সিসি নিউজ: ‘মুনীর চৌধুরী ঘুষ নেন না, রক্তচক্ষুকে ভয় করেন না, কারও তদবির গ্রহণ করেন না, প্রভাবিত হয়ে কোন কাজ করেন না। তিনি যে প্রতিষ্ঠানেই গেছেন সেখানেই আশা জাগানিয়া অনেক কাজ করেছেন। আশা করছি, দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) তিনি কাজ করে মানুষের আশা পূরণ করতে পারবেন। আমরা চাই, মুনীর চৌধুরী যেন দুর্নীতিবাজদের আতঙ্কে পরিণত হতে পারেন। আমরা যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার তারা যেন বলতে পারি, সাবধান, দুদকে আছেন মুনীর চৌধুরী !’
অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্রমাগত যুদ্ধ করে যাওয়া আলোচিত সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে এমন আশাবাদের কথা জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক কমিটি-টিআইবির চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।
বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সময় মন্ত্রী-এমপি, রাজনৈতিক নেতা-ব্যবসায়ীসহ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা মুনীর চৌধুরীকে সম্প্রতি দুদকের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ২০০৯ সালে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান গোলাম রহমান মুনীর চৌধুরীকে পরিচালক হিসেবে আনার জন্য চেষ্টা করে প্রভাবশালী মহলের বিরোধিতায় ব্যর্থ হন। সেই মুনীর চৌধুরী এবার দুদকের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোসহ সচেতন মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।
প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, দুদকের উপর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু দুদক সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। এখন মুনীর চৌধুরীর মতো একজন সাহসী কর্মকর্তা যখন প্রতিষ্ঠানটিতে যাচ্ছেন তখন মানুষ তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবে সেটাই স্বাভাবিক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর গণমাধ্যমে, চায়ের টেবিলে, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের কথায় মুনীর চৌধুরীর দুদকে মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি এখন আলোচনার শীর্ষে। আলাপে উঠে আসছে কর্মজীবনের শুরু থেকে মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরীর সাহসী ভূমিকার কথা।
খালেদার জাহাজেও অভিযান
২০০৩ সালের কথা। তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী প্রয়াত আকবর হোসেন খানের বিশেষ আগ্রহে মন্ত্রণালয়ের সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পান মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। দায়িত্ব নিয়েই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের মালিকানাধীন কোকো-৩, ৪ ও ৫ জাহাজ আটক করেন। তোলপাড় শুরু হয় সরকারে, বিপাকে পড়েন নৌপরিবহন মন্ত্রী। মেরিন ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব মাত্র আট মাসেই ছুটে যায়।
তবে এর আগে নিজের নিকটাত্মীয়ের মালিকানাধীন সুরভি লঞ্চকেও জরিমানা করে অনিয়মকে ছাড় না দেয়ার বার্তা পৌঁছান মুনীর চৌধুরী।
সাকার জাহাজও বাদ যায়নি
মুনীর চৌধুরীকে পাঠানো হল চট্টগ্রাম বন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট করে। সেখানে যোগ দিয়েই নেমে পড়েন বন্দরের ভুমি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধারের যুদ্ধে। ২০০৫ সালে বঙ্গোপসাগর আর কর্ণফুলীর মোহনায় লালদিয়ার চরে প্রায় ৪২ বছর ধরে অবৈধ দখলে থাকা ২০০০ কোটি টাকার একশ একর জমি উদ্ধার করেন তিনি।
২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা দোর্দন্ড প্রতাপশালী (যুদ্ধপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত) সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মালিকানাধীন কিউসি স্টার, কিউসি পেইনটেইন এবং কিউসি অনার জাহাজকে বন্দর আইন অমান্যের অভিযোগে আটক করেন। একই বছর সাকার প্রতিষ্ঠানের অবৈধ দখলে থাকা ৫০ কোটি টাকার সরকারি জমিও তিনি উদ্ধার করেন।
মহিউদ্দিনের জেটি ভেঙেছিলেন, আটক করেছিলেন মনজুরের জাহাজ
এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকা অবস্থায় ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের জমি দখল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নামে তিনটি অস্থায়ী জেটি বানিয়েছিলেন। বন্দরের কর্মকর্তারা প্রভাবশালী এই নেতার ভয়ে কিছুই বলতে পারছিলেন না। তৎকালীন বন্দর ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী একদিন অভিযান চালিয়ে তিনটি জেটি ভেঙে দেন। টেলিফোনে হুংকার দিয়েছিলেন মহিউদ্দিন, শোনেননি মুনীর চৌধুরী।
এরপর একদিন মেয়র মহিউদ্দিন নিজে মুনীর চৌধুরীকে ডেকে পাঠান। মেয়রের সম্মান রাখতে মুনীর চৌধুরী ছুটে যান। সামনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহিউদ্দিন দাঁড়িয়ে বলেন, আই স্যালুট ইউ।
২০১২ সালের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) থাকা অবস্থায় সাগরে তেল ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে তৎকালীন মেয়র ও বিএনপি নেতা এম মনজুর আলমের জাহাজ আটক করে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছিলেন তিনি।
ছালামের কারখানায় ঢুকেছিলেন
২০১১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে সিডিএ চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আবদুচ ছালামের প্রতিষ্ঠান সানজি ডাইংয়ের কারখানায় অভিযান চালান মুনীর চৌধুরী। নানামুখী চাপের মুখেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে মুনীর চৌধুরী পরিবেশ দূষণের দায়ে সেই কারখানাকে ২২ লাখ টাকা জরিমানা করেন এবং সেই টাকা আদায় করেন। বাধ্য হয়ে পরিবেশ দূষণ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল কারখানা কর্তৃপক্ষ।
এভাবেই কর্মজীবনে মন্ত্রী-এমপি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-ব্যবসায়ীদের অনিয়ম-ক্ষমতার দাপটের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করেছেন মুনীর চৌধুরী। মিল্কভিটা, ডিপিডিসিসহ যেসব সংস্থায় কাজ করেছেন সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বন্ধেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন তিনি।
২০০৬ সালে বন্দর ম্যাজিস্ট্রেট থাকার সময় আগ্রাবাদে এক ট্রাফিক সার্জেন্টকে ট্রাক থামিয়ে চাঁদাবাজির সময় হাতেনাতে ধরে ফেলেন। অভিযুক্ত সার্জেন্টের পকেটে তল্লাশি করে চাঁদাবাজির ৭৮০০ টাকা উদ্ধার করেন। তাকে চাকুরিচ্যুতির সুপারিশ করে থানায় সোপর্দ করেন মুনীর চৌধুরী।
২০১০ সালে মুনীর চৌধুরী সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে কক্সবাজারের ঝিলংঝায় ১০০ একর পাহাড় ধ্বংস করে গড়ে তোলা অবৈধ আবাসন গুঁড়িয়ে দেন।
২০০৪ সালে মুনীর চৌধুরী শুরু করেছিলেন পণ্যে ভেজালবিরোধী একের পর এক অভিযান। দেশে প্রথম তিনিই শুরু করেন এ অভিযান। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী আসছেন শুনলেই ভেজাল খাবার বিক্রেতা, নোংরা পরিবেশে খাবার উৎপাদনকারীরা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পালাতে থাকেন। চট্টগ্রামের এ অভিযান পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায়।
সনাক-টিআইবির চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, মুনীর চৌধুরী যেখানেই কাজ করতে গেছেন সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত দুর্নীতিবাজ প্রভাবশালী মহল তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। বিভিন্নভাবে তারা মুনীর চৌধুরীকে থামানোর চেষ্টা করেছে। এর ফলে মুনীর চৌধুরী অনেক ভাল কিছু করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা চাই, দুদকে অন্ত:ত মুনীর চৌধুরী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। তাকে ব্যর্থ করে দিয়ে ফেরত পাঠানো হবেনা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে মুনীর চৌধুরী গণমাধ্যমের সঙ্গে কোন কথা বলতে পারবেন না বলে জানান।
বাংলানিউজ