সিসি ডেস্ক: আজ ৩০ ডিসেম্বর। ২০০৬ সালের এই দিনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই ১০ বছরে সাদ্দাম কি ইরাকিদের মন থেকে মুছে গেছেন? বাস্তব অবস্থা বলছে, ‘না, সাদ্দাম এখনো জীবন্ত’।
বাগদাদের তরুণ দোকানি আনোয়ার। সাদ্দাম হোসেনের ছবি, প্রতিকৃতিসংবলিত মুদ্রা ও ডাকটিকিট বিক্রি করেন তিনি। এই স্বৈরশাসকের দিব্যি ‘বেঁচে থাকার’ কথাই যেন বলে যাচ্ছে আনোয়ারের দোকানটি। সঙ্গে মনের খোরাক জুগিয়ে যাচ্ছে স্মৃতিকাতর ইরাকিদের।
বিরোধীদের কাছে সাদ্দাম একজন নিষ্ঠুর শাসক; যিনি তার দেশকে দুটি ভয়াবহ যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। বিপরীতে এমন লোক আছেন যারা গভীর মমতা ও ভালোবাসায় তার অবদানকে স্মরণ করে বেঁচে আছেন। বিশেষত, ২০০৩ সালে ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার পর থেকে ইরাকে চলতে থাকা রক্তক্ষয় ও অকার্যকর সরকারের অধীন দেশের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা তুলনা করে তাদের কাছে স্মরণীয় সাদ্দাম।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে ভরা ওই দোকানের মালিক আনোয়ার সে জন্যই হয়তো অতিযত্নে চামড়ার খাপে খোদাই করে লিখে রেখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের পক্ষ থেকে’। এ লেখা তুলে ধরছে তার দোকানের পরিচিতিকে। দোকানের এক একটা সামগ্রীর তাৎপর্য তুলে ধরছিলেন আনোয়ার। বলছিলেন, এটা একটা উপহার, যা সাদ্দাম তার ত্যাগী কর্মকর্তাদের দিতেন।
তিনি বলেন, “আমি সব সময় সাদ্দামের স্মৃতিবিজড়িত জিনিস খুঁজি। তেমনটা পেলে অনেক সময় সেটা নিজের জন্যই রেখে দিই।”
সাদ্দামের প্রতি এই ভালোবাসা দেখানোর যুক্তি দিয়ে আনোয়ার বলেন, সাদ্দাম জানতেন কীভাবে দেশ শাসন করতে হয়।
আনোয়ারের দোকানে সাদ্দাম হোসেনের ছবি-সংবলিত ডাকটিকিট ও তার ছবি নিয়ে করা বইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন আবু ওসামা নামের এক ক্রেতা। তিনি একজন সুন্নি। সাদ্দামের সেনাবাহিনীর একজন সদস্যও ছিলেন তিনি। কিন্তু বলছিলেন, তিনি তার সাবেক এই কমান্ডার-ইন-চিফের সমর্থক নন।
তবে বলেন, “আমি ন্যায়বিচার ভালোবাসি। আজ সেটাই আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছে।”
প্রথমে সাদ্দাম হোসেন জেনারেল আহমেদ হাসান আল বকরের উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন। সেই সময় সাদ্দাম দৃঢ়ভাবে সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার বিরোধের অবসান ঘটান। এই উদ্দেশ্যে তিনি নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করেন।
ইরাকের রাষ্ট্রপতি ও বাথ পার্টির প্রধান হিসেবে সাদ্দাম হোসেন আরব জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ধর্ম নিরপেক্ষ ও আধুনিক ইরাক গড়ে তুলতে প্রয়াস নেন। এ সময়ই সাদ্দাম ইরানের সাথে ৯ বছরের যুদ্ধে জড়িয়ে পরেন (১৯৮০-১৯৮৮)। ইরাক-ইরান যুদ্ধের পরে ১৯৯১-এ সাদ্দাম উপসাগরীয় যুদ্ধে জড়িয়ে পরেন। সাদ্দাম তার মতে ইরাকের স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধের সকল পক্ষকে নির্মুল করার উদ্যোগ নেন। এই বিরুদ্ধ পক্ষে ছিল উপজাতীয় ও ধর্মীয় গোত্র গুলো যারা স্বাধীনতা দাবি করছিল। যেমন, ইরাকি শিয়া মুসলমান, কুর্দি, ইরাকি তুর্কি জনগন।
২০০৩ সালে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে কতিপয় আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে। তারা এই যুক্তি দেখিয়ে আক্রমণ করে যে, সাদ্দাম ব্যাপক ধ্বংসাত্বক জীবানু অস্ত্র তৈরি করছেন (যদিও যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে এমন কোন অস্ত্রের হদিস পাওয়া যায় নাই)। ১৩ ডিসেম্বর ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন আমেরিকান সেনাদের কাছে ধরা পড়েন।
পরবর্তিতে আমেরিকা ইরাকি সরকারের হাতে সাদ্দাম হোসেনের বিচার করে। সাদ্দামের বিরুদ্ধে ছিল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইরাকি সময় সকাল ৬.০৬ মিনিটে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসি কার্যকর হয়।