• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩০ অপরাহ্ন |

কলকাতার স্টেট্সম্যান এবং পুলিশের বাঁশ দেয়া

5961_12।। শিতাংশু গুহ ।। কলকাতার বিখ্যাত স্টেটসম্যান পত্রিকা ৯ জুন ‘বাংলাদেশে ক্যানসার’ শিরোনামে এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, বিশ্বব্যাপী চাপে আইএস যখন সংকুচিত হচ্ছে, বাংলাদেশ তখন তাদের রমরমা অবস্থা। পত্রিকাটি বলেছে, বাংলাদেশে আইএসের উত্থান সিরিয়া বা ইরাকের মতই ভয়ঙ্করভাবে প্রাণঘাতী এবং এদের টার্গেট ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। এতে বলা হয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃখজনক সীমিত রেসপন্সের কারণে আইএস জনমনে এ ধারণা জন্মাতে সক্ষম হয়েছে যে, এই সরকার অক্ষম।

এ থেকে এ ধারণাও জন্মেছে যে, এই অযোগ্য সরকার যারা যেনতেন ভাবে ক্ষমতায় এসেছে এবং শান্তি বজায় রাখতে পেছন থেকে আইএসকে কৌশলগত সমর্থন দিচ্ছে। পত্রিকায় আরো বলা হয়, সরকার মানতে না চাইলেও এতে সরকারের স্থিতিশীলতা অনেক বেশি হুমকীর সম্মুখীন। প্রতিটি খুনের পর প্রশাসন ‘আইনশৃঙ্খলা’ পরিস্থিতির যে বয়ান দেন, সমস্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বিপদজ্জনক। এর মূলে রয়েছে ক্যানসার, আর চাপাতি হচ্ছে ধ্বংসের লক্ষণ।

পাঠক, সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান সরকারের বিপক্ষে এতটা কঠিন মন্তব্য কোনো মিডিয়া করেছে বলে আমার জানা নেই। তবে প্রায় একই সময়ে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, বাংলাদেশ সরকার জঙ্গিদের অবস্থান জানে। পরবর্তী প্রশ্নটি অতি সহজ, তাহলে ধরছে না কেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত বুধবার বেশ জোরের সাথেই বললেন যে, আমি সরকার প্রধান, আমার কাছে তথ্য আছে। এও বললেন, এরসাথে বিএনপি-জামায়াত জড়িত। পরদিন বেগম খালেদা জিয়া বললেন, গুম-খুনের সাথে আওয়ামী লীগ জড়িত। জঙ্গি দমনে মানুষ রাজনীতির গন্ধ পেলো। পুলিশ অপরাধী ধরতে তোড়জোড় শুরু করে দিলো। মধ্যখান থেকে শুক্রবার ভোরে বেঘোরে প্রাণ হারালো পাবনার হেমায়েতপুরের সৎসঙ্গ আশ্রমের সেবক নিত্যানন্দ পান্ডে। তাকে একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আইএস এ দায় নিয়েছে।

ক’দিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ কর্তাব্যক্তিরা এসব হত্যার সাথে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’র গন্ধ খুঁজে পেয়েছিলেন, আইএস তো আছেই। মোসাদ মধ্যপ্রাচ্যে একটি ভয়ঙ্কর নাম, কিন্তু এরা কবে থেকে যে বাংলাদেশে গরীব হিন্দু মারতে শুরু করে দিল, আমরা বুঝলামই না। মোসাদ ইসলামি জঙ্গিদের যম, এরা কখন বাংলাদেশে জঙ্গিদের সাথে মিলে জননেত্রীর ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার উত্খাতে নেমে পড়েছে আমাদের পুলিশমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ টেরই পেল না।

পুলিশ সুপারের স্ত্রী মিতু আক্তার নিহত হবার পর স্বভাবতই মানুষ ভেবেছে, এবার জঙ্গিরা টের পাবে! চাপাতির কোপ পড়েছে পুলিশের ঘাড়ে, আর যায় কোথা? কিন্তু পুলিশের মুখে যখন রাজনৈতিক কচকচানি শোনা গেল তখন বোঝা গেল, ‘কিচ্ছু হবে না’। তবে ৭ দিনের কর্মসূচি দিয়ে পুলিশ মাঠে নেমেছে, হাজার হাজার গ্রেপ্তার হচ্ছে, পুলিশের হাতে মরছেও কিছু, দেখা যাক এরপর কি হয়, নাকি বিরোধীদের মন্তব্য অনুযায়ী ওটা ‘গ্রেপ্তার বাণিজ্য’ কে জানে। মানুষের মনে এ প্রশ্নও জেগেছে, সরকার যদি জঙ্গিদের অবস্থান জানেই তবে এ ব্যাপক গ্রেপ্তার কেন, বেছে বেছে জঙ্গিদের ধরলেই তো পারে।

পত্রিকায় দেখলাম দেশে হিন্দুরা তাদের রক্ষায় মোইদর হস্তক্ষেপ চেয়েছে। আগেও যে চাইতো না তা নয়, তবে দেশের মাটিতে প্রকাশ্যে এই প্রথম। রানা দাশগুপ্তকে ধন্যবাদ। হিন্দুরা নিজদেশে যখন পরবাসী, নিজেদের সরকার যখন কিছু করছে না, তখন এছাড়া আর উপায় কি? পটুয়াখালীতে ট্রলারে তুলে মা-মেয়েকে ধর্ষণ করলো যুবলীগ নেতারা; ‘জমি নিমু, পারলে ঠেকা’; নিরীহ পুরোহিত হত্যা, এসব আর কতকাল সহ্য করা যায়? দেশের হিন্দুদের সহ্যের সীমা ভেঙে গেছে। হিন্দুরা কবে না ভারতের দিকে লং মার্চ শুরু করে দেয়!

এমনিতে এবার না পূজা করার জন্যে চারদিক থেকে আহ্বান আসছে। খবর বেরুচ্ছে, ঝিনাইদহ ও অন্যত্র হিন্দুরা দৈনন্দিন পূজা করতে ভয় পাচ্ছে। এমনিতে বাংলাদেশের হিন্দুরা বরাবরই ভারতের পানে চেয়েছিল, যদিও ভারত কখনো তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। সদ্য ঝিনাইদহ ও পাবনায় দুই হিন্দু পুরোহিত নিহত হলে ভারতীয় দূতাবাস কর্মীরা ওইসব এলাকা পরিদর্শন করেন। এটা নুতন ঘটনা এবং কিছুটা হলেও হিন্দুরা আশ্বস্থ হচ্ছে, আশার আলো দেখছে। এটা এক ধরনের চাপও, যা হিন্দুরা সবসময় চায়। কারণ তারা দেখেছে, রামুর ঘটনার পর জাপান ও শ্রীলঙ্কার চাপে সরকার দ্রুত সবগুলো মন্দির পুনঃনির্মাণ করে দিয়েছে। হিন্দুদের মন্দিরের ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত ওইরকম ঘটনা দেখা যায়নি।

সদ্য বিজেপি’র একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে হিন্দুদের বলে এসেছেন, দেশ ছেড়ে যাবেন না, ভারত আপনাদের পাশে থাকবে। এই আশ্বাস কি শুধুই কথার ফুলঝুড়ি? নাকি এবার সত্যি সত্যি ভারত সরকার এবার বাংলাদেশ সরকারের সাথে কথা বলবে? ফেসবুকে অসংখ্য আহ্বান আছে, ‘মোদি ঢাকার সাথে কথা বলুন’। ২০১৪ সালে আমরাও ভারতের রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করে অনুরোধ জানিয়েছিলাম, ‘দাদা, আপনার কন্যার সাথে কথা বলুন।’

হিন্দুরা সবসময় আওয়ামী লীগ সরকার চেয়েছে এবং ক্ষমতায় আনতে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। কিন্তু এ সরকারের কাছ থেকে যে নির্লিপ্ত ব্যবহার হিন্দুরা পাচ্ছে, তাতে তারা আশাহত। তরপরও হিন্দুরা কিন্তু বিএনপির দিকে তাকাচ্ছে না, হাত বাড়াচ্ছে ভারতের দিকে। কারণ বিএনপি বা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠিগুলোকে হিন্দুরা চিনে, চিনে দেশের মানুষ কারা ভালো, কারা ধর্মান্ধ। তবে বাংলাদেশে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক এবং এর জন্য শুধু বিএনপি-জামায়াত দায়ী নয়, আওয়ামী লীগও সমভাবে দায়ী।

সরকার যখন ৫শ’ মসজিদ বানানোর কথা বলেন, অথচ একটিও মন্দির তৈরীর কথা বলেন না, তখন সেটা হয়তো সাম্প্রদায়িক উসকানি। প্রশাসন যখন বলে ধর্মকে আঘাত করে কেউ খুন হলে সরকার দায়িত্ব নেবে না, তখন সেটা জঙ্গিদের উস্কে দেয়া হয় বটে। জঙ্গি প্রতিরোধে পুলিশ যখন হিন্দুদের মাঝে লাঠি ও বাঁশ বিতরণ করে, তখন সেটা হাস্যকর লাগে, বাঁশ দিয়ে কি গুলি থামানো যায়? নাকি মসজিদ থেকে মাইকে উত্তেজনা সৃষ্টি করা উত্তেজিত জনতাকে প্রতিরোধ করা যায়? তবে এটা ঠিক কখনো সখনো বাঁশ দিয়ে চাপাতি ঠেকানো যেতে পারে। অনেকদিন আগে ভারত থেকে কিছু বাঁশ এসেছিল, পত্রিকা তখন হেডিং করেছিল, ‘ভারত বাংলাদেশকে বাঁশ দিয়েছে’। এবারও কি একই কায়দায় বলা যায়, ‘পুলিশ হিন্দুদের বাঁশ দিয়েছে?’

হিন্দুরা ভারতের দিকে তাকালে কারো কারো মনে গোস্বা আসতেই পারে। কিন্তু এ কথাও মনে রাখতে হবে, একটি বিড়ালকে কক্ষের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে মারতে চাইলে বিড়ালটি পাল্টা আক্রমণ করতেও পারে। বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থা কি ওই বিড়ালের মত নয়? কে আছে দেশে হিন্দুদের পাশে? গুটি কয়েক সুশীল, যারা হিন্দুদের চাইতেও বেশি সংখ্যালঘু, ক্ষমতাহীন। আর গণজাগরণ মঞ্চের কিছু ঢাল নাই, তলোয়ারবিহীন তরুণ এবং কিছু সাংস্কৃতিক কর্মী। বাদবাকী যারা নিজেদের প্রগতিশীল ভাবতে পছন্দ করেন, তারা ‘ইন ডিপ হার্ট’ ভদ্র সাম্প্রদায়িক!

আমাদের এক সাংবাদিক বন্ধু প্রায়শ বলেন, জামায়াত-হেফাজত থেকে আমাদের ততটা ভয় নেই, কারণ ওদের আমরা চিনি বা ওদের চুল-দাড়িওয়ালা চেহারা দেখে আমার মেয়েটা ওদের সাথে চলে যাবে না। আমাদের ভয় আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মডার্ন ছেলেরা, যারা প্রেমপ্রেম খেলা করে আমার মেয়েটাকে ভাগিয়ে নিয়ে যায় এবং পরক্ষণেই ধর্মান্তরিত করে। আমদের দেশে এ দৃষ্টান্ত ওপরের তলায় খুব কম নহে। যাদের পরিবারে এমন ঘটনা আছে, তারা নিজেদের প্রগতিশীল ভাবার কোনো অবকাশ নেই।

গনিমতের মালের মতো হিন্দু রমনী ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ দেশে একটি মারাত্মক ব্যাধি। যারা এটি দেখেন না বা দেখতে চান না, তারা হিন্দুদের জমি দখল বা সহায়-সম্পত্তি দখলও না দেখার ভান করেন। গত ৮ বছরে যতগুলো এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে তারা প্রায় পুরোটাই তথাকথিত ভদ্র-সম্প্রদায়িকরাই করেছেন। অযথা এখন শুধু বিএনপি-জামায়াতকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, হিন্দুকে বাঁশ দিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-জাপা-হেফাজত-ওলামা লীগ-জাতীয় পার্টি সবাই ভাইভাই।

এখন অবশ্য বিএনপি হিন্দুদের পক্ষে কথা বলছেন। সেটা যতোটা না হিন্দুদের জন্যে তারচেয়ে অনেক বেশি আওয়ামী লীগ ঠেকাতে বা ভারতকে খুশি করতে। এরশাদ চাচাও এখন মাঝেমধ্যে হিন্দুর পক্ষে কথা বলেন। হিন্দুরা এদের চেনে এবং এখন আওয়ামী লীগকেও চিনছে। অবশ্য এখনো আমরা প্রায়শ শুনি বা বলি, ‘এতসবের পরও শেখ হাসিনাই একমাত্র ভরসা।’ এ আপ্ত্যবাক্য দিয়ে আর কতকাল চলবে? আর একদল মানুষ আছেন, যারা বলেন, জামায়াত-বিএনপি লাগবে না, শেখ হাসিনাই তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে দিচ্ছেন। এই দু’টি যুক্তির কোনটাই কি ফেলে দেয়ার মতো?

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে একথা ঠিক, কিন্তু দেশ তো যাচ্ছে সৌদি-আরব বা পাকিস্তানের দিকে! যারা বলেন, সৌদি আরব টাকা দেয়, তারা একটু হিসাব করে দেখুন, জাপানও অনেক টাকা দেয়, তাহলে আমরা সব জাপানপন্থি হয়ে যাই না কেন? ভ্রাতৃপ্রতীম দেশগুলো তো বসবাসের অযোগ্য, আমরা তাদের অনুসরণ করছি কেন?

সবশেষে একটি কথা বলা যায়, দিল্লীর কথা বাদ দেন, মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘুর জন্য যা করছেন, বাংলাদেশ একই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবেন না কেন?

উৎসঃ   বাংলামেইল

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ