• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩২ অপরাহ্ন |

স্মরণের আবরণে মরহুম আলীম উদ্দিন

Alim Sir।। মোঃ সাহবাজ উদ্দিন সবুজ ।।
জানালা আর প্রাচীর টপকিয়ে সকালের রোদ এসে খেলছে ছিমছাম বসার ঘরে। নান্দনিকভাবে সাজানো-গোছানো পরিপাটি বসার ঘরটিতে ঢুকলেই মনে হতো, এখানে বই আর ছবির সঙ্গে বাস করেন একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ। বাইরে থেকে ডোরবেল বেজে উঠলে কখনো কখনো যিনি নিজেই দরজা খুলে দিয়ে মায়াময় সুরে আহ্বান জানাতেন তাঁর বসার ঘরে আসন নেয়ার জন্য। গায়ে থাকত সফেদ পানজাবি, চমৎকার সুতির লুঙ্গি আর চোখে চশমা। ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে নিজ হাতে সরিয়ে দিতেন জানালার সাদা পর্দা। কাজের মেয়েটিকে নরম করে ডেকে বলতেন, শোনো, এখানে দু’কাপ চা দাও সঙ্গে মিষ্টি এবং অন্য কিছু। তারপর বলতেন, বলো কেমন আছো? ৭০ বছর বয়স অতিক্রম করে যখন একজন মানুষ এমন স্নেহ-আচরণ করেন,তখন আপনি তাঁর সম্পর্কে ভালোবাসার শব্দ আর কতটুকুইবা গাঁথবেন? তিনি আমার শ্রদ্ধাভাজন মরহুম আলিম এমপি। যিনি ছিলেন অসাধারণদের মধ্যে এক সাধারণ মানুষ। নম্র, ভদ্র, বিনয়ী, নরম সুরের দলখোলা, অতিথিপরায়ণ মানুষ। যাঁর কোনো রাগ, বিদ্বেষ, অভিমান,উত্তেজনা ছিল না। আমি উনার নাতির বয়সের হলেও উনার আমার সম্পর্ক ছিল অসাধারণ। সব সময় জ্ঞান-গরিমা, মনন মেধা, প্রজ্ঞা-পাণ্ডিত্য, অনুভূতি- অনুরাগ, বিবেক-বুদ্ধির কথাই বলতেন পৃথিবীর মায়া ত্যাগকারী প্রিয় এ মানুষটি। যিনি মনে আদর্শ বাংলাদেশের ছবি আঁকতেন। অসাধারণ স্বাপ্নিক এই মানুষটি গত বছরের এইদিনে (১৮ আগস্ট) সাত সকালে চলে গেলেন অনন্তের পথে। যে পথ থেকে তিনি ফিরবেন না আর কোনো দিন…কেউ কি ফিরতে পারে সেই পথ থেকে? পিতৃতুল্য অভিভাবক, আমার শ্রদ্ধেয় মোঃ আলীম উদ্দিন আপনি সৃষ্টিকর্তার ডাকে জগত মায়া ছেড়ে পাড়ি জমালেন- মেঘের ওপারে আসল ঠিকানায়। জানি প্রকৃত ওই জীবনে
আমাদের সকলকেই একদিন পাড়ি জমাতে হবে। অনেক দিন যাইনি সেই বই আর ছবির ঘরে। স্যারবিহীন ওই অতিথি কক্ষে আর যাওয়া হবে কি না, তাও জানি না। স্যারের শূন্য শূন্য শূন্য ঘরটিতে বাতাসেরা খেলবে আগের মতোই। রোদেরা পাতবে বিছানা ঠিকই। কিন্তু স্যারকে পাব না ঘরে, একান্ত জ্ঞানগর্ব আলাপচারিতায়। এ পৃথিবীতে আমাদের আগমন ক্ষণিকের জন্য। সময় ফুরিয়ে গেলে সকলকেই চলে যেতে হবে না ফেরার দেশে। কেউই এখানে স্থায়ী নয়। তবে আমাদের কর্ম দীর্ঘদিন আমাদেরকে মানুষের অন্তরে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, যদি সে কর্ম মানবতার কল্যাণধর্মী হয়ে থাকে। বিশ্বের অসংখ্য মানুষ তাঁদের কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ অনন্তকাল মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবেন। পুষ্প নিজের জন্য ফুটে না, পরের জন্য নিজের সৌরভ ছড়িয়ে দেয়। মানবজাতির কেউ কেউ তেমনি নিজেকে ফুলের মত মানবের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। নিজের কর্মনিষ্টা, মায়া-মমতা দিয়ে ছায়ার মত পাশে থেকে ঠাই করে নেন সকলের মনে। তেমনি এক ক্ষনজন্মা পুরুষ ছিলেন আলীম উদ্দিন। সৈয়দপুর থেকে নিজের অসাধারণ যোগ্যতা ও দক্ষতার ফলে পরিণত হয়েছিলেন জাতীয় নেতায়। তৃণমুল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কর্মীদের অতি আপনজন ছিলেন তিনি। উনার সাথে প্রথম সাাতে মনে হল যেন শত বছরের পরিচিত কোন অভিভাবক। তিনি আজ আর বেঁচে নেই। নির্লোভ সাদাসিধে জীবন কাটিয়ে দল, মত নির্বিশেষে সকলকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন তিনি। তাঁর জানাজায় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে তিনি আছেন গনমানুষের মনের মণিকোঠায়। আপনি থাকবেন আজীবন।

(লেখকঃ তরুণ সাংবাদিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র এবং মরহুমের স্নেহনেষু)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ