সিসি ডেস্ক: চট্টগ্রামে ঋণের ভারে দেউলিয়া হওয়ার পথে জাতীয় পার্টির নেতা মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার পত্নী এমপি মাহজাবীন পরিবার। মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও তার স্ত্রী মাহজাবিন মুরশেদ চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি। মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম চট্টগ্রামের বনেদী পরিবার খ্যাত সেকান্দর হোসেন মিয়ার সন্তান। এমপি মাহজাবিন তার স্ত্রী। তারা ক্রিস্টাল গ্রুপের কর্ণধার। ক্রিস্টাল গ্রুপ মূলত মাছ ধরা ও সমুদ্রগামী জাহাজ ক্রয়-বিক্রয় ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হলেও গত ৫ বছর ধরে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত তার পরিবারের প্রায় ৭ সদস্য। প্রত্যেকের নামে রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। সবমিলে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে দেশের প্রায় ১০টি ব্যাংকের প্রায় ৬শ’ কোটি টাকার ঋণ।
সূত্রে জানা গেছে, মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও মাহজাবিন মুরশেদের পরিচালনাধীন ক্রিস্টাল গ্রুপের নামের ৬শ’ কোটি ঋণের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের প্রায় ১৩০ কোটি টাকা পরিশোধ না করায় বেসিক ব্যাংক, চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ শাখা কর্তৃক তাদের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপব্রেকিং প্রতিষ্ঠানটির নামে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এ নিয়ে নানা মহলে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এর আগে ফারমার্স ব্যাংক, খাতুনগঞ্জ শাখা ১৮ কোটি টাকা ও গুলশান শাখা থেকে ২৯ কোটি ঋণ নিয়ে বেনামি প্রতিষ্ঠানে জাহাজ ক্রয় করে একটি কিস্তিও না দিয়ে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় চট্টগ্রামে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। জাতীয় পার্টির নেতা ও স্ত্রী এমপির প্রভাব খাটিয়ে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে এ পরিবারের বিরুদ্ধে। পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের নামে বেনামি প্রতিষ্ঠান খুলে এসব ঋণ হাতিয়ে নেয়া হয়। বিচ্ছিন্নভাবে পরিবারের সদস্যদের নামের ঋণ নেয়ায় অর্থমন্ত্রীর ঋণখেলাপীর তালিকায় তাদের নাম আসেনি বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান।
বেসিক ব্যাংক সূত্রে আরো জানা যায়, ২০১৬ সালের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের মূল ক্যাপিটালের ১০ ভাগ রয়েছে দেশের ২৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। এ ২৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের রয়েছে ৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ। মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের মালিকানাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠান আইজি নেভিগেশনের নামে রয়েছে ১১৯ কোটি টাকা, বে-নেভিগেশনের নামে রয়েছে ১১৬ কোটি টাকা, ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপব্রেকিং-এর নামে রয়েছে ১১৬ কোটি টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী এমপি মাহজাবিন মোরশেদ, তার ভাই রাশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা রাশেদ, আরেক ভাই ফয়সাল মুরাদ ও তার স্ত্রী হুমায়ারা কারিম ক্রিস্টাল গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। তাদের সবার নামে রয়েছে ক্রিস্টাল গ্রুপের বেশ কয়েকটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রত্যেকের নামে রয়েছে দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংকে ৬শ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ। ঋণখেলাপি হওয়ায় বেশ কয়েকটি ব্যাংক মামলা করেছে তাদের বিরুদ্ধে। অনিয়মিতভাবে কিস্তি চলছে কয়েকটি ঋণের। আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে ফারমার্সের ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা ও ২৯ কোটি টাকা।
জানা যায়, তার পরিবারের সদস্যদের নামে যেসব ব্যাংকে ঋণ নেয়া হয়েছে এগুলো হলো বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, মেঘনা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, ফারমার্স ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা, বেসিক ব্যাংক ঢাকা মতিঝিল দিলকুশা শাখা, রূপালী ব্যাংক মতিঝিল শাখা, বিডি ফাইন্যান্স ঢাকা প্রিমিয়ার ব্যাংক বনানী শাখা, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক চট্টগ্রাম ও আর নিজাম রোড শাখা, ট্রাস্ট ব্যাংক দিলকুশা শাখা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড মতিঝিল শাখা, ন্যাশন্যাল ফাইন্যান্স লিমিটেড ঢাকা, সিটি ব্যাংক গুলশান শাখা।
এসব ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের নামে কয়েকটি ব্যাংকে ৪শ’ কোটি টাকার মতো ব্যাংক ঋণ রয়েছে। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা। আর বাকিগুলো রয়েছে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, এমপি মাহজাবিনের নামে ১২৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা দুই ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণখেলাপি হয়েছে। বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ও ট্রাস্ট ব্যাংক দিলকুশা শাখা থেকে ক্রিস্টাল গ্রুপের দুই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আইজি নেভিগেশন লিমিটেড ও প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের নামে নেয়া হয়। মাহজাবিন মোরশেদ আইজি নেভিগেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।
এ বিষয়ে বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, আইজি নেভিগেশনের নামে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে। দিন দিন তাদের দেনা বেড়েই চলছে। দেনার কারণে আমরা ওই প্রতিষ্ঠানের জাহাজ ক্রিস্টাল গোল্ড আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আটক করেছি। তিনি জানান, বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে নেভিগেশন জাহাজ এমভি ক্রিস্টালের নামের ওভার ড্রাফট ও মেয়াদি ঋণ নেয়া হয়েছে। ঋণের মেয়াদ যথাক্রমে ২০১৫ সালের ২৭ মে এবং ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর। ইতিমধ্যে মেয়াদি ঋণটি একবার পুনঃতফসিল করা হয়েছে। কিন্তু এরপর কিস্তি দেয়া অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তিনি আরো জানান, ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ওভার ড্রাফট ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, মেয়াদি ঋণের স্থিতি ছিল ১০১ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ ঋণ দুটির কিস্তি নিয়মিত করার জন্য বারবার তাগাদা দেয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান। এ ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হালনাগাদ করা হলে টাকার অঙ্ক আরো বাড়বে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের নামে ট্রাস্ট ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ঋণ নেয়া হয়। ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত ওই ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় তিন কোটি ২৬ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৬ টাকা। ঋণের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই। ওই ঋণটিও এখন খেলাপি হয়ে গেছে। ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে চলতি বছরের ২৩ মার্চ একটি চিঠিও দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া স্ত্রীর ১২৩ কোটি টাকা ঋণ ছাড়াও মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপব্রেকিং একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বেসিক ব্যাংক থেকে ১৩০ কোটি ৯৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা ঋণ নেয়া হয়। এ ঋণ পরিশোধ না করায় বেসিক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা সম্প্রতি এ প্রতিষ্ঠানটিকে নিলামে তুলে। এ নিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী এমপি মাহজাবিনের নামে ছাড়াও তার আত্মীয়-পরিজনের নামে আরো শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ রয়েছে। এসব ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় তার আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলাও করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
এসব বিষয়ে মুরশেদ ইব্রাহিম বলেন, তার ব্যাংক ঋণগুলো ব্যবসায়িক কাজে নেয়া হয়েছে। এসব ঋণ ব্যাংকের আইনি প্রক্রিয়ায় চলছে। এক্ষেত্রে কোনোরকম অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হয়নি। এর বেশি তিনি কোনো কিছু বলতে পারবেন না বলে জানান। তবে বেসিক ব্যাংক তার একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে নিলামে তুলেছে বলে স্বীকার করেন।
অন্যদিকে এমপি মাহজাবিন মুরশেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঋণের টাকা অফিসিয়ালভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে। এ ছাড়া তিনি তার নামে ১২৩ কোটি টাকার ঋণটি খেলাপি হয়নি বলে দাবি করেন।
মানবকণ্ঠ