সিসি নিউজ: রংপুর বিভাগের ছয় জেলা কারাগারে ৩৬ আসামি বিনা বিচারে আটক আছেন। পাঁচ বছর ধরে শুরু করে ৯ বছর পর্যন্ত সময় ধরে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন তারা। এ সময়ের মধ্যে শত শত বার তাদের কারাগার থেকে আদালতে আনা-নেওয়া হলেও এদের কারও মামলার বিচার শুরু হয়নি। বারবার মামলার তারিখ পিছিয়ে যাচ্ছে। একদিকে তারা বিনা বিচারে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ধুঁকছেন। অন্যদিকে তাদের পরিবার বিচারের আশায় আদালত আর কারাগারে ধরনা দিতে দিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
রংপুরে অবস্থিত ডিআইজি প্রিজন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বেপারী পাড়া গ্রামের ওমর আলীর ছেলে আব্দুর রহিম ২০০৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আটক আছে। প্রায় ১০ বছরে ১১৬ বার তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়েছে, তবে আজও শুরু হয়নি তার বিচার।
একই অবস্থা রংপুর নগরীর খামারপাড়া মহল্লার মমতাজ আলীর ছেলে নাজমুল হোসেনের। তিনিও ২০০৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে প্রায় আট বছর ধরে কারাগারে আটক আছেন। এই দীর্ঘ সময়ে ৮৮ বার তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে এখন পর্যন্ত তার মামলার বিচার শুরুই হয়নি। তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা রয়েছে যার দায়রা নম্বর ১৬২/১০ইং। আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় তার পক্ষে জামিনের আবেদন করার সঙ্গতি নেই নাজমুলের স্বজনদের।
দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার ভুষির বন্দর গ্রামের জহর আলীর ছেলে খায়রুল ইসলাম ২০০৭ সালের ১২ অক্টোবর থেকে দিনাজপুর কারাগারে আটক আছেন। ১০ বছরে তাকে ৪১ বার আদালতে হাজির করা হয়েছে। তার মামলার বিচারও এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি।
রহিম, নাজমুল আর খায়রুলের মতো রংপুর বিভাগের ছয় জেলার কারাগারে এ রকম ৩৬ জন বন্দি দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে আটক আছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিনা বিচারে আটক ৩৬ বন্দির মধ্যে রংপুর কারাগারে আটক আছেন ৪ জন, গাইবান্ধা কারাগারে ২ জন, কুড়িগ্রামে চারজন, নীলফামারী কারাগারে ১২ জন, দিনাজপুর কারাগারে ৯ জন এবং ঠাকুরগাঁও জেলা কারাগারে আটক রয়েছে ৫ জন।
রংপুরের সিনিয়র আইনজীবী মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের রংপুরে বিভাগীয় আহ্বায়ক এম এ বাশার বলেন, ‘আমাদের দেশে বিচার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এখানে মানবতার কোনও স্থান নেই। তা নাহলে বিনা বিচারে কিভাবে ৩৬ বন্দি ৫ থেকে ১০ বছর ধরে কারাগারে আটক থাকে।’
বাশার আরও বলেন, ‘আইনের পরিভাষায় ‘বিলম্বিত বিচার’ বিচার না পাওয়ারই শামিল। এভাবে কাউকে আটক রাখা আইনের পরিপন্থী। এটা মেনে নেওয়া যায় না। যারা দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে কারাগারে আটক আছে তারা যদি অপরাধ করে থাকে তাহলে তাদের বিচার করে শাস্তি দেওয়া হোক। তাই বলে তাদের বিনা বিচারে আটক রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।’ তিনি দ্রুত আটক বন্দিদের মামলার বিচার শেষ করা এবং তাদের মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান।
অন্যদিকে মানবাধিকার ও পরিবেশ আন্দোলন বাপার প্রধান নির্বাহী অ্যাড. মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি ইতোমধ্যেই বিনা বিচারে আটক বন্দিদের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।’ তিনি প্রধান বিচারপতির সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন কারাগারে আটক ৩৬ বন্দির দ্রুত মুক্তির দাবি জানান।
সার্বিক বিষয়ে জানতে রংপুর বিভাগীয় ডিআইজি প্রিজন অসীম কান্ত পালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিমাসেই আটক বন্দিদের সার্বিক তথ্য সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠাই। এদের ব্যাপারেও সর্বশেষ অবস্থা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘রংপুর বিভাগের চার জেলা কারাগারে তিন নারীসহ ৬২ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আটক আছে। তাদের মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এদের মধ্যে রংপুর কারাগারে তিন নারীসহ ৪৫ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, গাইবান্ধা কারাগারে তিনজন, নীলফামারী কারাগারে একজন এবং দিনাজপুর কারাগারে ১৩ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে।’