• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪০ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
“ভালো থেকো আমার না হওয়া মহারানী” চলন্ত ট্রাকে আড়াই ঘন্টা ঝুলে ৩২ লাখ টাকার ইয়াবা জব্দ করলেন সিপাহি জয়পুরহাট রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দিনব্যাপী কর্মশালা শুরু দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪ ড্রাম ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহি বাসের ধাক্কা, নিহত ৩ সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার

নজরুলের দ্রোহের চমক এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা

নজরুল।। হোসেন মাহমুদ ।। দ্রোহের চমক ও সঙ্গীতের সুরে বাঙালিকে বিস্ময়-বিমুগ্ধ করে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্থান করে নেন কাজী নজরুল ইসলাম। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে ( ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার এক শরীফ অথচ অতি দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। অতি সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে তার বেড়ে ওঠা। শৈশবে স্বপ্নময় কোনো পৃথিবী তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছিল কি না তা জানা যায় না। প্রকৃতির কোলে স্বাভাবিক নিয়মেই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। সেখানে চাঁদ, সূর্য, আকাশ, বাতাস, মাটি, বৃক্ষ-লতাসহ অবারিত প্রকৃতিকে নিজের করে পেয়েছেন। বলা যায়, সরাসরি প্রকৃতির কাছ থেকেই জীবনের প্রথম পাঠ নিয়েছেন তিনি। আর এর মধ্যেই, সেই কচি বয়সেই কখন যে তিনি জড়িয়ে গেলেন জীবনের কঠোর-কঠিন জটাজালে, তা নিজেও জানেন না। মক্তবে পড়া শেষে সেখানেই আবার খুদে শিক্ষক হন (১৯০৮)। ক’দিন পর হাজী পালোয়ানের মাজারে খাদেমের কাজ করেন। তারপর করেন মসজিদের মুয়াজ্জিনের কাজ। এরপর যোগ দেন লেটোর দলে। গ্রাম্য কবিয়ালদের সঙ্গে কবিগানের আসরে নিজের প্রতিভার দ্যুতি ছড়ান। পরে জড়িয়ে যান যাত্রাদলের সঙ্গে। যাত্রা ও পালা রচনায় ঈর্ষণীয় ক্ষমতার পরিচয় দেন ওই বয়সেই। হঠাৎ করেই তার জীবনের এ অধ্যায়ের সমাপ্তি সূচিত হয়। কবি ফিরে আসেন স্কুলে। কিন্তু ক’দিন মাত্র। আবার গিয়ে যোগ দেন এক কবিয়ালের দলে। সরে গেলেন সেখান থেকেও। এক রেলওয়ে গার্ডের বাসায় কিছু দিন খানসামার কাজ করলেন। এবার গিয়ে কাজ নেন আসানসোলের এক রুটির দোকানে। রুটি বানানোর কাজ। মোটেই কোনো মর্যাদাজনক কাজ নয়। কিন্তু তা তার কাছে কোনো বিষয় ছিল না। জানাজানি হয়ে গেল, এ বালকটি কোনো সাধারণ ছেলে নয়। একদিন চোখে পড়ে গেলেন দারোগা কাজী রফিজউল্লাহ্র। তিনি তাকে নিয়ে গেলেন নিজের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুরে (১৯১৪)। সেখানে আবার স্কুলে। নিজের মেধা দিয়ে শিক্ষকদের চমৎকৃত করেন তিনি। চুরুলিয়া ও দরিরামপুরের প্রকৃতি-পরিবেশ পৃথক। নিজ এলাকা বর্ধমানের লাল মাটির রুক্ষ পরিবেশ ও গাছপালার ফিকে সবুজের বদলে দরিরামপুর তথা ময়মনসিংহ তথা পূর্ব বাংলার নরম-সরস মাটি ও গাঢ় সবুজ-শ্যামলিমা নজরুলের চোখে মায়ার অঞ্জন বুলিয়ে দিয়েছিল। বছরখানেকের কিছু বেশি সময় ছিলেন সেখানে। তারপর উড়াল দিলেন। তিনি আর কখনো দরিরামপুরে পা রাখেননি, কিন্তু মধুর স্মৃতি বোধহয় সারা জীবনই তাকে ঘিরে ছিল। আর সে কারণেই এর বহুদিন পর কলকাতায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদের বাড়ি ওই অঞ্চলে জেনে তিনি আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। যা হোক, নিজ গ্রামে ফিরে এসে এক পরিচিত লোকের সহৃদয়তায় গিয়ে ভর্তি হলেন রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে। সেখানে ভালো ছাত্র হিসেবে আবার তার কদর জুটল। রানীগঞ্জে এসে তিনি বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে (পরবর্তীকালে প্রখ্যাত লেখক ও চলচ্চিত্রকার)। প্রবেশিকা পরীক্ষার দ্বারপ্রান্তে ছে নিয়তির সচল চাকা এবার তাকে ঠেলে নিয়ে গেল আরেক জগতে। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হলেন নজরুল (১৯১৭)। কেন, তার সঠিক ব্যাখ্যা নেই। হতে পারে দারিদ্র্য আর ভ্রাম্যমাণ জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন তিনি। পড়াশোনা তাকে আর ধরে রাখতে পারছিল না। হতে পারে অজানা জীবন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। এও হতে পারে যে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাঙালি তরুণ-যুবকদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য সরকারি উদ্যোগে যে ব্যাপক প্রচারণা চলছিল তাতে আকৃষ্ট হয়েই তিনি সেনা দলে নাম লেখান। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। তা হলো বাড়ির প্রতি সম্ভবত তার তেমন কোনো আকর্ষণ ছিল না। খ্যাতি ও প্রভাব যখন তার হাতে রাখী বেঁধে রেখেছিল তখনো তার মধ্যে নিজ জন্মভিটা বা জন্মভূমির মাটির প্রতি যেমন দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায় না তেমনি তার সাহিত্যেও তা প্রভাব ফেলেনি বলেই দেখা যায়। নজরুলের মতো অসম্ভব সংবেদনশীল মানুষের বেলায় বিষয়টি বেশ আশ্চর্যই মনে হয়।
সৈনিক জীবন তাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। তিনিও সেখানে ঠিকই ছুঁইয়ে দিয়েছিলেন পরিবর্তনের জাদুর কাঠি। বিশ্বসেরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কঠোর-কঠিন নিয়ম-কানুনের মাঝে সৃষ্টি করেছিলেন আনন্দ-হাসি-গানের একটুকরো পৃথিবী। নইলে কেউ কখনো শুনেছে যে সেনা ব্যারাকে সন্ধ্যার পর জমে ওঠে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানের আসর! ভেসে আসে অদম্য প্রাণচাঞ্চল্যের উচ্ছ্বাসমাখা কোরাস_ ‘দে গরুর গা ধুইয়ে!’ সমগ্র বিশ্বের সেনাবাহিনীতেই এ ছিল এক অকল্পনীয় ঘটনা। শুধু নজরুল বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। তার অসাধারণ প্রতিভা ও প্রাণশক্তিই তাকে এ সাফল্য এনে দিয়েছিল। তিনি বলেই এত দ্রুত এবং ঈর্ষণীয়ভাবে তিনটি পদোন্নতি (সাধারণ সৈনিক থেকে ল্যান্স নায়েক, ল্যান্স নায়েক থেকে নায়েক, নায়েক থেকে হাবিলদার) পেয়েছিলেন। সৈনিক জীবনের প্রায় বছরতিনেকে (জুন-জুলাই, ১৯১৭-মার্চ-এপ্রিল, ১৯২০) তিনি চেতনায়-মননে বিপুলভাবে ঋদ্ধ হয়ে উঠলেন। পেলেন লালিত্যময় ফারসি সাহিত্যের মধুর স্বাদ, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সংঘটিত দুনিয়াকাঁপানো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের খবরও কোন রন্ধ্রপথে সেই কঠোর নিয়ন্ত্রণাধীন সেনাশিবিরে কীভাবে যেন প্রবেশ করে তাকে আলোড়িত করল। অন্যদিকে উন্মুক্ত হয়ে যায় সৃষ্টির উৎসমুখ, বেরিয়ে আসছিল নতুনত্বের স্বাদমাখা গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ। অচিরেই পল্টন ভেঙে দেয়া হলে ফিরে আসেন নজরুল, অবস্থানস্থল হয় কলকাতা, শুরু হয় তার জীবনের নতুন অধ্যায়। সে অধ্যায় প্রবল আত্মপ্রকাশের, ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে তোলার, সাহিত্য-সাংবাদিকতা-সঙ্গীতের জগতে নতুন প্রাণপ্রবাহ বইয়ে দেয়ার।

দ্রোহের ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে নজরুল বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের দরজা খুলে দিলেন, নতুন ধারার সৃষ্টি করলেন, বইয়ে দিলেন ভাবের নতুন জোয়ার। কী দুর্দম তার প্রাণাবেগ, কী প্রবল তার খরস্রোত! এতদিনের আটকে থাকা_ কালের পুরনো, চাপধরা বাতাস নতুন বাত্যাবেগে কোথায় মিলিয়ে গেল। তরতাজা প্রাণের তীব্র আবেগে তরুণ-যুবকেরা গেল ভেসে। তাদের কানে শুধু ভাসতে লাগল_ ‘অরুণ প্রাতের তরুণ দল চল্রে চল্রে চল্’। ব্রিটিশ শাসনের নিষ্পেষণে অবদমিত গোটা বাঙালি জাতির কাছে সেদিন নজরুল হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামের অগি্নময় অনুপ্রেরণা। নজরুল বেঁধেছিলেন অাঁধারে অগি্নসেতু আর দুর্দিনের দুর্গশিরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বিজয় কেতন। এ ক্ষেত্রে তার কোনো তুলনা নেই।
নজরুল আর কারোর মতো ছিলেন না। গড্ডলপ্রবাহে গা ভাসানোর মানুষও ছিলেন না তিনি। উমেদারি, তাঁবেদারি ছিল তার স্বভাব-চরিত্রের দিগন্তরেখার বাইরে। প্রবল ক্ষমতাশালী ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝা-া ওড়াতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। তার বুকের ভেতরে টগবগ করে ফুটছিল আগ্নেয়গিরি, যেন অপেক্ষা করছিল অগ্ন্যুৎপাতের। অকস্মাৎ আগ্নেয় বিস্ফোরণে চারপাশ কাঁপিয়ে দিলেন তিনি। এমন চোখধাঁধানো ঝলকানি কেউ কোনো দিন দেখেনি। এ পর্যায়ে তার পরিচয় হয়ে উঠল ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবে। ভারতবাসীকে পরাধীন করে রাখা, তাদের ওপর অন্যায়-শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে_ বঞ্চিত-লাঞ্ছিত মানুষের অধিকারের পক্ষে_ ব্রিটিশ শাসকের শাসন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছিল তার বিদ্রোহ। সত্য-সুন্দরের অনুসারী, মানুষের কবি, মানবতার পূজারি নজরুল ক্ষোভ, ক্রোধ ও প্রতিবাদে ঝলসে উঠলেন খাপখোলা তলোয়ারের মতো। তার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো সাত সাগরের গর্জন, ঘূর্ণির প্রবল বেগ তার মধ্যে সঞ্চারিত করল দুর্নিবার গতি, দুর্দমনীয় ঝঞ্ঝা এনে দিল তার মাঝে অপরিমেয় শক্তি ও সাহস। বিস্ময়ে অবাক ও শিহরণে রোমাঞ্চিত হতে হতে মানুষ শুনতে লাগল বজ্রে বেজে চলেছে বাঁশি_ ‘বল বীর চির উন্নত মম শির/শির নেহারি নতশির ঐ শিখর হিমাদ্রির’।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সেনাবাহিনীতে প্রায় তিন বছর কাটিয়ে আসা নজরুল স্বভাবে ছিলেন উদার, নিঃস্বার্থ, মিশুক। খোলা আকাশের নিচে লাখো-কোটি মানবসন্তানের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দেয়াল তুলে চারপাশের জনসমাজ থেকে আলাদা করে ফেলেননি নিজেকে। সেনাবাহিনী থেকে ফিরে সাহিত্য-সাংবাদিকতায় পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন। মানবিকতার মহান বোধ তাকে মানুষ হিসেবে উঁচু দরজায় স্থাপন করেছিল। ধর্ম-বর্ণ নয়, মানুষই ছিল তার কাছে বিবেচ্য। নিচুতলার মানুষের প্রতি ছিল তার বুকভরা মমতা-ভালোবাসা। তারা সব ক্ষেত্রেই বঞ্চিত-লাঞ্ছিত-নিগৃহীত, ভীষণভাবে অত্যাচারিত। সচেতন নজরুল তীক্ষ্ন দৃষ্টি মেলে দেখেছেন সেই অত্যাচারের স্বরূপ এবং তাকে তুলে ধরেছেন তার অবিস্মরণীয় কাব্য পঙ্ক্তিতে_ ‘সেদিন দেখিনু রেলে/কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে’। শুধু স্বদেশের মানুষ নয়_ বিশ্ব মানুষ, বিশ্বমানবতার কবি ছিলেন তিনি। আর তাই তিনিই একমাত্র কবি যিনি বাংলাভাষী সব ধর্মের, সব শ্রেণির মানুষের হৃদয়ে নির্দ্বিধায় স্থান করে নিতে পেরেছেন।
ভারতবর্ষের দুুটি প্রধান ধর্মের অনুসারী হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার মহান চেতনা ধারণ করেছিলেন নজরুল। এ দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যকার বিভেদ ঘোচাতে লেখালেখির মাধ্যমে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন তিনি। গেয়েছেন মিলনের মহামন্ত্র : ‘মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যকার অশুভ মানসিকতার ধারক, কূটবুদ্ধির নায়কদের হীনমানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে সে ব্যাপারে সবাইকে হুশিয়ার করে দিয়েছেন : ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোনজন/কা-ারী বল মরিছে মানুষ সন্তান মোর মার’।
তার পরও তিনি সফল হননি। কারণ সাম্প্রদায়িকতার নোংরা পাঁকে আপাদমস্তক ডুবে গিয়েছিল দুটি সম্প্রদায়ই। কারা কম কারা বেশি তা গবেষণার বিষয়। তবে ধারণা করা যায় যে সংখ্যাগুরু বিধায় হিন্দুরা সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। যা হোক, ভেদবুদ্ধি ও নির্মম হিংস্রতা ধর্মের আবরণে তাদের মধ্যে চিরকালের জন্য পার্থক্যরেখা টেনে দিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পথ ছিল না কারোরই। এ ব্যর্থতা নজরুলের প্রাণে ভালোমতো বেজেছিল।
মক্তবের স্বল্পকালের শিক্ষকতা, মসজিদের মুয়াজ্জিন ও মাজারের খাদেমের কাজের পর আর ধর্মীয় বিষয় বা কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা তার ছিল না। তবে ইসলামী আবহ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল তার মননে ও সত্তায়। তার সাহিত্যে তার প্রবল প্রকাশ ঘটেছে। তিনি বাংলার মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি। সে কারণেই তিনি বাংলার মুসলমানদের উদ্দেশে লিখেছিলেন : ‘দিকে দিকে পুনঃ জাগিয়া উঠেছে দ্বীনী ইসলামী লাল মশাল/ওরে বে-খবর তুইও ওঠ জেগে তোর ওই প্রাণপ্রদীপ জ্বাল’। কিংবা ‘বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা শির উঁচু করি মুসলমান/দাওয়াত এসেছে নয়া জামানার ভাঙ্গা কেল্লায় ওড়ে নিশান’। তার অসংখ্য কবিতা-গান বাঙালি মুসলিম তরুণদের জেগে ওঠা ও নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বিপুল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে তার অবদান অতুলনীয়।
নজরুলের জীবনপ্রবাহ কখনই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। শূন্য অবস্থা থেকে উঠে এসেছিলেন তিনি। ৪২ বছরের সচল-সক্রিয় জীবনের মধ্যপথে এসে খ্যাতি-সম্মানের উচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন তিনি, যা সাধারণত দেখা যায় না। অথচ তিনি নিজের জীবনকে কখনো গোছানোর চেষ্টা করেননি। তাকে যারা দেখেছেন তারা সবাই বলেছেন যে বৈষয়িক বুদ্ধি তার ছিল না। স্বার্থবিষয়ক চিন্তা কখনই তার মনে তুমুল দামামা বাজাতে পারেনি। দিতেই জানতেন তিনি, কিন্তু নিতে জানতেন না। পরনিন্দা, পরচর্চা, অন্যকে ঠকানো, নিজেকে বড় করে তুলে ধরার মতো বিষয়গুলো তার চরিত্রে থানা গাড়তে পারেনি। তার জীবনকে তুলনা করা যায় এক প্রবহমান নদীর মতো, যা শুধু বয়েই গেছে, আর কোনো দিকে ফিরে তাকায়নি। আখের গোছানোর মতো চিন্তা তার মধ্যে তাই কখনই জন্ম নেয়নি। নজরুল স্রষ্টার দেয়া অফুরান শক্তিতে ভরপুর ছিলেন। তাই অবিরাম লিখে গেছেন, গেয়ে গেছেন এবং বলে গেছেন। বিশেষ করে কবিতা ও গান তো কারো চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১০-২০ মিনিটের মধ্যেই লিখে দিয়েছেন, এমন অনেক ঘটনার কথাই জানা যায়। জীবনের মহত্তম বোধের আঙিনায় তিনি নিজের বাসা বেঁধেছিলেন, নীচতা-হীনতার জলাভূমিতে কোনো দিন বিচরণ করেননি। স্রষ্টা তাকে উন্নত চিত্ত দিয়েছিলেন, তাই বিত্তের নীচ মোহ তার কখনই ছিল না। তিনি ছিলেন সুন্দরের ধেয়ানী। কিন্তু বলতে হয়, সুন্দরের সাধনার উপযুক্ত পরিবেশ কখনো পাননি। নিয়তি কখনই তার জীবনকে অঢেল দান, সুখের প্রাচুর্যে ভরে দেয়নি। যৌবনের কিছুটা সময় সচ্ছলতা এসে থাকলেও স্থির হয়নি তা। আর্থিক টানাপড়েন তাকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে। বলতে গেলে তা ছিল তার জীবনসঙ্গী। নিশ্চিন্তে নিভৃতে গোলাপবাগিচায় ফুল ফোটানোর অবকাশ তিনি পাননি।
১৯৪২ সাল থেকে বাক-সম্বিৎহারা নজরুল নিজে আর বাকশক্তি ফিরে পাননি, কিন্তু তার সৃষ্টিসম্ভার তার হয়ে কথা বলে চলেছে। এ কথা ঠিক, নজরুলকে আমরা যত বড় বলে জানি, তিনি তার চেয়েও অনেক বড়। এ কথাও ঠিক যে নজরুলকে নিয়ে আরো অনেক বেশি চর্চা-গবেষণা হওয়া উচিত ছিল। ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, রুশ, চীনা ভাষাসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগুলোয় সুপরিকল্পিতভাবে তার কবিতার ব্যাপক অনুবাদ করানোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার ছিল। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা যেমন সচেতন নই তেমনি দায়িত্বশীলও নই। তাই নজরুলের প্রতি যতটুকু মনোযোগ আমাদের দেয়া প্রয়োজন ছিল, দীর্ঘদিন তা দেয়া হয়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। নজরুলের চর্চায় সরকারিভাবে গড়ে তোলা নজরুল ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে তার সাহিত্য ও সঙ্গীতকে অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে পেঁৗছে দেয়ার কাজ চলছে। ফলে অপরিচয়ের দূরত্ব অতিক্রম করে তিনি এখন আমাদের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছেন। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে নজরুলের সাহিত্য এখন তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য, নজরুলের বিশাল ও সমৃদ্ধ সঙ্গীতসম্ভারের উল্লেখযোগ্য অংশও সংগ্রহযোগ্য। এটা নিঃসন্দেহে সন্তোষজনক অগ্রগতি।
নজরুল আমাদের বড় আপনজন। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। তার কবিতা, তার গান আমাদের প্রেরণা_ আমাদের জীবনযাপনের অন্যতম অবলম্বন। চিরকাল তিনি জাতির কাছে স্মরিত হবেন, তার সাহিত্য বেঁচে থাকবে চিরকাল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ