• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫১ অপরাহ্ন |

দিনাজপুর বিএনপি’র হযবরল অবস্থা

মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর: দিনাজপুরে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় দলের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। নেতৃত্বের কোন্দল, সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা ও অধিকাংশ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হামলার কারণে নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। ফলে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচীসহ জেলা বিএনপির কোন কর্মসূচীও সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না দলটি।
অপরদিকে গতবছরের ২৯ আগষ্ট জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে আহবায়ক কমিটি গঠনের প্রায় ৫ মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। বর্তমান আহবায়ক কমিটি সাংগঠনিকভাবে যাতে ব্যর্থ প্রমাণিত হয় সেজন্য এই কমিটির অনেক নেতাই নানান কোটকৌশল চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অনেক নেতাকর্মী জানান। তবে  আহবায়কসহ কয়েকজন সদস্য অনেক চেষ্টা করেও আহবায়ক কমিটির বিরোধ মেটাতে পারছেন না।
এদিকে জেলা বিএনপির ২২টি ইউনিটের মধ্যে একটিতেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিকদল, কৃষকদল, মহিলাদল, তাঁতীদলসহ ১১টি অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের কোনটিতেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। এসব সংগঠনের ৫ বছর হতে ১৮ বছর পর্যন্ত কোন কমিটি গঠিত হয়নি। এসব সংগঠন চলছে আহবায়ক কমিটি দিয়ে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কোন কর্মকান্ড চোখে পড়ে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদলের কোন অবস্থান আছে বলে মনে হয় না। সব মিলে বর্তমানে দিনাজপুর বিএনপিসহ সকল অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের রাজনীতির বেহাল দশা।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের আস্থাভাজন দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম রংপুর বিভাগীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনিত হওয়ায় জেলার অনেক নেতাকর্মী মনে করেছিলেন যে, এবারে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালী হবে। কিন্তু বাস্তবে তার কোন প্রতিফলণ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি সৈয়দ জহাঙ্গীর আলম তাঁর দলীয় কার্যক্রমে সরব উপস্থিতি দেখা যায়নি।
২০১৬ সালের ২৯ আগষ্ট দিনাজপুর জেলা বিএনপি’র কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে ৫১ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি গঠন করা হলে কতিপয় নেতাকর্মী আহবায়ক কমিটিতে স্থান পেতে দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলয়ে দিয়ে আন্দোলনে নামে। এর প্রেক্ষিতে কয়েক দফায় কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে সর্বশেষ ১২৯ সদস্যবিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। যা আদৌ ঠিক হয়নি বলে অনেকেই মনে করেন। বর্ধিত এই কমিটি করার কারণে এখন গোটা জেলার নেতাকর্মী আহবায়ক কমিটিতে অন্তভুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এরই মধ্যে প্রায় ৩ শতাধিক নাম আহবায়কের নিকট জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ২০১০ সালে জাহাঙ্গীর আলমকে আহবায়ক এবং আব্দুল মোন্নাফ মুকুল, মাসুদুল ইসলাম মাসুদ, সোহেল নিশাত ও রাশেদুজ্জামান রাশেদকে যুগ্ম আহবায়ক করে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট জেলা যুবদলের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। তিন মাসের মধ্যে জেলা যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও গত ৮ বছরেও যুবদলের ২২টি ইউনিটের মধ্যে একটির কমিটি গঠন করতে পারেনি।
অপরদিকে একাধারে ১০ বছর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়কের দায়িত্বে থেকে কাউন্সিল করতে ব্যর্থ হলেও ২০১০ সালে বর্তমান দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম ৯০ দিনের মধ্যে কাউন্সিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৩ জন যুগ্ম আহবায়ককে সাথে নিয়ে পুনরায় আহবায়কের দায়িত্ব গ্রহন করেন। তারাও দীর্ঘ ১৮ বছরে কোন ইউনিটের কমিটি গঠন করতে পারেননি। বর্তমান আহবায়ক কমিটির অধিকাংশ যুগ্ম আহবায়কই দলের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন।
এদিকে ২০০৬ সালের জুন মাসে মোস্তফা কামাল মিলনকে আহবায়ক ও মাহবুবুল হক হেলালকে সদস্য সচিব করে জেলা ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ২০১০ সালের ২৯ জানুয়ারী মাহবুবুল হক হেলাল ছাত্রদলের সদস্য সচিব হতে জেলা বিএনপি’র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। পরে ছাত্র নেতা মকসেদুল হক টুটুলকে ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। ছাত্রদলও ১১ বছরে কোন ইউনিটের কমিটি গঠন করতে পারেনি। আহবায়ক কমিটি দিয়েই চলছে জেলা ছাত্রদলের কার্যক্রম।
এভাবে দীর্ঘ ১২ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে জেলা শ্রমিকদল, ১৮ বছর ধরে আহবায়ক কমিটি দিয়ে চলছে স্বেচ্ছাসেবক দল, ১০ বছর ধরে মহিলাদল, দীর্ঘদিন ধরে চলছে কৃষকদল। অন্যান্য অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনগুলোর অবস্থা একই। দিনাজপুর সদর উপজেলা এবং পৌর বিএনপির ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সাংগঠনিক অবস্থা খুবই নাজুক। অধিকাংশ নেতাকর্মীকে দলের কোন কর্মকান্ডে দেখা যায় না।
সদ্য বিলুপ্ত জেলা কমিটির প্রথম সারির কতিপয় নেতা বিগত আন্দোলন সংগ্রামে এবং সাংগঠনিক কর্মকান্ডে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তাদের কার্যকলাপও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তৃণমূল পর্যায়ে তাদের নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। এসব নেতাদের অনেকই কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হোক এমনটি তারা চান না। তারাই আবার আহবায়ক কমিটির প্রথম সারিতে স্থান পেয়েছেন। এই কারণে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এসব বিবেচনায় অবিলম্বে কাউন্সিলের মাধ্যমে দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলা ও ৯টি পৌরসভাসহ বিএনপির ২২টি ইউনিট এবং সকল অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা না হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলকে অনেক সমস্যার সম্মূখিন হতে হবে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন।
এদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদ নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। কে হচ্ছেন জেলা বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক ?
সভাপতি পদে জেলাসহ বিভিন্ন উপজেলার সাধারণ নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে যাদের নাম জানা গেছে, তাদের মধ্যে তিনজনের নাম বেশী শোনা যাচ্ছে। এই ৩ জনের মধ্যে রয়েছেন-এজেডএম রেজওয়ানুল হক, আখতারুজ্জামান মিয়া ও সদ্য বিদায়ী জেলা বিএনপির সভাপতি মো. লুৎফর রহমান মিন্টু। তাদের মধ্যে প্রথম দু’জন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। দলের নেতাকর্মীদের মাঝে এ দু’জনেরই গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এজেডএম রেজওয়ানুল হক বিগত দিনে পরিচ্ছন্ন একটি কাউন্সিল উপহার দেয়ার কারণে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে সুনাম কুড়িয়েছিলেন।
অপরদিকে আখতারুজ্জামান মিয়া একজন সফল সংগঠক হিসেবে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মাঝে সমাদৃত। মাঠ পর্যায়ের সাধারণ নেতাকর্মীদের তাঁর প্রতি যথেষ্ট সমর্থন রয়েছে। এছাড়া জেলা বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি মো. লুৎফর রহমান মিন্টু একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও নিরীহ ব্যক্তি। তিনি বিগত দিনে বিএনপিকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা করলেও অনেক ক্ষেত্রে সফল হতে পারেননি। নেতাকর্মীদের মাঝে তাঁর কোন নিয়ন্ত্রন আছে বলে অনেকেই মনে করেন না। এসব বিবেচনায় জেলা বিএনপির সভাপতি পদে লুৎফর রহমান মিন্টুর সমর্থনের অনেকটা ঘাটতি রয়েছে।
অপরদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে মো. মোকাররম হোসেন, হাসানুজ্জামান উজ্জল ও বখতিয়ার আহম্মেদ কচির নাম শোনা যাচ্ছে। তবে তাঁদের মধ্যে মোকাররম হোসেনের নাম জেলা বিএনপিসহ অন্যান্য মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশী আলোচিত হচ্ছে।
কারণ হিসেবে বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, মো. মোকাররম হোসেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরপর দু’বার সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভুমিকা পালন করেছেন। নেতাকর্মীদের সহায়তা দেয়ার চেষ্টাও করেছেন এবং অনেকের মামলা-মোকাদ্দমার ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন বলে অনেক ভুক্তভোগি জানান। এছাড়া তিনি ২০০৯ সালে দিনাজপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এছাড়া হাসানুজ্জামান উজ্জল ও বখতিয়ার আহম্মেদ কচিও সাধারণ সম্পাদক পদে লড়তে সমর্থকদের নিয়ে মাঠে নেমেছেন। হাসানুজ্জামান উজ্জল জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। অনেকেই মনে করেন রাজনীতিতে তাঁর উজ্জল ভবিষ্যৎ ছিল। কিন্তু তাঁর কিছু কর্মকান্ডের কারণে দলে বিস্তর সমালোচনা রয়েছে।
অপরদিকে বখতিয়ার আহম্মেদ কচি স্বেচ্ছাসেবক দল দিনাজপুর পৌর কমিটির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত দিনে আন্দোলনে তার ভুমিকা থাকলেও বর্তমান আহবায়ক কমিটি গঠনের পর জেলা বিএনপির কার্যালয়ে তালা ঝুলানোর কারণে অনেকেই তার প্রতি বিরুপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যা দলের সুনাম অনেকটাই ক্ষুন্ন হয়েছে। তাছাড়া তিনি বয়সেও অনেক তরুন। এ কারণে বিএনপির মত এতো বড় একটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক পদে দলীয় নেতাকর্মীরা কিভাবে গ্রহণ করবেন তাও ভাববার বিষয়?
এদিকে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে যুবনেতা আমিনুল ইসলাম মুন্নাসহ আরো কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে জানা গেছে। বিগত আন্দোলনে মুন্না দলীয় কর্মকান্ডে সক্রিয় ভুমিকা রাখার কারণে অনেকেই তাঁর প্রতি সহানুভুতিশীল।
বর্তমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করে দলকে সুসংগঠিত করতে সাহসী, নিষ্ঠাবান ও গ্রহণযোগ্য নেতা নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। দলীয় নেতাকর্মীরা চানÑ একটি গ্রহণযোগ্য কাউন্সিলের মাধ্যমে তাদের নেতানেত্রী নির্বাচিত হয়ে আসুক এবং জেলার ২২টি ইউনিটই দ্রুত গঠন করে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলা হোক। দলের কেন্দ্রীয় নেতাসহ সংশ্লিষ্ট সবার এ বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয় বিএনপিসহ অভিজ্ঞমহল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ