• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২১ অপরাহ্ন |

পার্বতীপুরে স্বল্পমূল্যে চাল বিক্রিতে ব্যাপক অনিয়ম

অনিয়মপার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের পার্বতীপুরে সরকারের ১০টাকা কেজি দরে চাল বিক্রয় কর্মসুচীর হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা প্রনয়ন ও চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতিরঅভিযোগ উঠেছে। এর ফলে, পার্বতীপুর উপজেলার ১০ ইউনিয়নে এ কর্মসুচীর মূল উদ্দেশ্য অনেকাংশ ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সূত্রমতে, কর্মাভাব থাকা বছরের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও মার্চ, এপ্রিল এ ৫ মাস সারাদেশের ন্যায় পার্বতীপুর উপজেলার ১০ ইউনিয়নের (পৌরসভা ছাড়া) ১৬ হাজার ১৪৭ হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে ১০ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরনের সিদ্ধান্ত নেয় খাদ্য অধিদপ্তর। এলক্ষ্যে প্রতি ইউনিয়নেদারিদ্রের প্রকোপ ও দুঃস্থতার মাত্রা বিবেচনায় উপকারভোগি পরিবারের তালিকা প্রনয়ণের জন্য ৬ সদস্যের ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া ইউনিয়ন কমিটি দেয়া তালিকা যাচাই করে তা অনুমোদনের জন্য ১০ সদসের উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়। প্রত্যেক ইউনিয়ন কমিটিতে একজন করে সরকারী কর্মকর্তা সংযুক্ত করা হয়।
সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা প্রনয়নের দায়িত্ব ইউপি চেয়ারম্যান ও একজন সরকারী কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত ইউনিয়ন কমিটির। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে খোজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকৃত পক্ষ্যে তালিকা প্রনয়ন করছেন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সম্পাদকের নেতৃত্বে ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকগন। এতে শুধু দুঃস্থতা বিবেচনা না করে দলীয় বিবেচনায় তালিকা করায় উপজেলার সকল ইউনিয়নে অনেক সচ্ছল পরিবার তালিকাভূক্ত হয়েছেন। এর ফলে কোন রাজনীতির সাথে জড়িত নয় এমন বহু দুঃস্থ পরিবার ১০ টাকা কেজি দরে চাল কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এছাড়া উপজেলার ১০ ইউনিয়নে দায়িত্ব পাওয়া ৩২ ডিলারের সকলেই সরকারী দলের নেতাকর্মী। এতে চাল বিতরনে তাদের কোন রকম অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে মুখ খুলতে ও এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারছেন না তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
চাল বিতরনে তৃণমুল পর্যায়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ থেকে জানা যায়, সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী শুধু মাত্র হতদরিদ্র পরিবার প্রধানরাই মাসে প্রতি কেজি ১০ টাকা দরে চাল পাবেন। কিন্তু এ নিয়ম অনুসরণ না করায় গোটা উপজেলা অনেক সচ্ছল পরিবার ১০ টাকা কেজি দরে চাল পাচ্ছেন।
উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের ২নং গোবিন্দপুর ওয়ার্ডের দক্ষিণপাড়ার আঃ মান্নান (কার্ড নং ১৫৩) ও তার ছেলে আবু তাহের (কার্ড নং ১৫৪) প্রায় ৫-৬ একর জমির মালিক। তার পরও বাবা ছেলে দু’জনেই কার্ড পেয়েছেন, চালও তুলেছেন। একই ইউনিয়নের হয়বৎপুর ওয়ার্ডের পরিস্থিতি আরো গুরুতর। এই ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার ফাইজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার ওয়ার্ডে ৫টি মৌজায় ১৮টি পাড়া, কার্ডের বরাদ্দ ১৩১। কিন্তু ১৮ পাড়ার মধ্যে শুধুমাত্র শুড়িপাড়া ও ডাঙ্গাপাড়ায় এসব কার্ড বিতরন করা হয়েছে। এছাড়া কেবল পরিবার প্রধানের নামে কার্ড দেয়ার নিয়ম থাকলেও এ দুই পাড়ায় অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের নামেও কার্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
ইউপি মেম্বার ফাইজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকারী নীতিমালায় হতদরিদ্রের তালিকা তৈরীতে ইউপি সদস্য কে অন্তভূর্ক্ত করার নিয়ম থাকলেও তাকে নেয়া হয়নি। তার ওয়ার্ডে ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক নুর আলম একাই হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা তৈরী করেছেন।
২নং ওয়ার্ডের দুর্গাপুর মাছুয়াপাড়া গ্রামের কার্তিক চন্দ্র (৪৫) জানান- তাদের গ্রামে ৫০-৫৫টি পরিবারের বাস। সবাই সরকারী খাস জমিতে বসবাস করেন। মাছ ধরে ও দিন মজুরী করে দিন কাটে। তা সত্বেও এ গ্রামের মাত্র ৩-৪ জন কার্ড পেয়েছেন।
৫নং ওয়ার্ডের উত্তর বাসুদেবপুর শড়েয়াতলি আদিবাসী পল্লীর মঙ্গল মুরমুর ছেলে রবি মূরমু (কার্ড নং ৮৫৭) অভিযোগ করেন, গত ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি চাল তুলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ডিলার সুমন চন্দ্র রায় তাকে ৩০ কেজির স্থলে ২০কেজি চাল দিয়েছেন। তবে কার্ডে ৩০ কেজিই উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগের ব্যপারে ডিলার সুমন চন্দ্রের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ ব্যপারে পরে তিনি আমার সাথে দেখা করে কথা বলবেন বলে জানান।
মোমিনপুর ইউনিয়নে হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরী ও চাল বিতরনে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব মন্ডল বলেন, কিছু কিছু এলাকায় ভুলক্রুটি ছিল, সেগুলো সংশোধন করে বর্তমানে সুন্দরভাবে চাল
বিতরনের কাজ চলছে।
এদিকে, গত ৭ সেপ্টেম্বর পার্বতীপুর উপজেলায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রিশুরু হয়। গত ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর পার্বতীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে চাল বিতরন কর্মসূচী পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে (১০ সেপ্টেম্বর) তিনি দেখতে পান মন্মথপুর ইউনিয়নের ডিলার (৪ ও ৫ নংওর্য়াড) সামসুর রহমান কনু (৪৮), রাজাবাসর ল্যাম্ব হাসপাতাল এলাকায় খোলা আকাশের নিচে চাল বিক্রি করছেন। সেখানে তার না আছে নিজস্ব বা ভাড়ার দোকান কিংবা গুদাম ঘর। ঘটনাস্থলে ডিলার সামসুর রহমান কনু খাদ্য বিভাগের সরবরাহ করা মানসম্মত চালের বদলে নিন্মমানের খাওয়ার অনুপযোগি চাল বিক্রি করছেন।
এব্যাপারে পার্বতীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুল জলিল ব্যাপারী বলেন, এঘটনায় কেন তার ডিলারশীপ বাতিল বা তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবেনা? ৩ দিনের মধ্যে এর সন্তোষজনক জবাব প্রদানের জন্য তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়া হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার ডিলার সামসুর রহমান কনু বলেন, সরকারী নীতিমালা অনুসরন করে আমি চাল বিতরন করছি। আমাকে যে মানের চাল সরবরাহ করা হয়েছে, তাই বিতরন করেছি। চাল বিতরনের তালিকা তৈরী, চাল বিতরন, ওজনে কারচুপিসহ নানা অনিয়ম, দূর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে উপজেলার হতদরিদ্রদের তালিকা অনুমোদন কমিটির প্রধান ও পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন- বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে এ সংক্রান্ত নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আগামীতে ক্রুটিমুক্ত তালিকা প্রনয়ণ ও অন্যান্য ভূলক্রুটি এড়িয়ে কি ভাবে নীতিমালা অনুসরন করে চাল বিতরন কর্মসুচী বাস্তবায়ন করা যায়, সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ