।। খুরশিদ জামান কাকন ।।
শান্তশিষ্ট স্বভাবের লাজুক প্রকৃতির মেয়ে অধরা। অধরা সবেমাত্র এমএ পাশ করেছে। আর তাতেই সংসারের হাল ধরার ভার এখন তার কাধে। কারন বেশকিছু দিন হলো অধরার বাবা আলফাজ আহমেদ হার্ট আট্যাক করে মারা গেছেন। অধরার বাবা আলফাজ আহমেদের মৃত্যুটা বেশ রহস্যও বটে। সেদিন সোমবার সবেমাত্র এমএ পাশ করা মেয়ে অধরার বাড়ি ফেরা দিন বলে কথা। মেয়ের পছন্দের সব খাবার রান্না করাতে সকাল থেকে রাহেলা বেগম ব্যস্ত। হঠাত দরজায় নক করার শব্দ হলে রাহেলা বেগম অধির আগ্রহ নিয়ে দরজা খুলতে যান। কিন্তু না তিনি যা ভেবেছিলেন ঠিক তা নয়। অধরার বাবা আলফাজ আহমেদ এসেছেন। যদিওবা তিনি কখনো এ সময়ে বাড়িতে আসেন না। বেলা ১১ ঘটিকায় স্বামীকে ফেরতে দেখে কিছুটা অবাকও বটে। আবার মেয়ে অধরা বাড়ি ফিরবে বলে কথা সেজন্যই হয়তো এতো তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আলফাজ আহমেদ এসেছেন। তাই রাহেলা বেগম কোন প্রশ্ন করেন না।
.
অন্যদিনের তুলনায় এদিন অবশ্য আলফাজ আহমেদকে বেশ চিন্তিত মনে হয়েছিলো। তিনি স্ত্রী কাছে এক গ্লাস পানি চেয়ে শোয়ার ঘরে যান। রাহেলা বেগম পানি নিয়ে ফিরলে দেখেন স্বামী ঘুমিয়েছেন। তাই তিনি আর আলফাজ আহমেদকে ঘুম থেকে ডাকেন নি। পরে বিকেল বেলা মেয়ে অধরা বাড়ি ফিরলে বাবাকে ঘুম থেকে জাগানোর চেস্টা করলে আলফাজ আহমেদ আর উঠেন নি। কে জানতো সেই ঘুমেই যে আলফাজ আহমেদের শেষ ঘুম হবে। পরব্রতীতে জানা যায় আলফাজ আহমেদ চাকুরী হারানোর শোকে ঘুমের মাঝেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। কিন্তু ঠিক কোন কারনে আলফাজ আহমেদ চাকুরী হারালেন সে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কেউ কেউ বলে সরকারী চাকুরী জীবী আলফাজ আহমেদ দূর্নিতীর সাথে সম্পৃক্ত থাকায় চাকুরী হারিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলে দ্বীর্ঘ দিন সততা ও নিষ্ঠার সাথে চাকুরী করা আলফাজ আহমেদেকে ষড়যন্ত্র করে চাকুরী থেকে ইস্তফা দেয়া হয়েছে।
.
আলফাজ আহমেদ অসৎ পথের আশ্রয় নিলে তা কেউ না জানলেও অন্তত তার স্ত্রীর জানার কথা। কিন্তু রাহেলা বেগম স্বামীকে কখনো অন্যায় করতে দেখেন নি। আর আলফাজ আহমেদ যদি অসৎ পথে উপার্জন করতেন তাহলে তার সংসারে টানাপোড়ন কি আদৌ থাকতো। বর্ষাকালে ভাড়া বাড়ির টিনের ফুটো দিয়ে পানি সহ্য করতে হতো না আলফাজ আহমেদের। দুবছরের ছোট্ট ছেলেটি উন্নত চিকিৎসার অভাবে ধুকতে ধুকতে মরে যেতো না।
.
স্বামীকে হারিয়ে শোকে কাতর রাহেলা বেগম সারাদিন নাওয়াখাওয়া ছেরে একলা একা চুপটি করে বসে থাকে। আর থেমে থেমে অঝোরে শুধু কাদতে থাকে। একমাত্র মেয়ে অধরার উচ্চ শিক্ষার স্বপ্নও মাটিতে মিশে যায়। অধরাদের পরিবারে নেমে আসে চরম আর্থিক দুর্গতি। চার মাসের বাড়ি ভারা বাকি পড়ে আছে, প্রতিদিন বাড়ি ওয়ালার ঝাঝালো কথা শুনতে শুনতে একপ্রকার অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে অধরা। এমন্ত পরিস্থিতিতে অধরা কি করবে না করবে ভেবে কোন কুলকিনারা পায় না।
.
শিক্ষিতা অধরার চিন্তার ভাজে চাকুরী খোজার ভাবনা। কিন্তু বর্তমান যুগে মামা-চাচা ছাড়া চাকুরী তো অনেক দুরূহ ব্যাপার। মামু নামক টাকা ছাড়া কে দিবে অধরাকে চাকুরী। তারপরও অধরা হাল ছারে না। অধরা অফিসের দোয়ারে দোয়ারে ঘুরতে থাকে দুবেলা দুমুঠো বেচে খেয়ে থাকার অবলম্বন হিসেবে চাকুরী পাওয়ার আশায়। কিন্তু অধরা কোথাও কোন চাকুরী পায় না। ঢাকা শহরে নাকি টাকার ছড়াছড়ি, হাত বাড়ালেই নাকি টাকা পাওয়া যায়। সেই ঢাকা শহরেই অর্থকষ্টে অধরা তার মায়ের ভালো চিকিৎসা করাতে পারছে না। অধরা তার মায়ের চিকিৎসার সাহায্যার্থে আত্মীয়স্বজনদের শরণাপন্ন হলেও তাদের কেউ এগিয়ে আসে নি। প্রকৃত পক্ষে বিপদে পড়লেই চেনা যায় কে আপন আর কে পর। অধরার বাবা মারা যাওয়ার পর কাছের মানুষেরা যেনো সবাই বদলে যেতে শুরু করেছে।
.
অধরা ঢাকা শহরে বেশ কয়েকটি টিউশনির খোজ পায়। সারাদিন এদিকওদিক টিউশনি পড়িয়ে অধরা কোনরকমে তাদের সংসারটাকে টিকিয়ে রেখেছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই অধরার মায়ের শরীরে অসুখেরা বাসা বেধেছে। গলির শেষ মাথায় চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অধরা প্রায়সই একটা সানগ্লাস পড়া লম্বা গোলগাল চেহারার ছেলেকে দেখতে পায়। ছেলেটা কেমন যেনো ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে অধরার দিকে। অধরার ওসব ভালো লাগে না। অধরা যেতে আসতে প্রতিদিনে ছেলেটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। হয়তো ছেলেটা কিছু বলতে চায় অধরাকে, কিন্তু অধরার কোন ইচ্ছা নেই বখাটে হিসেবে বিবেচিত ছেলেটির কথা শুনার।
.
অধরার অসস্থির কারন হয়ে দারিয়েছে সাদাফ নামক বখাটে ছেলেটি। অধরা সাদাফকে এড়িয়ে চলে। অধরা আগ বাড়িয়ে সাদাফকে দুটো কড়া কথা শুনানোরও সাহশও পায়না। কয়েকদিন যাবত ধরে সাদাফ অধরার বাড়ির সামনে গিয়ে সর্বদা দারিয়ে থাকে। এতে করে অধরার মা মেয়েকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। আশেপাশের বাশিন্দারা রাহেলা বেগমকে বেশ সতর্ক করে বলে মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে, অথবা মেয়েকে অন্যত্র পাঠিয়ে দিতে। এমনিতে অধরার মা রাহেলা বেগমের শরীর ভালো নয়, তার উপর এমনি সব টেনশনে দিনেদিনে তার শরীর আরো অবনতির দিকে ধাবিত হয়।
.
সেদিন সোমবার অধরা প্রতিদিনের মতো টিউশনি করতে বাড়ি থেকে বের হবে হবে এমন সময়ে রাহেলা বেগমের শরীরটা বেশ খারাপের দিকে অগ্রসর হয়। অধরা কি করবে না করবে ভেবে কোন কুলকিনারা পায় না। অধরা এদিকওদিক ছুটাছুটি করছে। এমন সংকটময় সময়ে আশেপাশের মানুষগুলো কেমন যেনো তাদের চিনেও চিনছে না। অধরা শেষে সানগ্লাস পড়া সাদাফ নামক ছেলেটির শরণাপন্ন হয়। ‘আমার মায়ের শরীর খুব খারাপ, প্লিজ আমার মাকে বাচান’ বলেই অধরা সাদাফের সামনে অঝোরে কাদতে থাকে। সাদাফ জলদি জলদি ট্যাক্সি করে অধরার মাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আইসিইউতে ভর্তি করায়।
.
ভিতরে চিকিৎসকের নিবীর পর্যবেক্ষনে অধরার মা, বাইরে শুধু এদিকওদিক হেটে চলছে সাদাফ। আর হাসপাতালের মেঝেতে বসে অধরা শুধুই কেদে চলছে। বিপদের সময় শান্তনা ও মনে সাহস জুগিয়ে দেওয়ার জন্য হলেও আশেপাশে অনেক আত্বীয়-স্বজন থাকে। কিন্তু সেদিক দিয়ে অধরা বড়ই অভাগা।
– এখন কি ভেঙ্গে পড়লে চলবে? (সাদাফ)
(অধরা পাশে ঘুরে সাদাফের দিকে তাকায়)
– মনে সাহস রাখুন, আর আল্লাহ’র কাছে মায়ের সুস্থতা কামনা করুন।
খানিক পড়ে ভিতর থেকে ডাক্টার বেরোয়, অধরা ও সাদাফ এগিয়ে যায়।
“এবারের মতো আল্লাহ’র রহমতে আপনার মাকে বাচানো সম্ভব হল। মায়ের যত্ন নিবেন, আর তিনাকে কোনরকম টেনশনে রাখবেন না।” বলেই ডাক্টার চলে যায়।
.
দুমাস পড় আজ সাদাফ ও অধরার বিয়ে। অধরা লাল টুকটুক বউ সেজে বাসরঘরে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছে। সাদাফ বাসরঘরে প্রবেশ করা মাত্র অধরা উঠে গিয়ে স্বামীকে সালাম করে।
– আপনাকে আমার কিছু বলার আছে? (সাদাফ)
– জ্বি, বলেন? (অধরা)
– আপনার বাবা যেখানে চাকুরী করতো, সে চাকুরীটা আপনার বাবার পড়ে আমি পেয়েছিলাম। আমার বাবার বন্ধু প্রভাবশালী হওয়ায় আমি খুব সহজেই চাকুরীটা পেয়েছিলাম। কিন্তু জানতাম না আমার চাকুরীর সুযোগ করে দেয়ার জন্যে অন্তরালে ছলে-বলে আপনার বাবার চাকুরীটা কেড়ে নেয়া হয়েছিলো। পরে যখন জানলাম তখন অনেক দেরী হয়ে গেছিলো। তাই নিজের মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করছিলো। আর তারপর থেকে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে আমি আপনাদের খোজ করি। সেই থেকে আমি আপনার সাথে দেখা করার জন্য আপনার পিছন ঘুরঘুর করতাম। অনেক বার কথা বলার জন্য এগিয়ে ছিলাম। কিন্তু আপনি বার বার আমাকে বখাটে ছেলে ভেবে এড়িয়ে গেছিলেন। (সাদাফ)
(কথা গুলো সাদাফ শেষ করতে না করতে কৃতজ্ঞতায় অধরার চোখটা ছলছল করতে থাকে)
অতঃপর সাদাফ ও অধরা মাকে নিয়ে সুখের সংসার শুরু করে।
.
দুবছর পর হাসপাতাল বেডে শুয়ে আছে অধরা। আর অধরার কোলজুরে ছোট্ট একটা ফুটফুটে মেয়ে। পাশে থাকা সাদাফ মেয়ের সাথে খেলা করছে আর অধরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।।।।।