এম আর মহসিন, সিসি নিউজ: সৈয়দপুর ষ্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। তবে খবর রাখেন নি কেহই এ ষ্টেডিয়ামের অতিত ইতিহাস। অবাঙ্গালিদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানোর দ্বিতিয় বধ্যভুমিটি যে ষ্টেডিয়ামেই। তাই এ স্থানেই স্বৃতি হাতরিয়ে বারবার খোঁজেন প্রিয়জনদের। তবে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে আজ ৪৬ বছরেও যে শহীদের স্ত্রী হওয়ার সম্মান জোটেনি। তেমনি একজন শহীদের হতভাগী স্ত্রী আম্বিয়া বেগম(৭০)। মহান মুক্তিযুদ্ধ মানেই এ বিধবার কাছে প্রিয়জন বিয়োগান্তের অফুরন্ত যন্ত্রনা। যা আজো বহন করছেন নিরব আর্তনাদ আর চোখের শুকিয়ে যাওয়া জলে।
জানা যায়, এ শহরের কুন্দল পূর্ব পাড়া এলাকার নজীর উদ্দিনের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন আব্দুর রহিম (ভোলা)। আম্বিয়া বেগম এর সাথে বিয়ে হয় ১৯৬০ সালে। দশ বছরের দাম্পত্য জীবনে কোল জুড়ে আসে দুটি সন্তান। ১৯৭১ সালে ছিলেন ৩য় সন্তান সম্ভবা। তাই পারিবারিক নিয়ম অনুযায়ি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই যান কোলের দুই শিশু আবেদুল (৭) ও রবিউল (৩) কে নিয়ে নীলফামারীর সংগলশী এলাকার কাজিরহাটে পিতার বাড়িতে। এরপর যুদ্ধ শুরু হলে স্বামীর সাথে শেষ দেখা আর হয়নি। দেশ স্বাধীন হবে স্বামীর কাছে ফিরবেন আবারো তাদের সংসার সুখে ভরে উঠবে । এমন প্রত্যাশাই ছিল তার।
তবে তার সে আশা পুরণ হয়নি। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয়ে বিজয় অর্জন করলেও পরের দিন রাতে প্রসুতি অবস্থায় খবর পান তার প্রানপ্রিয় স্বামী আর এ দুনিয়ায় নেই। এতটুকু খবরই যেন দেহের পাজর ভেঙ্গে দেয় এ শহীদ বিধবা পত্নীর। তার কোল জুড়ে ৩য় সন্তান পৃথিবীতে এসেই এতিম হয়ে যায়। পরে মৃত্যু সংবাদ পেলেও তাকে আর দেখতে দেয়া হয়নি স্বামীর মুখখানি। এ কথা গুলো বলতেই কেদেঁ ওঠেন আম্বিয়া বেগম। এরপর শ্বশুড় বাড়িতে থেকেই সন্তানদের বড় করেন বাড়ির গৃহস্থলি কাজ করে। কোন এলাকায় মজুরের কাজ করে বড় হয়েছেন। জীবন সংগ্রামে থেমে থাকেন নি এ শহীদ পত্নীর তিন সন্তান। তবে আম্বিয়া বেগমের বড় ছেলে আবেদুল পিতার শহীদি মর্যাদা না দেখেই গত তিন মাস আগে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামী হারার শোক কাটিয়ে সন্তানদের মুখপানে দীর্ঘ চার যুগ কাটালেও বড় সন্তান কে হারিয়ে মুসড়ে পড়েছেন আম্বিয়া। তাই স্বামির শহিদী মর্যাদা হোক বা না হোক এখন আর প্রশ্ন করেন না। শুধু অপেক্ষায় আছেন পরপারে যাওয়ার।
দিতী¡য় সন্তান রবিউল(৪৭) বলেন, বাবার শহীদ হওয়ার স্বীকৃতি না দেখেই ভাই চলে গেল। মায়ের বয়স হয়েছে। এরপর আমাদের সন্তানরা কি পাবে গৌরবের এই পদবীর বাহকের সুযোগ। একই প্রশ্ন ৩য় সন্তান হামিদুল(৪৩)এর। হামিদুল বলেন, ১৯৮০ এর দশকে মাকে একটি সাদা শাড়ি ও পঞ্চাশটি টাকা দেয়া হয়েছিল সে সময়কার মুক্তিযোদ্ধা অফিস হতে। এরপর আর কেহ কোন খবর রাখেননি। অথচ এ ষ্টেডিয়ামেই মহান বিজয় দিবস উৎসাহ-উদ্দিপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। এখান কার কোন কর্তপক্ষ এ বদ্ধ্যভুমিটি সংরক্ষন ও এখানে শহীদদের নামের তালিকা প্রকাশ করেন নি। তাই এ বিজয় দিবসে এ বধ্যভুমিটিতে শহীদদের সৈয়দপুর ষ্টেডিয়ামের অনারম্বর কর্মসুচি শ্রদ্ধার মাধ্যমে পালিত হওয়া উচিত বলে মনে করেন বর্তমান প্রজন্মসহ স্থানিয় সচেতন মহল এবং শহীদ বিধবা পত্নী আম্বিয়া বেগম।
এ নিয়ে কথা হয় সৈয়দপুর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার একরামুল হকের সাথে। এ বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, স্থানিয় শহীদদের তালিকায় ১৫৮ নম্বরে আম্বিয়ার স্বামির নাম আছে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে যাতে শহীদি মর্যাদা পায়।