• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২১ অপরাহ্ন |

প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবি শিক্ষার্থীর হৃদয়স্পর্শী খোলা চিঠি

সিসি নিউজ:  ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সপ্তম ব্যাচের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিস বিভাগের শামসুল ইসলাম লিখনকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা দেয়াসহ শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদপুর থানার এস আই শফিকের বিরুদ্ধে। মামলার পর থেকেই নিয়মিত মানসিক কষ্টের পাশাপাশি তাকে নানানভাবে হয়রানি করছে এসআই শফিক। এ অত্যাচার থেকে বাঁচতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন শিক্ষার্থী লিখন। পাঠকের জন্য হুবুহু তুলে ধরা হলো:

 

মমতাময়ী জননী (শেখ হাসিনা)
প্রচন্ড হতাশা ও দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে লিখছি। আমি জানি, আপনি ছাড়া মমতা নিয়ে কেউ আমার সমস্যার কথা শুনতে আসবে না। আপনি জাতির পিতার কন্যা, তাই আপনার নিকট আমার অধিকার বা আশা যাই বলি না কেন, বাকি সবার চেয়ে বেশি।

বিদ্যানন্দীনী,
আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম ব্যাচের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিস বিভাগের একজন হতভাগা ছাত্র। যার আজকে এম বি এ শেষ করে চাকরি করার কথা। যার পিতা অনেক আগেই গত হয়েছেন এবং যার পরিবার খুবই অসহায়। আজ যেখানে আমার কোনো অফিসে চাকরি করার কথা, সেখানে আমি মামলার হাজিরা দিয়ে বেড়াই। আমি জানি, আপনি আমার ব্যথা বুঝবেন। আপনিও আমার মত পিতৃহারা। আপনার কষ্টের পাশে আমার কষ্ট কিছুই না। তারপরেও অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে লিখছি। আমি জাতির জনকের হাতে গড়া ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন ক্ষুদ্র কর্মীও।

মমতাময়ী মা,
গত ১০ ডিসেম্বর ২০১৬ ইং তারিখে আমার জীবনে একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে, যা আমি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। ১১ তারিখ আমার এম বি এ ফাইনাল পরীক্ষা থাকায়, আমি বাসায় বসে পড়ছিলাম। সেদিনও মোহাম্মদপুর থানার এস আই শফিক আমাদের বাসায় আসে। উনি মাঝে মধ্যেই আসতেন। আমার মা ও বোনের সাথে দূর্ব্যবহার করতেন। আমার বড় ভাইয়ের সাথে তার ব্যবসায়িক পার্টনারের দ্বন্দ্ব থাকায়, সেই পার্টনার আমার ভাইকে শায়েস্তা করার জন্য এস আই শফিকের আশ্রয় নেয়। সেদিনও বাসায় ঢুকে আম্মা ও বোনের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে থাকে। আমার বড় ভাই কোথায় জানতে চায়। আমি পড়া বাদ দিয়ে তার সাথে কথা বলতে গিয়েছিলাম। তাকে আমি প্রতিদিন আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি আমাকে বলেন আমার বড় ভাইকে খুঁজতে এসেছেন। আমি জবাবে বলি, কোনো ওয়ারেন্ট আছে?

এই সামান্য প্রশ্নই আমার জীবনে দূর্ভোগের সূচনা করে। শফিক সাহেব বলেন, ‘পুলিশের কোনো ওয়ারেন্ট লাগে না। আয়, তোরে ওয়ারেন্ট দেখাই।’ এহেন ব্যবহারে আমি হকচকিত হয়ে যাই। তিনি আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে, আমি জগন্নাথের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেই। শফিক সাহেব বলেন, ‘তোদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথরে আমি পায়ের তলায় রাখি।’ এমন দূর্ব্যহারে আমি ভয় পেয়ে যাই। মোহাম্মদপুর থানায় আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বড় ভাই কর্মরত। তাদের পরিচয় দিলে তিনি আমাকে ক্ষমতা দেখাচ্ছি বলে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন। আমার শার্টের কলার চেপে ধরেন। আমার অসুস্থ মা এসে হাতজোড় করতে থাকলে তাকে তিনবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় এস আই শফিক। আমি কোনো উপায় না দেখে, নিজেকে ছাত্রলীগের কর্মী পরিচয় দেই। এই পরিচয়টা আমার জন্য একেবারে কাল হয়ে গেছে। জবাবে শফিক সাহেব নিজেকে মন্ত্রী মীর্জা আজমের ভাতিজীর জামাই পরিচয় দিয়ে আমাকে গেটের বাহিরে বের করে চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে। আমাকে মানুষের সামনেই চোর ডাকাতের মত থাম্বার সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে বেদম মারধর করে। রাস্তার লোকজন এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করলে আমি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।

 

কিন্তু পারিনি। আমাকে রাস্তা থেকে ধরে এনে দাঙ্গা পুলিশ নিয়ে এসে বেদম প্রহার করা হয়। তারপর কি হয়েছিল জানি না। যখন জ্ঞান ফিরে, তখন নিজেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আবিষ্কার করি। সেখান থেকে মোহাম্মদপুর থানায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। থানায় গভীর রাত পর্যন্ত কারো সাথে আমাকে দেখা করতে দেয়া হয়নি। থানার সেলে আমার হাত-পা, চোখ বেঁধে কয়েক দফা নির্যাতন করা হয়। আমি বারবার পরীক্ষার কথা বলে অনুনয়–বিনয় করলে তারা আমার হাতে প্রচণ্ড মারধোর করে। আমার মনে হচ্ছিল, ৭১ সালের কোনো পাকিস্তানি নির্যাতন ক্যাম্পে আমি বন্দী আছি।

পরদিন আমাকে কোর্টে তোলা হয়। আমার বিরুদ্ধে পুলিশকে মারধোরের অভিযোগে মিথ্যা মামলা করে এবং দশ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। মাননীয় বিচারক আমার শারীরিক অবস্থা দেখে রিমান্ড মঞ্জুর না করে জামিন দেন। আমি দুই দিন প্রায় বিনা চিকিৎসায় কারগারে থাকার পর বের হয়ে আসি। তারপর থেকে হাজিরা দিতে দিতে আজ আমি বড্ড ক্লান্ত। রাতে ঘুমের মধ্যেও দুঃস্বপ্ন দেখি। হাড়ের মধ্যে তীব্র ব্যথা অনুভব করি। আমার শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষা দিতে না পারায় ড্রপ হয়ে যায়।

মা,
আমি শুনেছি আমার নামে চার্জশিট বের হয়েছে। আমরা খুবই অসহায় পরিবার। আমার পিতা সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। যিনি দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে ডিউটি করেছেন, তার সন্তান হিসেবে আজ আমি পুলিশের চোখে অপরাধী। বাবা না থাকার কি যে কষ্ট, আপনার চেয়ে কে ভালো বলতে পারবে?

মিথ্যা সাক্ষীও হয়ত জোগাড় হয়েছে। হয়ত মিথ্যা সাক্ষীর উপড় ভিত্তি করে আমার রায় হবে। আমি সারা জীবনের জন্য পুলিশের তালিকাভুক্ত আসামি হব। সমাজের চোখে আমি দাগি আসামির তকমা পাব। কিন্তু বিশ্বাস করেন, আমি আইন বিরোধি কোনো কর্মকাণ্ড করিনি। আল্লাহ’র উপর বিশ্বাস রেখেই বলছি, আমি নির্দোষ।

এই চাপ সামালানোর ক্ষমতা আমার নাই। আমি তো কোনো অপরাধই করিনি। যারা অন্যায় করল, তারাই আমার সাজা দেয়ার ব্যবস্থা করবে। এ কেমন কপাল আমার!

মাঝেমধ্যে মনে হয় আত্মহত্যা করি। মনে হয়, মৃত্যুই আমার সমস্যার সমাধান দিতে পারে। প্রতিদিন আমার মায়ের চোখের জল সহ্য হয় না। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটটা এখন আমার কাছে বড় বোঝা। আমি যে মামলার আসামি!

মমতাময়ী জননী,
আপনার অনেক ব্যস্ততা। কিন্তু আপনিই আমাদের অভিভাবক। আপনার কয়েক কোটি সন্তানের মধ্যে এই হতভাগা সন্তানের দিকে যদি একটু নজর দেন, একটা অসহায় সন্তান, একটা অসহায় পরিবার বেঁচে যাবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আপনার যে সুখ্যাতি, কারো কাছে না হোক –এই অসহায় সন্তানের কাছে তা আজীবন গেঁথে থাকবে। একটা অসহায় পরিবার আপনার নিকট চির কৃতজ্ঞ থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ