটি মেশিন ব্যবহার করে তাদের পণ্য পাঠাতে হতো।
এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন শনিবার সকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অফিস করেছেন। আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিনি এখানে অফিস করবেন। শনিবার অফিস করার সময় মন্ত্রী বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন। তিনি স্ক্যানার, পণ্য শিপমেন্টের সিকোয়েন্স, রেক প্রভৃতি পর্যবেক্ষণ করেন। শিগগির কার্গোর রফতানি শাখায় বহিরাগত জনবল বাদ দিয়ে নিজস্ব জনবল নিয়োগের কথাও জানান।