• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২২ অপরাহ্ন |

সৈয়দপুরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিসেনার গুপ্তচর বৃদ্ধ বেলালের আর্তি!

।। এম আর মহসিন, সিসি নিউজ ।।

ঘরের দরজায় তীব্র পানির স্রোত। ভয়ংকর গর্জন। বিদ্যুৎহীন অন্ধকার রাত্রি। কাঁধে সন্তান, মালামালসহ মানুষের ছুটোছুটি। কোন রকম আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়া। এ দৃশ্যে ঘাবড়ে না গিয়ে পানিভর্তি বাড়িতেই পরিবার নিয়ে আল্লাহর নামে আবদ্ধ থাকেন বঙ্গবন্ধু প্রেমি ও মুক্তিসেনার গুপ্তচর বৃদ্ধ বেলাল উদ্দিন (৬৮)। এভাবে তিনদিন অর্ধাহারে থাকলেও কেউ খবর রাখেননি। এমনকি বাড়ির আঙ্গিনায় সেতুমন্ত্রী আসলেও ত্রান সহায়তা জোটেনি মুক্তিযুদ্ধের এ সংগঠকসহ তার শতাধিক প্রতিবেশির ভাগ্যে।
সৈয়দপুর পৌরসভার ১১ নং ওয়ার্ডের কুন্দল গ্রামের পুর্ব পাড়ায় স্ত্রী, সন্তান, নাতীদের নিয়ে জরাজীর্ণ একটি কুটিরে বসবাস করছেন বেলাল উদ্দিন। টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল আর শহর রক্ষা বাধটি ভেঙ্গে পানি বেলাল উদ্দিনের কুটিরের প্রবেশ করে। এরপর বিকেল হতেই বাড়ির দরজায় তীব্র পানির স্রোত শুরু হয়। বিদ্যুত বিপর্যয় আর স্রোতের কারনে ঘর হতে বের হতে পারেনি। চুরি আর পোকামাকড়ের ভয়ে ঘরেই বসবাস করেন পরিবার নিয়ে। পানিবন্দি পরিবারটির দিন কাটে অর্ধাহারে। ক্ষুধার জালায় কোমর পানি উপেক্ষা করে বারবার সৈয়দপুর আশ্রয় কেন্দ্রে যান। তবে কোন সহায়তা পান না। অন্যন্য বন্যার্তরা তাকে পরামর্শ দেন এখানে আশ্রয় নিলে ত্রান পাওয়া যাবে। গত ১৫ আগষ্ট সন্ধায় বিএনপির দেয়া ত্রানের আশায় হাতে যান আশ্রয় কেন্দ্রে। সেদিনেও খালি হতে ফিরতে হয় তাকে। এরপর গত ১৮ আগষ্ট তার বাড়ির পাশে বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আসলেও তালিকায় নাম না থাকায় ত্রান বঞ্চিত হন।
এমনকি ওই দিন মন্ত্রীর ত্রান বিতরনের তালিকায় তার এলাকার প্রায় শতাধিক বন্যার্তদের কোন সহায়তা দেয়া হয়নি। এ নিয়ে সকল বানভাসিরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাদের সকলের অভিযোগ ত্রানের তালিকায় স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য করা হয়েছে।
বেলাল উদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে বিভিন্ন মিছিল মিটিংয়ের একজন সক্রিয় নিয়মিত সৈনিক ছিলাম। সেই ১৯৬৭ হতে শুরু। এরপর মুক্তিযুদ্ধে গুপ্ত চোর হতে কাঠমিস্ত্রি পেশা বদলিয়ে ছদ্দবেশ ধারন করে রিক্সা চালিয়েছি। বিমানবন্দর নির্মাণে শতশত বাঙ্গালীর সাথে মাটি কাটার কাজ করেছি। দেখেছি টেক্কা আর ইয়াহিয়ার গোপন বৈঠক। অনাহারে থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করে ভারতের ফকিরগঞ্জ ক্যাম্পের অবস্থানকারি মুক্তিসেনা নিজামকে খবর দেই। এভাবে চলতে থাকে গুপ্ত চোরের কাজ। এমনকি লাশ বহনকারি কফিন বানিয়ে দিয়েছিলাম। এভাবে ছয় মাস গত হওযার পর নিজামকে দিনাজপুরের বেলতলি এলাকায় রাজাকাররা তাকে হত্যা করে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে মিত্রবাহিনী সৈয়দপুর ওয়াবদায় তেলের ট্যাংকিতে বোমা বিস্ফরনের পরই সৈয়দপুর ছাড়েন বেলাল। পরে দীর্ঘদিন কাঠমিস্ত্রি ও অন্যান্য পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেন। এভাবে বৃদ্ধকালে মুক্তিবাহিনীর এ সোর্স অবমুল্যায়ন হবেন। অন্তত আজকের এ দিনের কথা কখনই ভাবেননি। তার আক্ষেপ এর চেয়ে মৃত্যু ভাল। অন্তত: স্বাধীন দেশে এ দৃশ্য দেখা হতো না। তবে শুধু তিনি নন। তার এলাকার প্রায় শতাধিক বানভাসি মানুষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের বৈষম্যে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। ওই এলাকার ছকবার, লেবু, লিটন, আজিজার, নালখা, হাফেজুল, আফলা, জেনাবুল, মজনু, সাবু, গেদা, তৈয়ব, রুহুল, মিলন, মনজের, মাহাবুলসহ শতাধিক বানভাসিরা অভিযোগ করেন। বিতরনের তালিকায় স্বজনপ্রীতি করেছে স্থানীয় নেতৃবৃন্দরা। তাদের সকলের দাবি তদন্ত করে এ সহায়তা দেয়া হোক।
এ নিয়ে সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক আব্দুস সাত্তার বলেন, এটি পরিতাপের বিষয়। কোন দুর্গতরাই বাদ যাবে না। এটা আমাদের সরকারের নির্দেশ। তাই প্রত্যেকে যেন সঠিক ভাবে সরকারের সহায়তা পায়। সেদিকে অবশ্যই নজর রাখা উচিত কেউ যেন এ নিয়ে আখের গোছাতে না পারে।
সৈয়দপুর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ একরামুল হক বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধ করেছে। স্বাধীনদেশে তারা এখনো বিভিন্ন ভাবে অবহেলিত হচ্ছে। এটা মেনে নেয়া যায় না। তাদের স্বীকৃতি দেয়া না হলেও অন্তত: অমর্যাদা করা যাবে না। আর সরকারি সহায়তায় তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেয়া উচিত।
পৌর কাউন্সিলর এরশাদ হোসেন পাপ্পু এ প্রসঙ্গে সিসি নিউজকে বলেন, সৈয়দপুর কলেজ ও বিভিন্ন উঁচু স্থানে যারা আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রথমত তাদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ত্রাণ দেয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় কম ত্রাণ পাওয়া গেছে।
সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বজলুর রশীদ সিসি নিউজকে বলেন, ত্রাণ বিতরণ চলমান। পূর্বপাড়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা অবশ্যই ত্রাণ পাবে।
এ ব্যাপারে নীলফামারী জেলা প্রশাসক মো: খালিদ রহীম সিসি নিউজকে জানান, বন্যা দূর্গতদের তালিকা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে তৈরী করা হয়েছে। যদি কোন এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা বাদ পড়ে থাকে, তা অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সরকারী ত্রাণ পাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ