মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর: পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়ার কয়লা ধোয়া পানি ব্যবহারের কারণে এলাকাবাসি চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এলাকার চাষী ও দিনমজুররাই এ রোগে বেশী আক্রান্ত হচ্ছে। ক্ষেতে কাজ করার ফলে তারা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে তাদের ধারণা।
ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের ইউসুফপুর গ্রামের ইদ্রিস আলীর মেয়ে রিভা (৮)। সে একই এলাকার রজনীগন্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। বাড়িতে পানির সরবরাহ না থাকায় রিভা তার কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে বাড়ির পার্শ্ববর্তী ডোবায় হাত ধুতে গিয়েছিল। আর সেখান থেকেই চর্মরোগে আক্রান্ত হয় রিভা।
তার বাবা ইদ্র্রিস আলী মেয়ের হাতের রোগটি সারাতে ইতোমধ্যে অনেক টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু এখনো তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব হয়নি। বাড়িতে পানি না থাকার ফলে রিভাকে যেতে হয়েছিল পার্শ্ববর্তী ডোবায়। আর সেখান থেকেই সে চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান তার বাবা ইদ্রিস আলী।
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৪০০ মিটারের মধ্যে রিভার ইউসুফপুর গ্রামটির অবস্থান। স্থানীয়রা জানায়, বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে কেন্দ্রে ১৪টি গভীর পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এসব নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলনের ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ওই এলাকার নলকূপ দিয়ে পানি উঠছে না। ফলে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার পড়েছে ওই এলাকায়।
শুধু ইউসুফপুর গ্রামেই নয়, তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়ী ও পার্বতীপুর উপজেলার মোট ১১টি গ্রামে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এগুলো হলো ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের রামভদ্রপুর, মধ্য রামভদ্রপুর, মধ্যদুর্গাপুর ইউসুফপুরের দুইটি ও দুধিপুুকুরের তিনটি গ্রাম এবং পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের শেরপুর, উত্তর শেরপুর ও মধ্যমপাড়া গ্রাম।
স্থানীয়রা জানায়, এই ১১টি গ্রামের প্রতিটিতে ২০০ করে পরিবার রয়েছে। পাশাপাশি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে পানি ব্যবহার করা হয় সেই সব পানিই ময়লাযুক্ত হয়ে ড্রেনের মাধ্যমে চলে আসে পার্শ্ববর্তী কৃষি জমি ও নদীতে। আর এসব পানি শরীরের সংস্পর্শে চলে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় চুলকানিসহ বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ।
বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে পার্বতীপুরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়। এই কেন্দ্রের উৎপাদন সচল রাখতে মোট ১৪টি গভীর নলকূপের (ডিপ) মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়। এই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করে সেখানে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। অনবরত মাটির গভীর থেকে পানি উত্তোলনের ফলে কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী এসব এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করলে সেই সময়ে এলাকাবাসী আন্দোলনে নামলে পল্লী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) তদন্ত করে গভীর নলকূপ বসিয়ে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সংকটে থাকা এলাকাগুলোতে পানি সরবরাহ শুরু করে।
সরেজমিনে ইউসুফপুর গ্রামে গেলে গ্রামের অনেকেই তাদের এই সমস্যার কথা জানান। বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মচারী ফজলুর রহমান জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাদের গ্রামে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই এসেছেন তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
সর্বশেষ সমাধান হিসেবে যা হয়েছে তাতে সন্তুষ্ট নন তারা। কারণ এখন তাদের পানি কিনে খেতে হয়। তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থায়নে ও বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মাধ্যমে ওই এলাকায় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে করে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমিকে জনপ্রতি মাসে ১২ টাকা দিতে হয়।
বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (নিরাপত্তা) হযরত আলী গভীর পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলনের ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, পার্শ্ববর্তী যেসব গ্রামে পানির সংকট দেখা দিয়েছে সেগুলোতে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থায়নে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত কয়লা ধোয়া পানি পরিবেশগত কোনো সমস্যা নেই। বরং এই পানি যে জমিতে পড়ে তার ফসল উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। এই এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হওয়ার ফলে এসব এলাকার লোকজনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের অনেকটাই চাহিদা পূরণ করছে। এলাকার কতিপয় মানুষ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে ষড়যন্ত্রমূলক এসব কথা বলছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুরুল ইসলাম জানান, দূষিত পানির কারণে চর্মরোগের বিষয়টি তিনি অবগত, তবে এটি এখনো বড় আকার ধারণ করেনি। তবে মাঠ পর্যায়ে তাদের কর্মকর্তারা কাজ করছেন বলে তিনি জানান।
দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ডা. অমলেন্দু বিশ্বাস জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত করে সমস্যা সমাধান করা হবে বলে তিনি জানান।
জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম জানান, দ্রুত বড়পুকুরিয়া এলাকার পানি সংকটের সমাধান করা হবে।