।। চিররঞ্জন সরকার ।। জাসদের রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং সাবেক জাসদ নেতারা এই বিতর্কে জড়িয়েছেন। বিতর্কটি উস্কে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সমস্ত প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘এই দলের একজনকে আবার মন্ত্রিত্ব দেয়া হয়েছে, যার প্রায়শ্চিত্ত আওয়ামী লীগকে আজীবন করতে হবে।’ জাসদকে ‘হঠকারী’ সংগঠন আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাসদ নামক এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীরা সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে ভিন্নখাতে পরিচালিত করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যে- বাংলাদেশ যাতে কোনোদিনই একটি কার্যকরী রাষ্ট্র হতে না পারে
আকস্মিকই আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাসদ সম্পর্কে আপাত নিরীহ সৈয়দ আশরাফ এমন ‘মিঠেকড়া’ বক্তব্য কেন দিলেন-তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সৃষ্টি হয়েছে কৌতূহল। তবে কি ক্ষমতার রাজনীতির অন্দরমহলে অন্য কিছু ঘটছে? জাসদকে সাইজে রাখতেই এমন চপেটাঘাত? নাকি এর অন্য কোনো মাজেজা আছে?
একথা ঠিক, দেশের রাজনীতিতে জাসদের এখন আর তেমন গুরুত্ব নেই। কিন্তু অতীতের ছায়া এখনও তার পশ্চাদানুসরণ করছে। জাসদের ভ্রান্তি ও হঠকারিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে এক সময় ধ্বংসের যে বীজ বুনেছে, তার মহীরুহ এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ অতীতের ভ্রান্তির গুহা থেকে উঠে এসে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনীতির গণতান্ত্রিক মূলধারায় যুক্ত থাকার চেষ্টা করছে। আসম আবদুর রব এখনও জাসদ নাম ব্যবহার করছেন বটে, কিন্তু তার সঙ্গে সম্ভবত গুটিকয়েক লোক আছেন। রব এখন দিকভ্রষ্ট। অন্যদিকে
জাসদের এককালের তত্ত্বগুরু সিরাজুল আলম খান এখনও কাদের স্বার্থে, কাদের অর্থে লন্ডন-নিউইয়র্ক ঘুরে বেড়াচ্ছেন তা কেউ জানেন বলে মনে হয় না।
জাসদ সম্পর্কে বলতে গেলে আমার কেবলই মাহবুব ভাইয়ের (মাহবুব কামাল) লেখা চোখের সামনে ভেসে উঠে। তিনি একসময় জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। অসম্ভব প্রতিভাবান কিন্তু খেয়ালি এই মানুষটি দুর্দান্ত লেখেন। জাসদ নিয়ে মাহবুব ভাইয়ের লেখাই এখন পর্যন্ত আমার কাছে সেরা লেখা। জাসদকে জানার জন্য মাহবুব ভাইয়ের একটি লেখা সরাসরি উদ্ধৃত করছি।
‘‘জাসদওয়ালারা দেশের অনেক ক্ষতি করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় শুরু থেকেই তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একটি অংশ (অপেক্ষাকৃত মেধাবী অংশ) শাসক দল আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর নিরবচ্ছিন্ন বিরোধিতা অব্যাহত রাখে এবং এর একপর্যায়ে ’৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, সংক্ষেপে জাসদের জন্ম দেয়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা দেখে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, ছাত্রলীগের সেই অংশটি আগে থেকেই তেতে ছিল এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের।
জাসদ সৃষ্টির আগেই পল্টন ময়দানে আসম রব (তিনি জাসদের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন) ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রত্যাহার করে তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘শেখ মুজিব, বাচ্চা দিয়েছিস, দুধ দিবি না? তোর বাণ টেনে ছিঁড়ে দুধ বের করব।’
যাহোক, ছাত্রলীগের বিদ্রোহী অংশটি এবং তাদের মেন্টর সিরাজুল আলম খান, মার্শাল মনি, কাজী আরেফ প্রমুখ যে বঙ্গবন্ধুকে কোনো সময় না দিয়ে স্বাধীনতার পরপরই তার বিরোধিতা শুরু করলেন, তা নিশ্চয়ই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফল নয়। ব্যাপারটা এমন নয় যে, দেশ তো স্বাধীন হল, এখন কী করা? ঠিক আছে, চলো এবার আওয়ামী লীগ হঠাই। আসলে সিদ্ধান্তটি অনেক আগের অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অথবা তারও আগের। ষাট দশকের মধ্যভাগে উপরের ব্যক্তিবর্গ একটি নিউক্লিয়াস গঠন করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের এ অঞ্চলে একসময় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।’’
বাংলাদেশে যে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত শক্ত করা গেল না, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেল; উগ্র মৌলবাদী শক্তির অভ্যুত্থান ঘটল, তার জন্য স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের ত্রুটিবিচ্যুতি দায়ী তো বটেই, সবচেয়ে বড় দায়ী জাসদ এবং দলটির তখনকার নেতারা। দেশ স্বাধীন হয়েছে। অর্থনীতি বিপর্যস্ত। পাকিস্তান আমলের প্রশাসন দ্বারা দেশ চলছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মান্ধতার শিকড় তখনও বেঁচে বর্তে রয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দলের তখন উচিত ছিল সর্বশক্তি প্রয়োগে দেশ থেকে প্রতিবিপ্লব ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চারাগুলো শিকড়সহ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা। গণতন্ত্রকে দৃঢ়মূল করার চেষ্টা করা। সাম্প্রদায়িক দলগুলো তখন নিষিদ্ধ ও পরাজিত। এ সময় দেশকে নতুনভাবে গড়ার সুবর্ণ সুযোগ ছিল দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ও নতুন সরকারের সামনে। কিন্তু জাসদওয়ালাদের জন্য তা হয়নি।
মাহবুব কামাল জাসদের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‘ছাত্রলীগের তরুণ নেতৃত্ব ও তাদের মেন্টরদের দ্বারা জাসদ গঠন সদ্য স্বাধীন দেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি। এক. তারা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের এত দ্রুত বিরোধিতা আশা করেনি। বঙ্গবন্ধুকে তারা আরও সময় দিতে চেয়েছিল। তারা যে বঙ্গবন্ধুকে আরও সময় দিতে চেয়েছে, তার বড় প্রমাণ ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাসদ ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র দুটিতে জয়ী হতে পেরেছিল। আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল সম্ভবত ২৯৩টি আসন। দুই. জাসদের তরুণ নেতৃত্বকে মানুষ গ্রহণ করতে পারেনি। তারা ভেবেছে, তারুণ্য যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয়, রাজনীতির জন্য নয়।
জাসদ রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে মার্কসবাদকে গ্রহণ করেছিল, তবে দলটির নেতৃত্ব এই মতবাদকে আত্মস্থ করতে পারেননি। জাসদ নেতৃত্ব সম্ভবত দল গঠনের পরপরই তাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলো টের পেয়েছিলেন। আর তাই ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্যে তারা দুটি বাজে কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এর একটি- সিরাজুল আলম খানকে প্রচার-প্রাপাগান্ডার মাধ্যমে লিজেন্ডারি ফিগার বা কিংবদন্তি হিসেবে জাতির কাছে উপস্থাপন করা। অপরটি, গণকণ্ঠ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করে জাসদের পক্ষে সেনসেশনাল জার্নালিজম চালু করা।
সেনসেশনাল জার্নালিজম বলি আর ইয়েলো জার্নালিজম কিংবা প্যারা-জার্নালিজম যাই বলি, বাংলাদেশে এর শুরুটা করেছিল গণকণ্ঠ এবং হক কথা। জাতে ওঠার জন্য একসময় কবি আল মাহমুদকে গণকণ্ঠের সম্পাদকও বানানো হয়েছিল। বেচারা! শেষ পর্যন্ত জেলে গেলেন এবং জেল থেকে মুক্তি পেয়ে নিজ কৃতকর্মের অনুশোচনামূলক দীর্ঘ এক কবিতাও লিখেছিলেন। জাসদ-রাজনীতিকে বেগবান করতে গণকণ্ঠের সে কী প্রাণান্তকর চেষ্টা!
’৭২-’৭৫ সালে জাসদের কর্মীবাহিনী প্রতিদিন সকালে একবার করে উত্তেজিত হতো গণকণ্ঠ পড়ে আর স্বপ্ন দেখত রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের। বস্তুত, গণকণ্ঠ পত্রিকাটি তখন একটি সংবাদপত্র না হয়ে জাসদের লিফলেটে পরিণত হয়েছিল।
১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ জাসদ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাড়ি ঘেরাওয়ের কর্মসূচি পালন করে। সাধারণ মানুষের সমর্থনবর্জিত এ কর্মসূচিটি ছিল এক বড় রাজনৈতিক অ্যাডভেঞ্চার, চমক সৃষ্টিই ছিল যার একমাত্র উদ্দেশ্য। ওই কর্মসূচি চলাকালে মেজর জলিল, আসম রবসহ বেশকিছু জাসদ নেতৃত্ব গ্রেফতার হন। গুলিতে নিহত হন একাধিক জাসদকর্মী। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তার স্নেহভাজন নেতৃত্বের প্রতি এত বড় আঘাত আসতে পারে, জাসদ নেতারা সম্ভবত তা ভাবতেও পারেননি। এতদিন তারা বঙ্গবন্ধুর উদারতার সুযোগ নিয়েছিলেন, এখন কী করবেন? জাসদের একটা বড় অংশকে পাঠিয়ে দেয়া হল আন্ডারগ্রাউন্ডে। তত্ত্ব জাহির হল, আন্দোলনের গণতান্ত্রিক ধারার ছেদ ঘটিয়ে বিপ্লবী ধারার সূচনা করতে হবে। তৈরি হল গণবাহিনী। বলাবাহুল্য, জাসদের নৈরাজ্যজনক রাজনীতির মাত্রা ও পরিমাণ বাড়ল তাতে। বিপদ বাড়ল বঙ্গবন্ধু সরকারের।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুকে অনেকে বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করে কিছুদিনের জন্য হলেও দেশ পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। গণতন্ত্রের পক্ষে আজন্ম সংগ্রামী তিনি তাদের কথা শোনেননি, দেশে গণতান্ত্রিক ধারাই চালু করেছিলেন। অথচ তার শুভ চেতনার মূল্য দেয়নি জাসদ। চালু করেছিল অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক, অস্ত্রের রাজনীতি। সদ্য স্বাধীন দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা গেলে আমরা হয়তো আরও অন্তত ৩০ বছর বঙ্গবন্ধুকে আমাদের সঙ্গে ধরে রাখতে পারতাম।
বঙ্গবন্ধু হত্যা ও ’৮০ সালে জাসদ ভেঙে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়টি ছিল জাসদের হঠকারিতার দ্বিতীয় অধ্যায়।
জাসদের জন্ম কোনো ঐতিহাসিক প্রয়োজনে হয়নি। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই ’৮০ সাল থেকে জীববিজ্ঞানের মাইটোসিস প্রক্রিয়ার কোষ-বিভাজনের মতো জাসদের ভাঙন প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারা নিজ অনুসারীদের নিয়ে উপদল তৈরি করে একের পর এক ভেঙেছেন দল।
জাসদের সৃষ্টি ঐতিহাসিক প্রয়োজনে না হলেও এর বিলুপ্তি এখন এক বড় ঐতিহাসিক প্রয়োজন।’’(অনাবশ্যক সৃষ্টির অনিবার্য বিলুপ্তি, যুগান্তর, ২৬ আগস্ট, ২০১৪)।
অপর এক লেখায় মাহবুব কামাল বলেছেন, ‘‘এরশাদের আমলে রবের নেতৃত্বাধীন জাসদকে দেখেছি সম্পূর্ণ অচেনা চেহারায়। আর এখন তো ইনু ভাইয়ের জাসদ পাল্টে ফেলেছে খোলনলচেই। কিন্তু পুনর্জন্ম হলে কী হবে, ৭২-৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে ইরিটেট ও যুবসমাজকে বিপথগামী করার পাপ মোচন হয়নি। এ যে জন্মের পাপ, শত জন্মান্তরেও তার মোচন হয় না।’’ (কতবার পুনর্জন্ম হল, পাপমোচন হল না জাসদের, যুগান্তর, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)
একজন সাবেক কর্মীর এই মন্তব্যের পর জাসদ সম্পর্কে আর কোনো কথা চলে কী?
chiroranjan@gmail. com
উৎস: পরিবর্তন