মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর: ইয়াসমীন ট্রাজেডির ২১তম দিবসকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক এই আন্দোলনের সুচনাকারী নেতা বর্তমান এমপি মনোরঞ্জন শীল গোপাল বলেন, আন্দোলনটা আমরা শুরু করেছিলাম। দিনাজপুরের আপামর জনতা আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌছায়। অবশ্য ইয়াসমীন হত্যার বিচার পেতে আন্তরিকভাবে আইনী সহায়তা করেছেন দিনাজপুরের প্রবীণ রাজনীতিক সাবেক সাংসদ এ্যাডঃ আব্দুর রহিম।
সাক্ষাৎকারে ইয়াসমীন আন্দোলনের প্রথম প্রতিবাদকারী ও আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বর্তমানে দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল বলেন, সে সময়ের গণঅভ্যূত্থান অন্ততপক্ষে সমগ্র বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, দিনাজপুরের মানুষ মর্যাদা রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে পারে।
তিনি বলেন, ইয়াসমীন আন্দোলন বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ছিলনা। এ আন্দোলন ছিল সমগ্র দিনাজপুরবাসীর আন্দোলন। যার কারণে তদানিন্তন সরকার বাধ্য হয়েছিল জনতার দাবী মেনে নিতে। যদিও তারা দাবীগুলো বাস্তবায়ন করেনি। ৮ দফা দাবী মেনে নিয়ে তৎকালীন সরকার প্রধানের প্রতিনিধি তদানিন্তন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী প্রয়াত কর্ণেল আকবর হোসেন এসে সমঝোতা করতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ শিক্ষা নিয়েছে বোনের, মায়ের স¤্রম কিভাবে রক্ষা করতে হয়। আমরা সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি উদাহরণ।
আন্দোলন সুচনালগ্নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি দশমাইলে প্রথম শোনার পরে দশমাইলের সাহসী মানুষদের নিয়ে প্রথম প্রতিবাদ সমাবেশ করে এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করি। সেই সভাতেই ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেয়া হয়-এর মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতার করার দাবী জানানো হয়। কিন্তু তদানিন্তন পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপকৌশল অবলম্বন করলে এবং আমাকে ব্যক্তিগতভাবে হুমকি-ধমকি প্রদান করলে আমরা দিনাজপুরের মানুষ হিসেবে বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহন করি।
আন্দোলনের সফলতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য গোপাল বলেন, আমরা আন্দোলনে সফলতা অর্জন করেছি। এই আন্দোলন একটি মাইলফলক। আমরা দিনাজপুর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি-দিনাজপুরের সম্মান মর্যাদার জন্য কিভাবে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
বিচার বিষয়ে জানাতে চাইলে তিনি জানান, আমরা বিচার পেয়েছি। বিচারের রায়ে ৩ অপরাধীর যথার্থ শাস্তি হয়েছে। এ বিচারের বিষয়ে আইনী সহায়তা দিতে যিনি অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি হলেন সংবিধান প্রনেতা সাবেক সাংসদ এ্যাডঃ আব্দুর রহিম। দিনাজপুর জেলা দায়রা জজ আদালত থেকে মামলাটি রংপুর দায়রা জজ আদালতে নিয়ে যাওয়া হলে প্রতি নিজ উদ্যোগে তিনি উপস্থিত থাকতেন। বিচারিক বিষয়ে এম আব্দুর রহিমের প্রতি দিনাজপুরবাসী কৃতজ্ঞ।
ইয়াসমীন আন্দোলনের পরবর্তী সময় একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে আন্দোলনের সুচনাকারী নেতা হিসেবে আপনার নাম নেই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটাও একটা ইতিহাস। দিনাজপুরবাসী জানে-কারা আন্দোলন করেছিল। ইতিহাস বিকৃতি করে প্রকৃত ইতিহাসকে দাবিয়ে রাখা যায় না। একদিন সত্য প্রকাশ পাবেই। তাছাড়া দিনাজপুরবাসী তো জানেই।
আন্দোলন পরবর্তী সময়ে সরকারের কি ভূমিকা ছিল এর উত্তরে তিনি বলেন, বিএনপি-জামাত জোট সরকার কথা দিয়ে কথা রাখেনি। তারা ৮ দফার ভিত্তিতে সমঝোতা করলেও একটি শর্ত তারা পূরণ করেনি। ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রথমেই জনতার উপরে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করে অপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেন। যার প্রেক্ষিতে অপরাধীরা যথার্থ শাস্তি পেয়েছে। মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ১৩টি মামলা হয়েছিল জনগনের বিররুদ্ধে। যার মধ্যে ৯টিতে আমাকে আসামী করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, আন্দোলনে আমাদের অর্জন থাকলেও কিছু ব্যর্থতার মধ্যে আমরা এখনো ক্ষতিগ্রস্থ-নিহতদের পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিলেও যথারীতি পূণর্বাসন করা সম্ভব হয়নি। আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে- সারা দেশে ২৪ আগষ্ট নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। ইয়াসমীন এখন সারা বিশে^ নারী নির্যাতন প্রতিরোধের একটি প্রতীক। তার মানে আমরা বলছি না যে, এখনও সে ধরণের ঘটনা ঘটে না।
ধর্ষন-হত্যা ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের করনীয় কি এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আইন দিয়ে ধর্ষণ-হত্যা ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করা সম্ভব না। তাই সামাজিক আন্দোলন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ইয়াসমীন আন্দোলনের সার্বিক সফলতা বা আমাদের অর্জন সম্পর্কে মনোরঞ্জন শীল গোপাল বলেন, অর্জন তো অবশ্যই আছে। আমরা মেয়েদের সম্মান রক্ষার জন্য একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। এ দৃষ্টান্ত আগামী দিনের পাথেয় হবে। শুধু তাই নয়, দিনাজপুর এখন ইয়াসমীন এখন নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রতীক হিসেবে সারা বিশে^ পরিচিত একটি নাম। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদকারী হিসেবে দিনাজপুর জেলার মানুষের মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই আন্দোলনের আপনার জীবনের কোন ঝুঁকি ছিল কি না শেষ এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তদানিন্তন সরকারের মদদপুষ্ট বিপদগামীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি, ঝুঁকি তো থাকবেই। সে সময় আমাদের সুযোগ মত পেলে হয়তো হত্যা করা হতো। কিন্তু দিনাজপুরের প্রতিবাদি মানুষ সেই সময়ে বিএনপি সরকারের সকল ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে দিয়েছে। দিনাজপুরের মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে আমরা শান্তিপ্রিয় কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদকারী।