সিসি নিউজ: টঙ্গী বিসিক শিল্প নগরীতে প্যাকেজিং কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি।
শনিবার সকালে ট্যাম্পাকো ফয়েলস নামে পাঁচ তলা ওই কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায় বলে জয়দেবপুর ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. রফিকুজ্জামান জানান।
দুপুরে আগুন নেভানোর আগে বেশ কয়েকজনের লাশ বের করে আনা হয়, কয়েকজন হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান। এদের কেউ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। আগুনে কারখানার কাঠামো ভেঙে তার নিচে চাপা পড়েও মারা গেছেন কেউ কেউ।
আহত ৩৫ জন টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এদিকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২ লাখ টাকা অনুদান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গাজীপুর জেলা প্রশাসন নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে এবং আহতদের ৫ হাজার টাকা করে দিচ্ছে।
কারখানার মালিক সিলেটের সাবেক বিএনপির সংসদ সদস্য সৈয়দ মো. মকবুল হোসেন হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। এছাড়া গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসও আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
কারখানার মালিক মকবুল জানান, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত তার এই কারখানায় সাড়ে ৪শর মতো শ্রমিক রয়েছেন। সবার ঈদের বোনাসসহ বেতন-ভাতা কয়েকদিন আগেই পরিশোধ করা হয়েছিল।
তিনি জানান, শুক্রবার রাতের পালায় ৭৫ জনের মতো কাজ করছিলেন। শনিবার ঈদের ছুটি হওয়ার কথা ছিল।
সকাল ৬টায় আগুনের খবর পেয়ে জয়দেবপুর, টঙ্গী, কুর্মিটোলা, সদর দপ্তর, মিরপুর ও উত্তরাসহ আশে-পাশের ফায়ার স্টেশনের ২৫ ইউনিট নেভানোর কাজ শুরু করে বলে জানান জয়দেবপুরের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, সকাল ৬টার দিকে কাজ চলার সময় নিচ তলায় বয়লার বিস্ফোরণের পর কারখানার পুরো ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
নিহত প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের স্ত্রী নিগার সুলতানা জানান, পৌনে ৬টার কিছুক্ষণ পর একটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান তিনি। কারখানার পাশে গোপালপুর এলাকায় তার বাসা। শব্দ শুনে বেরিয়ে স্বামীর কারখানা থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখে ছুটে যান নিগার। গিয়ে দেখেন তার স্বামীসহ কয়েকজনের লাশ বের করা হচ্ছে।
টঙ্গী রেল স্টেশনের কর্মী লিখন জানান, পাঁচ তলা কারখানার চতুর্থ তলায় বেশ কিছু শ্রমিক জানালা দিয়ে হাত নেড়ে তাদের বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছিলেন। এসময় স্থানীয়রা মই নিয়ে শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। কিন্তু ধোঁয়া ও তাপের কারণে তাদের ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
কিছুক্ষণ পরে ওই তলায় থাকা শ্রমিকদের আর কোনো সাড়া মেলেনি। ততক্ষণে আগুন পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে আশপাশের এলাকাও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকেও কারখানাটিতে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছিল। তার আগে ভবনের একাংশের ছাদ ধসে পড়ে। আগুন নেভাতে গিয়ে সোহেল নামের এক দমকলকর্মী আহত হন।আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চললেও বাতাসের কারণে বেগ পেতে হচ্ছিল বলে জানান ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।
ভেতরে দেয়াল চাপা পড়ে কিংবা অগ্নিদগ্ধ হয়ে আর কেউ মারা গেছেন কি না, তা আগুন পুরোপুরি নেভানোর আগে বলতে পারছেন না ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। নিহতদের মধ্যে ১৯ জনের লাশ টঙ্গী হাসপাতালে রয়েছে। সাতজনের লাশ রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
টঙ্গী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো. পারভেজ মিয়া জানান, হাসপাতালে নারী ও শিশুসহ ১৭ জনের লাশ রয়েছে। এছাড়া আহত ১২ জনকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
টঙ্গীতে থাকা যাদের নাম-পরিচয় গেছে, তারা হলেন- আনিসুর রহমান (প্রকৌশলী), জয়নাল আবেদিন (অপারেটর), আনোয়ার হোসেন (অপারেটর), শংকর (ক্লিনার), রেদোয়ান (দারোয়ান), জাহাঙ্গীর (নিরাপত্তাকর্মী), হান্নান মিয়া (নিরাপত্তাকর্মী), রফিকুল ইসলাম (শ্রমিক), ইদ্রিস, আল মামুন, নয়ন, সুভাষ, জাহিদুল, রাশেদ (রিকশাচালক)।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই কারখানার শ্রমিকদের স্বজনরা টঙ্গী ৫০ শয্যার হাসপাতালে ভিড় জমায়। লাশ দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে স্বজনদের খুঁজছিলেন।
শুরুতে কারখানা থেকে হতাহতদের উদ্ধার করে টঙ্গী হাসপাতালে নেয়া হলেও সেখান থেকে গুরুতর আহতদের ঢাকা মেডিকেল ও উত্তরা মেডিকেলে পাঠানো হয়।
উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার সাব্বির আহমেদ জানান, সেখানে নেয়া দুজনের মৃত্যু হয়েছে। পরে লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া জানান, এই হাসপাতালে এক নারীসহ সাতজনের লাশ রয়েছে। তাছাড়া ভর্তি রয়েছেন আরো ১৮ জন, তারা সবাই পুরুষ।
মৃত পাঁচজনের নাম জানা গেছে, তারা হলেন- অপারেটর সিরাজগঞ্জের ওয়াহিদুজ্জামান স্বপন (৩৫), হবিগঞ্জের তাহমিনা আক্তার (৫০), আশিক (১২), আনোয়ার হোসেন (৪০) ও দেলোয়ার হোসেন (৫০)।
ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শঙ্কর পাল জানান, আহতদের মধ্যে চারজন তাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। এর মধ্যে একজনের শরীরের ছয় ভাগ, আরেকজনের আট ভাগ পুড়েছে। একজনের শরীরের ৯০ ভাগ পুড়ে গেছে, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
দেহের ছয় শতাংশ পুড়েছে শাহ আলমের (৪৬), দিলীপ দাসের (৩৬) পুড়েছে আট শতাংশ বার্ন। রিপন দাসের (৩০) দেহের ৯০ ভাগ পুড়েছে। এছাড়া রাসেল খান (২৬) নামে একজনও বার্ন ইউনিটে রয়েছেন।
ভর্তি অন্যরা নানাভাবে আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন। তারা হলেন- রাসেল (২২), আনোয়ার (৫০), কামরুল (২৭), মনোয়ার (৩৫), মিজু মিয়া (২৫), ইকবাল (৩৫), শিপন (৩৫), শাহীন আকমল (৩০), রোকন (৩৫), কামরুল (২৭), প্রাণকৃষ্ণ (৩৮), অজ্ঞাত পুরুষ (৫০)।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আশঙ্কাজনক রোগীদের আগে সেটল করছি। যার যার রক্ত-স্যালাইন প্রয়োজন, আমরা তা দিচ্ছি।
১২ বছরের একটা শিশুর কথা উল্লেখ করে তিনি দুপুরে বলেছিলেন, বাচ্চাটি শকে আছে। তার অপারেশন প্রয়োজন। আমরা তৈরি আছি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দিচ্ছি।
তবে আশিক নামে ওই শিশুটি বেলা ৩টার দিকে মারা যান।
তদন্ত কমিটি, ক্ষতিপূরণ: গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম আলম কারখানা পরিদর্শনের পর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা সাংবাদিকদের জানান।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) রাহেদুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক আনিস মাহমুদ জানান, বাহিনীর উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. বদিউজ্জামানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছেন তারা। কমিটিকে ১০ দিন সময় দেয়া হয়েছে।
কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক সৈয়দ আহাম্মদ জানান, উপ-মহাপরিদর্শক মো. শামছুজ্জামান ভূইয়াকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছেন তারা।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু সাংবাদিকদের জানান, নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে দুই লাখ টাকা করে দেয়া হবে। শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকে এই অনুদান দেয়া হবে। নিহতদের মধ্যে শ্রমিক ছাড়া এক রিকশাচালকের নামও পাওয়া গেছে। তবে তার অনুদান পাওয়ার বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে গাজীপুর জেলা প্রশাসন নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দিচ্ছে।
শ্রম প্রতিমন্ত্রী চুন্নু ছাড়াও স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. হেলাল উদ্দিন আহমদ, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. আসাদুর রহমান কিরণ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মতিউর রহমান ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ তদারকি করেন।
জেলা প্রশাসক এস এম আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় এই ঘোষণা দেন। আহতদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে দিচ্ছে জেলা প্রশাসন।
আহতদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করার কথা কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক সৈয়দ আহাম্মদও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আহত শ্রমিকদের চিকিৎসাও করানো হবে। সেই সাথে কারখানার মালিকদের প্রত্যেক শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করতেই হবে।