• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৬ অপরাহ্ন |

রাজারহাটে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানীর অভিযোগ

kurigram-primary-teacher-photo-28-11-16কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার পুটিকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আলোচিত প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান একের পর এক অপকর্মে জড়িয়ে পড়লেও শিক্ষা প্রশাসন নিরব। গত ১৮বছরে তার বিরুদ্ধে ২জন সহকারি শিক্ষিকা, একজন ছাত্রী, একজন ছাত্রীর মা এবং শ্যালকের সাথে বিয়ে দেয়ার নাম করে এক অষ্টাদশী তরুণী’র শ্লীলতাহানীর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে দু’বার। এসব কারণে তাঁকে কমপক্ষে ৫বার শাস্তিমূলক বদলী করা হয়। এ ব্যাপারে বিভাগীয় মামলা ছাড়াও আদালতে মামলা হয়। প্রতিবারই তিনি আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে এবং কর্তৃপক্ষকে মোটা অংকের টাকায় ম্যানেজ করে এখন পর্যন্ত অদৃশ্য খুঁটির জোরে বহাল তবিয়তে আছেন। তাঁর সকল কর্মস্থলে একটা না একটা অপকর্ম ঘটিয়েছেন। ফলে এখন আতঙ্কের নাম শিক্ষক মোখলেছুর রহমান। লম্পট এ শিক্ষকের হাতে নারী সহকর্মী, ছাত্রী, ছাত্রী’র মা-বোন, স্কুল পার্শবর্তী নারী কেউ নিরাপদ নয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিস তার শক্তির কাছে মাথানত করে আছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করেও শিক্ষা বিভাগ কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় তারা হতাশ। উল্টো অভিযোগকারীদের হেনস্তার স্বীকার হতে হচ্ছে শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। এ কারণে মোখলেছুর দোর্দন্ড প্রতাপে তার অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানাযায়, অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান যেখানেই চাকুরী করেছেন সেখানেই অপকর্ম করে স্থানীয়দের দ্বারা শালিস বৈঠকের মাধ্যমে টাকা-পয়সা দিয়ে নিজেকে রক্ষা করছেন। তার অপকর্ম প্রথম বেড়িয়ে পড়ে ১৯৯৮ সালে। এসময় তিনি ভীমশর্মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরীরত অবস্থায় এক সহকারি শিক্ষিকাকে লাইব্রেরী রুমে জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় নওদাবস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে সময়মতো স্কুলে উপস্থিত না হওয়া এবং এলাকার লোকজনের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ায় তাকে ২০০০ সালে বদলি করা হয় রামহরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এখানে এসে স্কুলের এক শিক্ষার্থীর মায়ের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। একদিন স্থানীয়রা তাকে হাতেনাতে আটক করে। পরে শালিস বৈঠকে ৫০হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে দফারফা করেন। এ ঘটনার তাকে ফরকেটহাট বিশেষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। এখানে বিদ্যালয়ের পাশের বাড়িতে সাইকেল রাখার সুবাদে সখ্যতা গড়ে উঠে ওই বাড়ির এক অষ্টাদশী মেয়ের সাথে। মেয়েটিকে তার শ্যালকের সাথে বিয়ের কথা বলে সিঙ্গারডাবড়ীহাটস্থ নিজ বাড়ীতে নিয়ে আসেন তিনি। এখানে সুযোগ পেয়ে শ্লীলতাহানী’র সময় স্থানীয়দের হাতে ধরাপরেন। এসময় তাৎক্ষণিক ৬০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে রক্ষা পান তিনি। এ ঘটনার পর টানা ১৫দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন। এরপর বদলী হন সুন্দরগ্রাম পুটিকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই স্কুলে’র ৫ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর সাথে ২০০২সালে অবৈধ সম্পর্কে জরিয়ে পরে হাতেনাথে ধরা পড়েন। স্থানীয়রা তাঁকে উত্তম-মধ্যম দিয়ে রুমে তালাবদ্ধ করে রাখে। পরে রাজারহাট থানার পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। থানা ৩০হাজার টাকা নিয়ে মাঝ পথে শিক্ষককে ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগ করেন ঐ স্কুলের তৎকালিন সভাপতি ও বর্তমান প্রেসক্লাব রাজারহাট সভাপতি এস এ বাবলু।
এ ব্যাপারে আদালতে মামলা হলে ২ মাস স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন তিনি। পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে আসেন। এ বিষয়টিও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে রফাদফা করে স্কুলে যোগদান করেন। ২০০৭ সালে তাকে বদলি করা হয় চর খিতাব খাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আতœসাৎ করেন। এ অভিযোগে ২০১৩সালে তাকে আবারও শাস্তিমূলক বদলি করা হয় ঘড়িয়ালডাঙ্গা পুটিকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
সর্বশেষ এই স্কুলের এক সহকারি শিক্ষিকার সাথে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার ও অশ্লীল কথাবার্তা বিষয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ২০১৫সাল থেকে। মৌখিক অভিযোগ করে উল্টো হয়রানীর শিকার হতে হয় তাঁকে। পরে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অডিও’তে ধারণ করা কথাবার্তাসহ লিখিত অভিযোগ শিক্ষা বিভাগে পেশ করা হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রধান শিক্ষক সহকারি শিক্ষিকাকে লাথি মেরে স্কুল থেকে বের করার হুমকী দেন প্রকাশ্যেই। ফলে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি বারবার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আসছেন। বিভাগীয় তদন্ত এবং আদালতেও তিনি নির্দোষ প্রমানিত হন। এবারও তিনি তদন্তে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবেন বলে দাবি করেন।
রাজারহাট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আকতারী পারভীন জানান, অভিযুক্ত ঐ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সহকারি শিক্ষিকার শ্লীলতাহানী’র চেষ্টাসহ উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। আর এখন শ্লীলতাহানী’র চেষ্টার অভিযোগের দালিলিক প্রমাণাদি নিয়ে তদন্ত চলছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এনামুল হক জানান, পুটিকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান একজন দুর্নীতিবাজ ও চরিত্রহীন মানুষ এই মর্মে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সহকারি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এস এম শাহজাহান সিদ্দিকীকে বিষয়টি তদন্ত করছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি দেখার দায়িত্ব শিক্ষা বিভাগের। এখানে উপজেলা প্রশাসনের করার কিছুই নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ