বিশেষ প্রতিনিধি: কার্যালয়ের টেবিলের গ্লাসে চপেটাঘাত করে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলমকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়ার ঘটনায় ৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২৫/৩০ বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে।
কোতয়ালী থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) রেদওয়ানুর রহিম জানান, জেলা প্রশাসকের পক্ষে সহকারী কমিশনার (গোপনীয়) আফতাবুজ্জামান আল ইমরান বাদী হয়ে দ্রুত বিচার আইনে কোতয়ালী থানায় বৃহস্পতিবার রাতে এই মামলা করেছেন। মামলা’র আসামীরা হলেন, আবুল কালাম আজাদ-সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম দিনাজপুরের আহ্বায়ক ও দিনাজপুর নাগরিক উদ্যোগের সভাপতি, নুরুল মতিন সৈকত-কেন্দ্রীয় খেলাঘর দিনাজপুরের সাধারণ সম্পাদক ও দিনাজপুর সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের প্রদর্শক, সহিদুল ইসলাম-জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল দিনাজপুরের সাধারণ সম্পাদক এবং ড. মারুফা বেগম-বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, দিনাজপুরের সাধারণ সম্পাদক ও দিনাজপুর সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষসহ আরও অজ্ঞাত ২৫/৩০ জন।
প্রমীলা ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানির ঘটনার প্রতিবাদ ও অভিযুক্ত কোচ মিঠুর বিরুদ্ধে বিচারের দাবীতে ক্রমশঃ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দিনাজপুর। ঘটনার পর থেকে দিনাজপুরে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে অব্যাহতভাবে চলছে মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও প্রতিবাদসভা। ক্রিকেট কোচ আবু সামাদ মিঠুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ‘দিনাজপুর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্মিলিত জোট’ এর ব্যানারে অব্যাহতভাবে চলছে এই আন্দোলন। এরই মধ্যে আন্দোলনকারী ৪ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা দায়েরের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।
এদিকে দায়ের করা মামলার নথিতে বলা হয়েছে, প্রমীলা ক্রিকেটারকে যৌন হয়রানীর অভিযোগে ক্রিকেট কোচ আবু সামাদ মিঠুর বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তির দাবিতে গত ৫ জুলাই ‘দিনাজপুর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্মিলিত জোট’ এর ব্যানারে আবুল কালাম আজাদসহ ২৫-৩০ জন স্মারকলিপি প্রদানের নিমিত্তে জেলা প্রশাসকের কক্ষে প্রবেশ করেন। স্মারকলিপি প্রদানকারীদের বক্তব্য শ্রবনের একপর্যায়ে আবুল কালাম আজাদ জেলা প্রশাসকের সাথে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং তাকে ব্যক্তিগতভাবে দেখে নিবেন বলে হুমকি প্রদর্শন করেন। এরপর অফিস কক্ষে টেবিলে চপেটাঘাত করেন এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি করবেন বলেও হুমকি প্রদান করেন।
এ বিষয়ে আন্দোলন আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ জানান, জেলা প্রশাসক মিথ্যাচার করেছেন। তিনি আমাদের সাথে কথা বলতে বিরক্তিভাব প্রকাশ করেন এবং আমাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। জেলা প্রশাসক মুলতঃ প্রমীলা ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানীর সাথে জড়িত আবু সামাদ মিঠুর বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন বানচাল করতেই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেছেন।
কমিটির সদস্য সচিব নুরুল মতিন সৈকত জানান, আমাদের আন্দোলন শুধু প্রমীলা ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানীর মূল নায়ক ক্রিকেট কোচ আবু সামাদ মিঠুর বিরুদ্ধে নয়। আমরা আন্দোলন করছি, দিনাজপুরে প্রমীলা ক্রিকেটারদের জন্য একটি নিরাপদ ক্রীড়াঙ্গন সৃষ্টির লক্ষ্যে। তাই এই আন্দোলন করতে গিয়ে জেলা প্রশাসক আমাদের বিরুদ্ধে যতই মামলা দায়ের করুক না কেন, কোনো ক্রমেই আমাদের এই আন্দোলন থামাতে পারবে না।
প্রমীলা ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানীর ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশে এই মামলা দায়ের করা হয়নি বলে উল্লেখ করে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম জানান, মামলা দায়েরের ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর সাথে ক্রিকেট কোচ আবু সামাদ মিঠুর যৌন হয়রানীর ঘটনার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই এবং এতে কোনো ক্রমেই মিঠুর যৌন হয়রানীর ঘটনা ঢাকা পড়বে না।
দিনাজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম আরো বলেন, ইতিমধ্যেই আবু সামাদ মিঠুকে জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতেই মিঠুর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে প্রমীলা ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানীর ঘটনায় ক্রিকেট কোচ আবু সামাদ মিঠুর বিরুদ্ধে অব্যাহত আন্দোলনে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দিনাজপুর। প্রতিদিনই দিনাজপুরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশ। এরই মধ্যে দিনাজপুর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্মিলিত জোট-এর ব্যানারে ক্রিকেট কোচ আবু সামাদ মিঠুর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে জেলা প্রশাসককে দু’বার স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। দিনাজপুর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্মিলিত জোট-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ-দিনাজপুর জেলা শাখা, দিনাজপুর খেলাঘর আসরসহ বিভিন্ন সংগঠন এসব কর্মসূচী পালন করছে।
দিনাজপুরের সুশীল সমাজের নেতারা জানান, প্রমীলা ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানীর প্রতিবাদে এমনিতেই দিনাজপুরে বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলনে উত্তপ্তাবস্থা। তার পর আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন মামলা দায়ের করায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি ও দিনাজপুরের সুশীল সমাজের নেতা রেজাউর রহমান রেজু জানান, জেলা প্রশাসক আন্দোলনাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করায় দিনাজপুরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি শান্ত দিনাজপুর জেলায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি প্রমীলা ক্রিকেটারদের সম্ভ্রম রক্ষায় আন্দোলনকারী নেতাসহ জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নিন্দা জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত ১ জুন বিসিবি’র দিনাজপুর ক্রিকেট কোচ ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাহী সদস্য আবু সামাদ মিঠুর বিরুদ্ধে দিনাজপুরের এক প্রমীলা ক্রিকেটারকে যৌন হয়রানীর অভিযোগ উঠে। এ বিষয়ে গত ১৪ জুন ওই প্রমীলা ক্রিকেটারের বাবা দিনাজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কাছে কোচ মিঠুর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।