পড়ন্ত বিকেল শেষে সন্ধে হতে শুরু করেছে। সবাই এদিকওদিক নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। অন্যদিনের তুলনায় এদিন রহমত সাহেবের বাড়িতে কেমন যেনো একটা উৎসব উৎসব আমেজ বিরাজ করছে। দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয় স্বজনেরা এসে ভীর করেছে রহমত সাহেবের বাড়িতে। হরেক রকমের রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত বাড়ির মহিলারা। আর রহমত সাহেব এদিকওদিক শুধু পায়চারি করে চলছে আর সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা সেদিকে খবরদারি করছে। রহমত সাহেবকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি কারো অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে এদিকওদিক ছুটাছুটি করছেন।
.
হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে পুরো বাড়ির সবার যেনো অপেক্ষার অবসান হলো। দরজা খুলে মেহমানদারি করে অতিথিবৃন্দকে বাড়িতে প্রবেশ করানো হলো। আতিথ্য গ্রহণকারী সালাম সাহেব ও রাহেলা বেগম তাদের ইঞ্জিয়ারিং পাশ করা একমাত্র ছেলে আকাশকে নিয়ে রহমত সাহেবের আপ্যায়ন গ্রহনে ব্যস্ত। বসার ঘরে অতিথিদের সাথে বাড়ির সবাই নানান গল্পগুজব করছে। খানিকবাদে রাহেলা বেগম বলে উঠলেন কই আপনাদের মেয়ে, মেয়েকে নিয়ে আসুন একটু দেখি।
.
রহমত সাহেবের একমাত্র আদরের মেয়ে অধরা সবেমাত্র মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। আর তাতেই বাড়ির সবাই উদগ্রীব অধরাকে বিয়ে দেয়ার জন্য। যদিওবা অধরা এখুনি বিয়ে করতে রাজি নয়। তারপরও বাড়ির সবার মতামতের কাছে অধরার ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনেক তুচ্ছ। বাড়ির সবাইকে খুশি রাখতে অধরার ইচ্ছা না থাকা সত্তেও সে রাজি বিয়েতে। আর সেজন্যই চলছে বেশ ঘটা করে ছেলে দেখা। অনেক খোঁজাখুঁজি করে অধরার বাবা আকাশ নামক সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুদর্শন এক ছেলেকে অধরার জন্য পাত্র নির্বাচন করে। আর সে উপলক্ষেই আজ ছেলে পক্ষ অধরাকে দেখতে এসেছে।
.
ভিতর দেখে অধরাকে সবার সামনে নিয়ে আসা হলো। অধরাকে আজ দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে। মনে হয় যেনো আকাশের সব জোসনা অধরার চোখেমুখে ছলছল করছে। মুরুব্বীরা সবাই গল্পগুজবে মগ্ন। এখনো ছেলে ও মেয়ের মধ্যে একে অপরকে দর্শন হয়নি। অধরা নিজের লাজভয় ঢাকানোর জন্য নয়, নিজের গম্ভীরতা ঢাকানোর জন্য লম্বা ঘুমটা দিয়ে রেখেছে। খানিক বাদে অধরার চাচী ঘোমটা সরিয়ে নিলে প্রথমবারের মতো ছেলে ও মেয়ের মধ্যে চোখাচোখি হয়।
.
অধরা আকাশকে দেখে যেনো বিদ্যুৎ শক খাওয়ার মতো অবস্থা। এ তো সেই ছেলে, যে ছেলে আজ হতে ৮ বছর আগে ফুল হাতে অধরাকে ভালোবাসা নিবেদন করেছিলো। কিন্তু অধরা আকাশের ভালোবাসা গ্রহণ করে নি। আকাশকে বাজে ভাবে অপমান করে অধরা তাড়িয়ে দিয়েছিলো।
.
অধরার পরিবার অনেকটা রক্ষণশীল প্রকৃতির। মেয়ের ব্যাপারে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার একমাত্র অধিকার পরিবারের কর্তাদের। অধরা ভালো করে জানতো যে তার ভালোলাগা আর ভালো না লাগার কোন মূল্যায়ন নেই তার পরিবারে। তাই সে কখনোই কারো ভালোবাসার পূজারি হয়ে বেচে থাকতে চায়নি। কারন তা যে তার রক্ষণশীল পরিবারে কখনো পূরন হবার নয়।
.
অনেক বছর আগের কথা অধরার ছোট ফুফু এক পাষন্ডকে ভালোবেসে বাড়ি ছেড়েছিলো। কিন্তু সে প্রতারক প্রেমিক তার ভালোবাসা অগ্রাহ্য করে তাকে গ্রহণ করতে অস্বিকৃতি জানায়। পরব্রতীতে তার ফলস্বরূপ অধরার ফুফু নিজেকে দেয় আত্বাহুতি। সেই থেকে অধরার পরিবার প্রেম-ভালবাসার প্রতি বিদ্বেষ মনোভবের অধিকারী। তাই অধরাও কখনো এ পথে পা বাড়ায় নি, আর কখনো বাঁড়াবে না বলেও সে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।
.
আজ দু’মাস পর পারিবারিক ভাবে অধরা ও আকাশের ধুমধাম করে বিয়ে। অধরাদের পুরো বাড়ি রংবেরঙের বাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে।দূরদূরান্তের হাজারো আত্বীয় স্বজনের ভীরে পুরো বাড়ি পূর্ণ। অতঃপরে দুইয়ে দুইয়ে চার হাত মিলিয়ে দিয়ে বিয়ে নামক এক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করানো হয় অধরা ও আকাশকে।
.
আকাশ বর বেসে বাসরঘরে প্রবেশ করলে অধরা উঠে গিয়ে স্বামীকে সালাম করে।
– আচ্ছা আপনি কি আমাকে চিনছেন? (অধরা)
– হুম (আকাশ)
– আপনার মনে আছে কি আমি আপনাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিছিলাম? (অধরা)
– হুম….খুব করে মনে আছে, সেদিন আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন সন্ধেবেলা আপনার এক বন্ধু আপনার ফুফুর অাত্বাহুতির কথা এবং আপনার পরিবারের কঠোরতার কথা জানিয়েছিলো। সেদিন থেকেই মনেমনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যেকোন মূল্যেই হোক আমাকে আপনার পরিবারের সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। কারন আমি ভালো করে জানতাম আপনার পরিবারে ভালোবাসা মেনে নিবে না, (আকাশ)
– আমাকে এতো ভালোবাসতেন? (অধরা)
– ভালোবাসি কিনা জানিনা, কিন্তু আপনার জন্যে আমার এতো সব প্রচেষ্টা। সবসময় আপনি ছায়া হয়ে আমার মনের আকাশে বিচরণ করতেন। আর আমি সেই অধরা ছায়াকে ছুতে সর্বদা উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। কিন্তু ভালো করে জানতাম শুধু মনেমনে ভালোবাসার ঘর বাধলে হবে না, জীবনে ভালো কিছু করে আপনার পরিবারকে আকৃষ্ট করতে হবে। আচ্ছা আপনি কি আমায় ভালোবাসতেন? (আকাশ)
– আসলে আমাদের সমাজের আমাদের মেয়েদের ভালোলাগা, ভালোবাসা ইত্যাদির মূল্যায়ন করা হয় না। মেয়ে হয়ে জন্মা মানে অন্যের মতো করে চলা। যেখানে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা খুবই নগণ্য। আপনাকে ভালো লেগেছিলো আমারো কিন্তু কি লাভ আপনাকে মিছে স্বপ্নের জালে ভাসিয়ে। কেনোনা তা যে পূরন হবার ছিলো না। আর আমিও বাবা-মাকে ছেরে সুখে হওয়ার কথা কল্পনাও করতাম না। তাই নিজের ভালোলাগা গুলো অন্যসব মেয়ের মতো আমার মাঝেও চাপা পড়ে ছিলো। কিন্তু আজ মনপ্রান খুলে খুব করে বলতে ইচ্ছে করছে ভালোবাসি! ভালোবাসি! ভালোবাসি! আকশ তোমায় অনেক ভালোবাসি (অধরা)
– আমি মনে মনে বিশ্বাস করতাম এবং ভাবতাম তুমিও আমায় ভালোবাসো। তাই নিজের ভবিষ্যৎটা সুমধুর ভাবে গড়ে তোমার পরিবারের সামনে হাজির হতে চেয়েছি। যাতে করে তোমার পরিবার আমাকে ফিরিয়ে না দেয়। (আকাশ)
.
অধরা আকাশের বুকে মাথা রেখে শুধুই অঝোরে কাঁদছে, আর আকাশ অধরাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে রেখেছে। অধরার এ কান্না নয় কোন দুংখের, নয় কোন আক্ষেপের, অধরার এ কান্না শুধুই মধুর ও সুখের। অধরাকে পেয়ে যেনো আকাশের পূর্ণ সব চাওয়া-পাওয়া। একেই বুঝি বলে স্বার্থক ভালোবাসা।
.
[আকাশ ও অধরা বিয়ের আগে প্রেম করে নি, এখন হয়তো তারা বিয়ের পর চুটিয়ে প্রেম করবে। যেখানে থাকবেনা কোন বাধা, না কোন সামাজিক বা পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা। আকাশ অধরাকে ছুতে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নিজেকে করেছে পরিপূর্ণ। যাতে অধরার পরিবার হয়েছে আকাশের প্রতি আকৃষ্ট। অধরা ও আকাশকে যেতে হয়নি বাড়ি থেকে পালিয়ে। তাদের ভালোবাসার জোর মজবুত থাকায় তারা সবার সম্মতিক্রমে বসেছিলো বিয়ের পিরিতে। আর তাই অন্ধ ভালোবাসার বশভূতি না হয়ে, কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নিজের প্রচেষ্টাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে পরিপূর্ণ রুপে প্রস্তুত করুন। দেখবেন আপনার ভালোবাসা যদি সত্য হয়, আপনার ভাগ্য যদি ভালো হয় তবে আপনার মনের মানুষটি শুধুই আপনার হবে।]