• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৮ অপরাহ্ন |

যে ভুলের মাশুল দিচ্ছে বিএনপি-জামায়াত

।। জাহাঙ্গীর আলম আনসারী ।। ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলাম যে, ৫ জানুয়ারির পর আওয়ামী লীগ যদি কোনোভাবে সরকার গঠন করতে পারে তাহলে তারা এমন কিছু কাজ করবে যার ফলে জনগণ আর সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রয়োজন মনে করবে না। আপনার দলের সিনিয়র নেতাদের দ্বারা যে সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে উঠবে এটা বিশ্বাস করার মত যুক্তিসংগত কোনো কারণও আপাতত নেই। আপনার স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত সমূহ কাগজে-পত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, ময়দানে কখনো বাস্তবায়ন হবে না। আর সরকার যদি এক্ষেত্রে সফল হয় তাহলে আপনার দল ও পরিবার দু‘টিই চরম হুমকি ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট অনেক চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারেনি। একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ফের সরকার গঠন করেছে। এর পর থেকে রাজনৈতিক ঝড় শুধু বিএনপি নামক দলটির ওপর দিয়েই বয়ে যায়নি, এ ঝড় দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারকেও আঘাত করেছে। বর্তমান বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা ও দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পরিবার যে কতটুকু সংকটের মুখোমুখি অবস্থান করছে সেটা মনে হয় আর ব্যাখ্যা করে বুঝানোর দরকার নেই। আর এসব সংকটের মূল কারণ হল বিগত দিনে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার বিরোধী আন্দোলনে দলটির চরম ব্যর্থতা। দাবি আদায় করতে না পারা। এক বাক্যে বলা যায় বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের করে আজ পর্যন্ত কোনো দাবিই আদায় করতে পারেনি।

সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের মতামতের ভিত্তিতে অর্থাৎ বিভক্ত রায়ে ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির ওই রায়কে ভিত্তি ধরেই ২০১১ সালের ৩ জুলাই জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন বহুল জনপ্রিয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্ত ঘটায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকেই এটাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে মাঠে নামে বিএনপি-জামায়াত জোট। রোডমার্চ কর্মসূচির মাধ্যমেই তারা কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের আন্দোলনের সূচনা করেছিল। ২০১২ সালের ১১ মার্চ পর্যন্ত কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থাকে পুনরায় ফিরে আনার আল্টিমেটাম দিয়ে ১২ মার্চ ঢাকা চলো কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। এখান থেকেই মূলত শুরু হয় তাদের জুড়ালো আন্দোলন। ওই দিন সরকারের অঘোষিত হরতাল উপেক্ষা করেই বিরোধীদল নয়াপল্টনে মহাসমাবেশ করে। মহাসমাবেশ থেকে আবারো কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য ১০ জুন পর্যন্ত সরকারকে দ্বিতীয় বারের মত আল্টিমেটাম দেয়। দাবি না মানলে ১১ জুন ঢাকায় গণসমাবেশের ডাক দেয়। বিএনপি জোটের দ্বিতীয় বারের আল্টিমেটামকেও সরকার কোনো পাত্তা দেয়নি। গণসমাবেশ থেকে খালেদা জিয়া আবারো রমজানের মধ্যে কেয়ারটেকার সরকার পুনর্বহালের জন্য সরকারকে তৃতীয় বারের মত আল্টিমেটাম দেন। রমজানের পর কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত সরকার বিরোধী কঠোর আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসে বিএনপি জোট। এর মধ্যে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচিও তারা পালন করেছে। পরে ৯ ডিসেম্বরের অবরোধ কর্মসূচির পরই গাড়িতে আগুন দেয়ার মামলায় গ্রেফতার হন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর পরই বিরোধীদলের আন্দোলনে ভাটা নেমে এসে। আর ২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার দাবিতে মানববন্ধন কর্মসুচি পালন করলেও এর মাধ্যমে মূলত বিরোধীদল যে দুর্বল হয়ে পড়েছে সরকারের কাছে এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠে।

বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েক দফা হরতাল ডেকেও রাজপথে নেতাকর্মীরা দলীয় এবং সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে। আর কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য সরকার বিরোধী আন্দোলনের হুমকি ধমকি দিলেও কার্যত সরকার বিরোধী কোনো মজবুত আন্দোলন তারা গড়ে তুলতে পারেনি। কারণ, বিএনপির সিনিয়র নেতারা সব সময় রাজপথের গণআন্দোলনে অংশ না নিয়ে ঘরের মধ্যে বসেই ক্ষমতায় যাওযার স্বপ্নে বিভোর থাকা। শুধু কেয়ারটেকার সরকার ফিরিয়ে আনার আন্দোলন নয়, খুন-হত্যা, আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, লুটপাট ও জনদুর্ভোগসহ সরকার বিরোধী আন্দোলনের একাধিক ইস্যু থাকা সত্ত্বেও বড় ধরণের কোনো আন্দোলন তারা গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি, ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচির দিন গুলশানের বাসায় বালুক ট্রাক দ্বারা অবরুদ্ধ দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্যও ৫‘শ লোকের একটি মিছিল বের করতে পারেনি বিএনপি। জিয়ার সৈনিক আর খালেদা জিয়ার কামান দাবিধারদেরকে সেদিন ঢাকা শহরের কোথাও দেখা যায়নি। ওই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যম, টিভি টকশো ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিএনপির আন্দোলন, রাজনীতি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের নিস্ক্রিয়তা নিয়ে কঠোর সমালোচনা হয়েছে। তৃণমুলের নেতাকর্মীরা তখন কিছু সিনিয়র নেতাকে সরকারের এজেন্ট বলেও আখ্যায়িত করেছেন। বিগত দিনে বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনের সারমর্মটুকু তুলে ধরার জন্যই মূলত কথাগুলো বললাম।

যেটা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে সেই বহুল জনপ্রিয় কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থাকে কারা প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল? কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বাতিলের সুযোগ আওয়ামী লীগকে কারা সৃষ্টি করে দিয়েছিল? শুধু কি আওয়ামী লীগই দায়ী নাকি এর পেছনে বিএনপিরও হাত রয়েছে। এ বিষয়টা তুলে ধরার জন্যই মূলত আমার এই লেখা।

দেশের সংবিধানে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থাকে এই বলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল যে, সর্বশেষ বিদায় নেয়া প্রধান বিচারপতিই হবেন কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান। যাতে করে নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো প্রকার সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি না হয়। কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে বিগত তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বিরোধীদলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুললেও নির্বাচনের আগে কোনো রাজনৈতিক দলই এ কথা বলেনি যে অমুকের অধীনে আমরা নির্বাচনে যাবো না। শুধু মাত্র ২০০৭ সালের সাধারন নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেএম হাসানকে বিএনপির লোক বলে তার অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। সেদিন থেকেই মূলত: বাংলাদেশের এই জনপ্রিয় কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি হয়। কেয়ারটেকার সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগের সেই দিনের সন্দেহ কি অবাস্তব ছিল? দেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার কথা ছিল সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছের সাহেবের। কারণ, ২০০৭ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে তিনিই হবেন সর্বশেষ বিদায়ী প্রধান বিচারপতি। তার পূর্বে বিদায় নেয়া প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান বিএনপি ঘরানার লোক হিসেবে সবার কাছেই পরিচিত ছিলেন। জিয়াউর রহমানের সময় তিনি বিএনপির কোনো একটি সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন বলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

এটা অস্বীকার কোনো উপায় নেই যে, কেএম হাসানকে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করার উদ্দেশ্যেই মূলত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তখল কৌশলে প্রধান বিচারপতির বয়স বৃদ্ধি করেছিল। সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছের অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও আর হলো না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কেএম হাসানই হবেন কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান। এদিকে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও ঘোষণা দেয়া হল কেএম হাসানের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ গ্রহণ করবে না।

তখন আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল, ২০০৫ সালের ২৩ মে বিচারপতি এম এ আজিজকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ দেয়ার পরই তিনি বিভিন্ন স্থানে কিছু নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ ও ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ নিয়েও তখন আপত্তি তুলে আওয়ামী লীগ। এম এ আজিজকে বিএনপিপন্থী আখ্যায়িত করে তাকে সরানোরও দাবি তুলে আওয়ামী লীগ। এনিয়ে তারা তখন আন্দোলনও শুরু করে। যেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আওয়ামী লীগ এম এ আজিজকে মেনে নিচ্ছে না। তার অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে তারা। সেখানে আবার কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের নয়ছয় করাটা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত ছিল না। আর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছেরকে নিয়ে কোনো বিতর্ক কিংবা কারো কোনো আপত্তি ছিল বলে আমরা শুনিনি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে যেসব মন্ত্রী ও আমলারা দুর্নীতি-লুটপাটে লিপ্ত ছিলেন তারাই মূলত খালেদা জিয়াকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা হলে আগামীতেও আমাদের ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত। কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করার লক্ষে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি ছিল বিএনপি-জামায়াতের বড় ধরনের রাজনৈতিক ভুল। জানি না, বিএনপি-জামায়াত তাদের সেই ভুলগুলো এখনও অনুধাবন করতে পারছে কিনা? আর ওই সময়ের রাজনৈতিক সংঘাতের জন্য শুধু আওয়ামী লীগই দায়ী ছিল না। বিএনপি-জামায়াতের ভুল সিদ্ধান্তও এর পেছনে অনেক দায়ী। যদিও এটা এখন অনেকেই মানতে নারাজ।

আর বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজনৈতিক দলের নেতাদের চশমার কালারও পরিবর্তন হয়ে যায়। বিরোধী দলে থাকতে যা তারা দেখতে পান ক্ষমতায় যাওয়ার পর আর তা দেখতে পান না। ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই তখন তাদের কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে উঠে। এটা রাজনীতির বড় একটা সমস্যা। যেমন বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে এমন কিছু ভুল করছে যা তারা দেখতে পায়নি। বিরোধী দলে গেলে আবার তাদের চশমার কালার পরিবর্তন হয়ে যাবে। বিশেষ করে জনপ্রিয় কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ যে ভুলটি করেছে বিরোধী দলে যাওয়ার পর সেটা বুঝতে পারবে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার নিয়ে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ আবারো আন্দোলন-সংগ্রাম করবে। সেটা দেখার জন্য আমাদেরকে আর কিছু দিন অপেক্ষ করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ